বড় দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা আছে ফায়ার সার্ভিসের?

0
10

বার্তাকক্ষ ,,জনবল বাড়ানো ও তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স। সেই সঙ্গে উদ্ধার অভিযান যাতে সহজ হয়, সেজন্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতির সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। তবে বড় কোনও দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা এখনও গড়ে ওঠেনি বলে জানাচ্ছেন সংস্থার কর্মকর্তারা। সংস্থাটির মহাপরিচালক বলছেন, যেকোনও বড় দুর্যোগ বা বিপর্যয় ঘটলে, বিশেষ করে ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ডের পর ভবন ধসের মতো ঘটনা ঘটলে উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্প্রতি রাজধানীর সিদ্দিকবাজারে বিস্ফোরণের পর বিধ্বস্ত ভবনে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর আগে ভবনটির ঝুঁকির মাত্রা কতটুকু, তা নির্ধারণ করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। এ ধরনের ঝুঁকি চিহ্নিত করার মতো কারিগরি কিংবা প্রকৌশলগত যে জ্ঞান বা দক্ষতা প্রয়োজন, সেই সক্ষমতা এখনও ফায়ার সার্ভিসের গড়ে ওঠেনি।ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। আর কোনও ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ করে থাকে সিটি করপোরেশন। আর বিভিন্ন শহরে ভবন নির্মাণের জন্য অনুমোদন দিয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রকৌশলগত সহায়তাও দিয়ে থাকে এই সংস্থা। যদিও কোনও ঘটনা ঘটলে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় ফায়ার সার্ভিসকে গতিশীল করতে উপজেলাগুলোতে তৈরি করা হচ্ছে ফায়ার স্টেশন। দেশে এখন ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সংখ্যা ৪৯৩টি। পানিবাহী গাড়ির সংখ্যা রয়েছে ৬১৭টি। পাম্প টানা গাড়ি বা টোয়িং ভেহিক্যাল রয়েছে ১৩২২টি। ফায়ার পাম্প ১ হাজার ৩৭০টি। অ্যাম্বুলেন্স ১৯২টি। উঁচু মইয়ের সংখ্যা ২৪টি। ফোম কেমিক্যাল হ্যাজমেট ও ব্রিদিং টেন্ডার ড্রোন ৩৫টি। উঁচু ভবনে কাজ করার সক্ষমতা বলতে ২৪ তলা ভবনে কাজ করতে সক্ষম পাঁচটি টিটিএল মেশিন রয়েছে। ১৪ হাজার ৪৪৩ জন জনবল নিয়ে দেশব্যাপী ফায়ার সার্ভিস কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
রাজধানীর সিদ্দিকবাজারে ভবনে বিস্ফোরণের পর উদ্ধার কাজে নিয়োজিত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরারাজধানীর সিদ্দিকবাজারে ভবনে বিস্ফোরণের পর উদ্ধার কাজে নিয়োজিত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা
এছাড়া, ২০০৭ থেকে ২০২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফায়ার সেফটি ট্রেনিংয়ের আওতায় অগ্নি প্রতিরোধ, অগ্নি নির্বাপণ, উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা ও ফায়ার ড্রিল বিষয়ে ২৪ হাজার ৫২টি কোর্সের মাধ্যমে ৯ লাখ ৬২ হাজার ৮০ জনকে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে
অগ্নিনির্বাপন এবং উদ্ধার কাজের জন্য ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫ কোটি ৬৮ লাখ ৪৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ১৯ ধরনের বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং ১১টি মডার্ন প্রকল্পের আওতায় গত অর্থবছরে ১২৫ কোটি ৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪৮ ধরনের অগ্নি নির্বাপন এবং উদ্ধার অভিযান পরিচালনার বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনা হয়। এছাড়া ডুবুরি প্রকল্পের আওতায় ১২ কোটি ৫৭ লাখ ১৬ হাজার টাকায় ৯ ধরনের সরঞ্জাম কেনা হয়।
