জাবির হলে ঢুকে হয়রানি করছে ‘অজ্ঞাত ব্যক্তি’, আতঙ্কে ছাত্রীরা

0
14

বার্তাকক্ষ ,,এক সপ্তাহের ব্যবধানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ছাত্রীদের তিনটি আবাসিক হলে ঢুকে দফায় দফায় ‘চুরির চেষ্টা’, ‘জানালা ভাঙচুর’ ও ছাত্রীদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেছে অজ্ঞাত ব্যক্তি। তবে এসব ঘটনা একজনই নাকি একাধিক ব্যক্তি ঘটিয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। একই ঘটনার একাধিকবার পুনরাবৃত্তি ঘটায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন আবাসিক হলের ছাত্রীরা।
জানা যায়, গত মঙ্গলবার (৭ মার্চ) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ হাসিনা হলের একটি কক্ষের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি দীর্ঘক্ষণ ধরে কক্ষে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের গালিগালাজ ও হেনস্তা করে। এসময় শিক্ষার্থীরা চিৎকার করে সমবেত হলেও সেই ব্যক্তি সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। এক পর্যায়ে গার্ডরা আসলে সেই ব্যক্তি পালিয়ে যায়।
সেই ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শেখ হাসিনা হলের প্রভোস্ট ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হোসনে আরা। তিনি বলেন, ‘ঘটনার পরেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।’এই ঘটনার রেশ না কাটতেই শনিবার (১১ মার্চ) দিবাগত মধ্য রাত থেকে ভোর পর্যন্ত পরপর বেগম সুফিয়া কামাল হল, শেখ হাসিনা হল ও বেগম খালেদা জিয়া হলে একই ঘটনা ঘটেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ‘রাত ৩টার দিকে বেগম সুফিয়া কামাল হলের গণরুমে জানালার কাঁচ ভেঙ্গে ছাত্রীদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি। এসময় ছাত্রীরা ভীত হয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করতে থাকেন। পরে হল সুপার ও গার্ডদের ডেকে জায়গাটি চেক করালে লোকটি পালিয়ে যায়। এরপর ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। আবারও ছাত্রীদের চিৎকার শুনে গার্ডরা আসলে ওই ব্যক্তি পালিয়ে যায়।’
এর ঠিক এক ঘণ্টা পর ৪টার দিকে আবারও শেখ হাসিনা হলের নীচতলার একটি রুমের জানালা দিয়ে ছাত্রীদের উদ্দেশ্য করে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকে এক ব্যক্তি। এ সময় ছাত্রীরা ভীত হয়ে চিৎকার শুরু করে ও হল সুপারসহ গার্ডদের জানায়। তবে কর্তব্যরত গার্ডরা সেই স্থানে গিয়েও লোকটিকে পায়নি। এর কিছুক্ষণ পর হলের অন্য একটি ব্লকেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। সেখানেও গার্ডরা কাউকে খুঁজে পায়নি। এর ঘণ্টাখানেক পর ভোর ৫টার দিকে বেগম খালেদা জিয়া হলেও একই ঘটনা ঘটেছে বলে জানায় শিক্ষার্থীরা।এদিকে একই ঘটনার বার বার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। গত সপ্তাহেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে জানায় শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা দাবি করছে, হল প্রশাসন যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এছাড়া হলে দায়িত্বরত গার্ডরা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে শিক্ষার্থীরা।
এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে হলে নিরাপত্তার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রীরা। রবিবার (১২ মার্চ) দিবাগত রাত ৯টার দিকে বিক্ষোভ মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের খালেদা জিয়া হল থেকে শুরু হয়ে বেগম সুফিয়া কামাল হলের সামনে এসে শেষ হয়। মিছিয়ে প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী এতে উপস্থিত ছিলেন।
শেখ হাসিনা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী সুমাইয়া অর্পি বলেন, ‘ভোরে হঠাৎ করে লোকটি আমাদের জানালায় এসে অশ্রাব্য ভাষায় কথাবার্তা বলতে থাকে। হঠাৎ এমন হওয়ায় আমরা ভয় পেয়ে যাই। এসময় আমার কক্ষের পাশে থাকা হল সুপারের রুমে গিয়ে তাকে জানাই। হল সুপার দায়িত্বরত গার্ডদের ডেকে আনতে আনতে লোকটি পালিয়ে যায়। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকায় আমরা লোকটির চেহারা দেখতে পারিনি। সেসময় আমরা খুবই ভীত ছিলাম।’তিনি আরও বলেন, ‘এর আগে গত সপ্তাহেও একই ঘটনা ঘটে। তখন প্রভোস্ট ম্যাম নিরাপত্তার জন্য কাঁটাতারের ব্যবস্থা করবেন বলে জানিয়েছেন। তবে সরকারি কাজ হওয়ায় সেটি আসতে একটু দেরি হবে বলে তিনি বলেছিলেন। এছাড়া গত সপ্তাহের ঘটনার পর কয়েকদিন গার্ডরা রাত ১২টার দিকে হলের পেছনে একবার চেক করতো। তবে গতকাল করেছে কিনা বলতে পারছি না।’
