কেন আগুন লাগে, নিয়ন্ত্রণে কী করতে হবে

0
13

বার্তাকক্ষ ,,সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটে গেলো দেশে। কেন এই ঘটনাগুলো ঘটছে এবং একই রকম দুর্ঘটনার পর আমাদের করণীয় কী তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে। ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলোর সুনির্দিষ্ট কারণ এখন জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এরকম বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ডের পেছনে মানুষের অসাবধানতা ও অজ্ঞতাকে দায়ী করছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। কর্মকর্তারা বলছেন, শুষ্ক মৌসুমে (অক্টোবর- এপ্রিল) সারা বিশ্বেই আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। তবে মানুষ সচেতন হলে এটা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা জোনের সহকারী পরিচালক (এডি) মো. আক্তারুজ্জামান আগুন লাগার প্রধান কয়েকটি কারণের কথা বলেন, সেগুলো হলো-
জ্বলন্ত চুলা থেকে
জ্বলন্ত সিগারেট, ম্যাচের কাঠি, মশার কয়েল থেকে
মোম বা কেরোসিনের খোলা বাতি থেকে
বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে
গ্যাস লিকেজ থেকে
কয়লা বা এরকম গরম ময়লা-আবর্জনা ও অন্যান্য দাহ্য বস্তু
আগুন নিয়ে খেলা বা রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে।
সচরাচর বাসাবাড়ি ও আবাসিক হোটেলে আগুনের ঘটনা বেশি ঘটে। এসব স্থানে সাধারণত মানুষের অসাবধানতায় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এছাড়া আগুন লাগলে প্রাথমিক পর্যায়ে কী করতে হবে, সেটাও জানেন না সাধারণ মানুষ।
মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, এখন কেউ সিগারেটের ফিল্টার কোথাও ফেললে আগুন ধরে যেতে পারে। এছাড়া গ্যাসের ক্ষেত্রেও এমন হয়। এই মৌসুমে সব কিছু ‍শুষ্ক থাকায় আগুন জ্বলে উঠতে পারে। কিন্তু বর্ষার সময় সেটা হয় না।
আগুন লাগলে করণীয় কী?
কোথাও আগুন লাগলে প্রথমেই আশপাশ থেকে দাহ্য বস্তু (সহজেই জ্বলে ওঠার মতো জিনিসপত্র) সরিয়ে ফেলতে হবে।
আগুনে অক্সিজেনের উৎস বন্ধ করতে হবে।
তেল থেকে আগুন লাগলে পানি দেওয়া যাবে না, বালু ছিটিয়ে দিতে হবে।
গ্যাস থেকে আগুন লাগলে দরজা-জানালা খুলে দিতে হবে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে এলে পরে পানি দিয়ে ঠান্ডা করতে হবে।
আগে থেকেই সতর্ক থাকবো যেভাবে—
রান্নার পর চুলার আগুন সম্পূর্ণ নিভিয়ে ফেলতে হবে। গ্যাসের চুলা হলে ফুঁ দিয়ে না নিভিয়ে রান্না শেষ হলে চুলার চাবি ভালো করে বন্ধ করতে হবে।
গ্যাসের চুলা জ্বালানোর আগে অবশ্যই রান্নাঘরের দরজা-জানালা খুলে নিতে হবে।
ভবনে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র (ফায়ার এক্সটিংগুইশার, হোস পাইপ), দুই বালতি পানি ও বালু মজুত রাখতে হবে।
শিশুদের আগুন নিয়ে খেলা থেকে বিরত রাখতে হবে।
বৈদ্যুতিক মেইন সুইচ নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে। বাধাহীনভাবে প্রবেশ করা যায়, এমন স্থানে স্থাপন করা যাবে না। দুর্ঘটনার শুরুতেই মেইন সুইচ বন্ধ করতে হবে দাহ্য বস্তু আছে, এমন স্থানে খোলা বাতির ব্যবহার বন্ধ রাখতে হবে।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত নিয়ম অনুসারে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে হবে। প্রশিক্ষণ নিতে হবে এবং প্রয়োজন মুহূর্তে তা ব্যবহার করতে হবে।
অভিজ্ঞ ইলেকট্রিশিয়ান দিয়ে নিয়মিত ভবনের বৈদ্যুতিক ক্যাবল (তার) ও ফিটিংস পরীক্ষা করতে হবে।
অনুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটর থেকে মানসম্মত গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে হবে। গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের আগে লেবেল ও মেটেরিয়াল সেফটি ডাটা শিট পড়ে নিতে হবে। খোলা আগুন দিয়ে নয়, সাবানের ফেনা দিয়ে গ্যাস সিলিন্ডারের লিকেজ পরীক্ষা করতে হবে। প্রতি তিন বছর পরপর সিলিন্ডারের হাইড্রোলিক প্রেসার টেস্ট করা হয়েছে, এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হবে।
এসি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আবার চালুর আগে পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে।
ভবন ঝুঁকিপূর্ণ কিনা বুঝবো কীভাবে?
কোনও ভবন ঝুঁকিপূর্ণ কিনা সেটা কীভাবে জানা যাবে, দেখে বোঝার উপায় আছে কিনা– জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা জোনের সহকারী পরিচালক (এডি) মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, অগ্নি নিরাপত্তার দিক থেকে কোনও কোনও ভবন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। সেটা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা পরিদর্শন করলেই বুঝতে পারেন। তবে ভবন ভেঙে পড়ার বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস আগে কিছু বলতে পারে না।
তিনি আরও জানান, ভবন নির্মাণের সঙ্গে জড়িত প্রকৌশলীরা এ বিষয়ে বলতে পারবেন। বর্তমানে ফায়ার সার্ভিসে এ বিষয়ক কোনও বিশেষজ্ঞ (প্রকৌশলী) নেই। তবে অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পের মতো ঘটনার ক্ষেত্রে আগে থেকে সর্তকতা নেওয়া যেতে পারে এমন কয়েকটি বিষয় তিনি জানান–
বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে কিনা তা জানতে হবে।
ভবনের ঝুঁকি পরীক্ষা করে সে অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে।
বহুতল ভবনে যদি প্রবেশ ও বের হওয়ার গেট একটা থাকে, তবে সেটা ঝুঁকিপূর্ণ।
বহুতল ভবনে যদি অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম না থাকে সেটাও ঝুঁকিপূর্ণ।
ভবনে বের হওয়ার একাধিক গেট আছে, কিন্তু সেগুলো মালামাল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে, এটাও ঝুঁকিপূর্ণ।
এসব বিষয় নজরে রেখে ভবন নির্মাণ করলে মানুষের জীবনের ঝুঁকি কমে যাবে, এছাড়া ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কমে আসবে বলে মনে করেন ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা।বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, একটা ভবন বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এটা খারাপ না ভালো। এটা ঝুঁকিপূর্ণ কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা ছাড়া বোঝার উপায় নেই। এভিডেন্স দরকার, ক্যালকুলেমন করে দেখাতে হবে যে বিল্ডিংটা ঝুঁকিপূর্ণ।
পুরান ঢাকার মতো ঘিঞ্জি এলাকা খারাপ এরকম কথা আন্দাজে বলা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। পরীক্ষা করা ছাড়া এটা বলা যাবে না বলে অভিমত দেন তিনি। ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা আছে এমন বিশেষজ্ঞরাই কোনও ভবন ঝুঁকিপূর্ণ কিনা বা কোনও অবকাঠামো পরিত্যক্ত ঘোষণা করা যাবে কিনা সে বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারবেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।