ন্যায্য মজুরি পান না উপকূলের নারী শ্রমিকরা

0
13

আলমগীর হায়দার/উৎপল মণ্ডল, শ্যামনগর
দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি নারীরা এগিয়ে গেলেও সাতক্ষীরার উপকূলের নারীরা আজও অবহেলিত। স্বাধীনতার ৫২ বছরেও পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীর নারী শ্রমিকরা তাদের অধিকার ও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জানা গেছে, সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় পুরুষের পাশাপাশি নারীরা কাঁকড়ার খামার, মাছের ঘের, নদীতে রেণু আহরণ, সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরা, রাজমিস্ত্রির সহকারী, মাটিকাটা, গ্রামীণ রাস্তানির্মাণ ও সংস্কার, কৃষিকাজ করেন। তবে এসব নারী শ্রমিকরা মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। সাতক্ষীরা শ্যামনগরের কর্মজীবন নারী সেলিনা বেগম বলেন, ‘আমি একটি কাঁকড়ার খামারে কাজ করি। সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। মাসিক বেতন সাড়ে ৭ হাজার টাকা। আমার সঙ্গে একই কাজ করে একজন পুরুষ সহকর্মী বেতন পান ৯ হাজার টাকা। খামারের অনেক কঠিন কাজ আমি করি। বাকিরা আমার চেয়ে সহজ কাজ করে কিন্তু পুরুষ হওয়ায় তাদের বেতন বেশি। বার বার বেতন বাড়াতে বললেও কাজ হয় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি আগে ৮ ঘণ্টা কাজের সময়ের বিষয়ে জানতাম না। কাঁকড়ার খামারে দায়িত্বশীল লোকজন আমাদের বলেছে বাইরে থেকে কেউ আসলে বলতে ৮ ঘণ্টা ডিউটি বাকি চার ঘণ্টা ওভারটাইম। বাস্তবে তারা ৪ ঘণ্টা ওভারটাইম দেয় না। ১২ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে তখন ওভারটাইম দেয়। নারী দিবস শুধু আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ আমাদের ভাগ্যের কোনও পরিবর্তন হয় না।’ সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার দাতিনাখালি বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠনের পরিচালক শেফালী বেগম। তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চলে অধিকাংশ পুরুষ সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল। আগে বছরে তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা থাকতো কিন্তু বর্তমানে ছয় মাস থাকে। সে কারণে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের কাজ করতে হয়। না হলে তাদের সংসার চলে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই অঞ্চলে অধিকাংশ নারীরা কাঁকড়া খামারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। কিছু নারী মাছের ঘেরে, নদীতে রেণু আহরণ, সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরা, রাস্তা সংস্কার ও কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। তাদের বাড়ির কাজ করতে হয় পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে সমান বা তার চেয়ে বেশি কাজ করতে হয়। এরপরও পুরুষ যে মজুরি পায়, নারী পায় তার অর্ধেক। রাস্তা সংস্কারের কাজে একজন পুরুষ ৫০০ টাকা পেলে নারীকে দেওয়া হয় ৩০০ টাকা। ‘এই এলাকার অধিকাংশ নারী তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। কর্মপরিবেশ, কর্মঘণ্টা বিষয়ে অধিকাংশই জানেন না। অনেকে জানলেও কাজ হারানোর ভয়ে এ বিষয়ে মুখ খুলতে চান না । সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা সম অধিকারের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছি।’বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সাতক্ষীরার সাধারণ সম্পাদক জ্যোৎস্না দত্ত বলেন, ‘সাতক্ষীরায় আজও নারীরা মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। একজন পুরুষের অর্ধেক মজুরি পান একজন নারী। নারী দিবস না হয়ে মানবিক দিবস হিসেবে পালন করলে সেটাই ভালো হয়। নারী-পুরুষ সবাই শ্রমিক কেন তাদের আলাদা করা হয়। সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানাই।’ সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মোসলেমা খাতুন বলেন, ‘সব ক্ষেত্রেই নারীরা অবহেলিত এবং বঞ্চিত। মুখে সবাই নারীর অধিকার নিয়ে বলে কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় উল্টো। সাতক্ষীরায় কর্মরত নারীদের দাবি আদায়ে সেইভাবে কোনও সংগঠন দেখা যায় না। নারীদের দাবি আদায়ে নেই ট্রেড ইউনিয়নও। আমিও নির্বাচিত এবং উপজেলা চেয়ারম্যানও নির্বাচিত। কিন্তু আমাদের সেইভাবে কাজ দেওয়া হয় না। নারীর অধিকার, নারী দিবস মুখে যতই বলি না কেন পুরুষশাসিত সমাজে এখনও পরিবর্তন আসেনি।’ সাতক্ষীরা জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের প্রোগ্রাম অফিসার ফাতেমা জোহরা বলেন, ‘আগে নারীদের মজুরি নিয়ে অনেক সমস্যা ছিল। আমাদের বিভিন্ন সচেতনামূলক কার্যক্রমের কারণে এটি অনেকাংশে কমেছে। এছাড়া নারীর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনিসহ সম-অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার কাজ করে যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকার নারী অধিকার ও মজুরি বৈষম্য কমাতে আইন করেছে। সর্বনিম্ন মজুরি হবে ৪০০ টাকা। এখানে নারী-পুরুষ কোনও কিছু উল্লেখ করা হয়নি। এর ফলে নারীর মজুরি বৈষম্য দূর হবে। নারীরা যেন তাদের নায্য মজুরি পায় সে বিষয়ে মালিক ও শ্রমিকদের সচেতন কার্যক্রম চলবে।’