অগ্নি নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে বিভিন্ন শর্তে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স বহুতল ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাড়পত্র দেয়। সেবা গ্রহণকারীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরিদর্শন এবং সেফটি প্ল্যান যাচাই-বাছাই শেষে নির্ধারিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এসব ছাড়পত্র দেওয়া হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে চলমান বহুতল ও বাণিজ্যিক ভবনের ১৩১৮টি আবেদনের মধ্যে ৮৫৪টির ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এছাড়া প্রস্তাবিত বহুতল ও বাণিজ্যিক ভবনের ১২৯৫টি আবেদনে ৯৬৪টি আবেদনের ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশে বড় কোনও ধরনের দুর্যোগের ঘটনা ঘটলে যেমন ভূমিকম্প কিংবা অগ্নিকাণ্ডের পর একাধিক ভবন ধসের ঘটনা ঘটলে প্রশিক্ষিত জনবলের যে একটি টিউঅ্যান্ডডি থাকে, একটি ফায়ার স্টেশন স্থাপন হলে সেখানে কী কী ধরনের যন্ত্রপাতি থাকবে, তার বিষযয়ে একটি নির্দেশনা রয়েছে। সেই অনুযায়ী আমাদের ফায়ার সার্ভিসের ৯০ ভাগের ওপর সরঞ্জাম রয়েছে। আমরা প্রশিক্ষিত। কিন্তু যদি বলা হয়— এই ৯০ ভাগ যন্ত্রপাতি দিয়ে সারাদেশের মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব কিনা, আমি বলবো অবশ্যই না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ভলান্টিয়ার তৈরি করছি। বিভিন্নভাবে গার্মেন্টস কর্মীদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কারও একক প্রচেষ্টায় কোনও কিছু হবে না, এজন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা বা উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের যেসব যন্ত্রপাতি রয়েছে তা অত্যাধুনিক। যেসব যন্ত্রপাতি প্রয়োজন সেসব বিষয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। আপনারা সবাই জানেন, প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিউর। আমরা চাই না, কোনও দুর্ঘটনা ঘটুক কোনও দুর্ঘটনা আসুক, সেটা আমরা চাই না। সেসব বিষয়ের জন্য আমাদেরকে প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। বিএমডিসি কোড রয়েছে। সে অনুযায়ী বিল্ডিং তৈরি করতে হবে। যেসব বিল্ডিং সেভাবে তৈরি নয়, সেগুলোকে আইডেন্টিফাই করতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মাকসুদ কামাল বলেন, ‘যেকোনও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রথম সারাদানকারী সংস্থা হিসেবে ফায়ার সার্ভিস কাজ করে থাকে। তাদের আরবান সার্চ রেস্কিউ অপারেশনের ওপর আরও বেশি প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদের যদি দক্ষ করা হয়, তাহলে আমাদের দেশে যদি কখনও বড় ধরনের দুর্যোগ হয়— তাহলে অপারেশনের কাজে রেসকিউ অপারেশন কাজ শুরু করতে পারবে। বিদেশ থেকে লোকজন আসার আগেই তারা প্রাথমিক কাজগুলো সারতে পারবে। বড় দুর্যোগ হলে দেখা যায়— বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন দেশের উদ্ধারকারী দল উদ্ধার কাজে অংশ নিতে যায়। কিন্তু প্রস্তুতি নিতে এবং যেতে এক দুই দিন সময় লেগে যায়।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসকে মূলত অগ্নি নির্বাপন করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভবন ধস কিংবা বিস্ফোরণের জন্য বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল থাকে। আমাদের দেশে সে রকম বিশেষায়িত কিছু নেই। ফায়ার সার্ভিসকে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি দেওয়া হচ্ছে, যেগুলো ভবন ধস কিংবা বিস্ফোরণে কাজে লাগে। তবে ভবন ধসের মতো ঘটনা ডিল করার মতো সেরকম সক্ষমতা এখনও ফায়ার সার্ভিসের গড়ে ওঠেনি।’
তিনি বলেন, ‘ভবনের প্রকৌশলগত তেমন কোনও জ্ঞান না থাকার কারণে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ফার্স্ট রেসকিউ টিম হিসেবে উদ্ধার অভিযান শুরু করলেও ভবনের ঝুঁকিপূর্ণতার বিষয়টি সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রেই ধারণা পায় না। প্রতিটি জেলা-উপজেলায় ভবন ধস কিংবা বড় ধরনের কোনও দুর্যোগের পর রেসকিউ অভিযান পরিচালনার জন্য সব ধরনের যন্ত্রপাতি নেই, সেসব যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু যন্ত্রপাতি বাড়ানো নয়, সেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার জন্য প্রশিক্ষিত জনবলও তৈরি করতে হবে। আমরা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছি। সে কারণে আমাদের ভবন ধসের বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে হবে।