এবিষয়ে শেখ হাসিনা হলের প্রভোস্ট ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হোসনে আরা বলেন, ‘আমরা একটা গাছ চিহ্নিত করেছি, যেটা দিয়ে বাইরে থেকে কেউ হলে প্রবেশ করতে পারে বলে ধারণা করছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করেছি এ বিষয়ে। হলের বাউন্ডারি ওয়ালে কাঁটাতার দেওয়া হবে।’
এদিকে সুফিয়া কামাল হলের ঘটনায় ৫১ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এই ঘটনার পর হল কর্মকর্তা জাহানারা খানের কাছে অভিযোগ করতে গেলে তিনি তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ করেছে শিক্ষার্থীরা। এই বিষয়ে জানতে জাহানারা খানের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
সুফিয়া কামাল হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মোতাহার হোসেন বলেন, ‘তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। উপাচার্যের সাথেও এই ব্যাপারে কথা বলেছি। আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেবো। কর্মকর্তার দুর্ব্যবহার নিয়ে ছাত্রীরা আমাকে জানায়নি। সাংবাদিকদের থেকে জেনেছি। এ বিষয়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হবে।’
এদিকে এই ঘটনায় একজন নাকি একাধিক ব্যক্তি জড়িত, তা শিক্ষার্থী ও হল প্রশাসনের কেউই চিহ্নিত করতে পারেনি। তবে তিন হলের ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে যে বিবরণ পাওয়া যায় তা একই ব্যক্তিকে নির্দেশ করছে বলে ধারণা করা যায়। এছাড়া ছাত্রীরা ও দায়িত্বরত গার্ডদের কেউ কেউ বলছেন, ওই ব্যক্তি দেয়াল টপকে আসতে পারে। আবার কেউ বলছেন রাস্তার দিক থেকে দেওয়াল টপকানো সহজ হলেও ভেতর থেকে বের হওয়া এতো সহজসাধ্য নয়। তাই বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
বাইরের দিক থেকে সহজেই দেয়াল টপকানোর বিষয়টি উল্লেখ করে অধ্যাপক মোতাহার হোসেন বলেন, ‘আগে দেয়ালের পাশে খাদ ছিল। আর সড়ক থেকে দেয়াল উঁচু ছিল। কিন্তু সম্প্রতি দেয়ালের পাশে মাটি দিয়ে ভরে গেছে। যার কারণে রাস্তা থেকে দেয়াল টপকানো সহজ হয়ে গেছে। এমন অবস্থা হয়েছে যে মেয়েরাও সেই দেয়াল টপকাতে পারবে। উপাচার্যকে বলেছি দেয়াল আরও উঁচু করতে বা মাটি সরাতে। শিক্ষার্থীদের এমন সমস্যায় আমরাও শঙ্কিত।’
ক্যাম্পাসের মহাসড়ক সংলগ্ন রাস্তা ঘুরে দেখা যায়, মহাসড়ক থেকে দেয়ালের উচ্চতা খুবই কম। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় মাটি জমা করে রাখায় তা অনেকটা দেয়ালের উপরের অংশ পর্যন্ত চলে গেছে। ফলে যে কেউ চাইলেই দেয়াল টপকে হলের সীমানায় প্রবেশ করতে পারবে। এছাড়া হলগুলোতে সব স্থানে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থাও নেই। যেগুলো আছে সেগুলো অকেজো অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া আরও দেখা যায়, মেয়েদের হলগেলোর পাশেই নতুন হলের কাজ চলছে। কিছু শ্রমিক রাতে সেখানে অবস্থান করছেন। হলগুলো এখনও চালু না হওয়ায় রাতে যে কেউই সেখানে লুকিয়ে অবস্থান করার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা সুদীপ্ত শাহীনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হলের অভ্যন্তরে নিরাপত্তার দায়িত্ব হল প্রশাসনের। তবে তারা প্রয়োজনে নিরাপত্তা শাখাকে ডাকলে আমরা তাদের সাহায্যে কাজ করে থাকি। আমরা শেখ হাসিনা হলে গিয়েছিলাম। সম্ভাব্য কিছু কারণ শনাক্ত করেছি। দেয়ালের বাইরের পাশ থেকে টপকানো সহজ হলেও ভেতর থেকে বের হওয়া সহজ নয়।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বর্তমানে অসংখ্য শ্রমিক কাজ করছেন, যাদের কোনও নির্দিষ্ট পরিচয় নেই। এছাড়া বহিরাগতও আছে। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে এগুলোও রয়েছে।’এ বিষয়ে রবিবার একটি বৈঠক হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘উপাচার্য মহোদয় আমাদের নিরাপত্তা শাখাকে রাতের বেলা টহলের সময় তিনটি হলে খোঁজ নিতে বলেছেন।’
এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলমের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন কল ও মেসেজের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।