Thursday, December 1, 2022
হোম মুক্ত ভাবনা‘শিক্ষক পিটিয়ে মারা’ জিতুদের চাষ হয় যে সমাজে

‘শিক্ষক পিটিয়ে মারা’ জিতুদের চাষ হয় যে সমাজে

Published on

সাম্প্রতিক সংবাদ

পুতিনের রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা দেখছে না ইউক্রেন

বার্তাকক্ষ রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতারা একটি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ৯ মাস দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান...

পাপড়ি-করামত আলী সাহিত্য পুরস্কার পেলেন তানভীর সিকদার

পাপড়ি-করামত আলী সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন তরুণ কবি তানভীর সিকদার। তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সেফটিপিনে গেঁথে...

১১২ বছরের রেকর্ড ভেঙে দিলো ইংল্যান্ড

বার্তাকক্ষ সব শঙ্কাকে পাশ কাঁটিয়ে নির্ধারিত সময়েই পাকিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নামে ইংল্যান্ড। বৃহস্পতিবার (১...

আইজিপির নেতৃত্বে আইনের শাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুতের আশা বিএনপি মহাসচিবের

বার্তাকক্ষ ‘রাজনৈতিক নিপীড়নমূলক বেআইনি, মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দায়ের বন্ধ করা এবং দায়েরকৃত সব...

ডা. জাহেদ উর রহমান
যেকোনও ভয়ংকর অপরাধ যখন ঘটতে দেখি আমরা, তখন চারপাশ থেকে সেই অপরাধীর বিচার চাইতে দেখি। গত কয়েক বছরে সেই বিচার এসে ঠেকেছে মৃত্যুদণ্ডে। সেই মৃত্যুদণ্ড বিচারিক পথে না হয়ে বিচারবহির্ভূত পথে হলেও আমাদের অনেকেরই আপত্তি থাকে না। কোনও চাঞ্চল্যকর অপরাধের ঘটনা আমাদের সামনে এলে নিজেদের মধ্যকার আলাপচারিতায়, সামনে আসা প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদে সর্বোপরি সরকারি পর্যায় থেকেও যাবতীয় আলোচনা অপরাধীকে একমাত্র দায় দেওয়া হয়। এর বাইরেও আছে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় কিন্তু সেগুলো নিয়ে কথা যারা বলেন তাদের কথা মিডিয়ায় খুব জোর দিয়ে প্রচার হয় না।
কোনও অপরাধের জন্য ব্যক্তিকে সব দায় দিয়ে দেওয়ার একটা মজার দিক আছে, বিশেষ করে শাসকগোষ্ঠীর জন্য। সেটা হচ্ছে অপরাধ ঘটার জন্য আরও যেসব বিষয় জড়িত সেগুলোকে আলোচনার পরিসর থেকে দূরে রাখা যায়। কেন শাসকগোষ্ঠী এমনটা চায়, সেটা নিয়ে আলাপ করছি পরবর্তীতে। সাভারে ছাত্রের পিটুনিতে শিক্ষকের মৃত্যুর ঘটনাটি এখনও আলোচনায় আছে। সেই ঘটনার প্রেক্ষাপটেই লিখছি আজকের এই কলাম। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তিকে শতভাগ দায় দেওয়ার মানসিকতা কতটা ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেটা দেখলে অবাক হতে হয়। চলতি বছরের জুলাই মাসেই সরকারের আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সাভারে শিশুর সর্বোচ্চ বয়স ১৮ বছর থেকে কমিয়ে আনার প্রস্তাব করেছে। কমিটি বলেছে এই বয়স ১৪ হওয়া উচিত। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শিশু সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বাংলাদেশের আইনে ১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু। এই বয়সের কেউ কোনও অপরাধ করলে সেটার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের চাইতে ভিন্ন হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে জামিন, শাস্তি এবং তাদের আটক রাখার স্থান প্রাপ্তবয়স্কদের চাইতে আলাদা। কিন্তু সরকার এখন চাইছে এই নিয়ম ভেঙে ফেলা হোক। সরকার চাইছে শিশু হওয়ার বয়স হবে সর্বোচ্চ ১৪ বছর। অর্থাৎ সরকার চাইছে ১৪ বছরের বেশি যে কাউকে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো শাস্তি দেবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাভারে ঘটা বীভৎস ঘটনাটির মতো বেশ কিছু ঘটনা ঘটিয়েছে কিশোর বয়সের ছেলেরা। এদের অনেকেই দলবেঁধে চলে বলে এদের একটা নামও আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে– ‘কিশোর গ্যাং’। খবরে দেখি অনেক সময় এক গ্যাং আরেক গ্যাংয়ের সঙ্গে মারামারি করেছে, অনেক সময় সেটা খুনোখুনিতে গড়িয়েছে। এছাড়াও মেয়েদের মৌখিক থেকে শুরু করে নানা রকম যৌন হয়রানি, চাঁদাবাজি ইত্যাদি নানা অপরাধে জড়িত হয়েছে তারা। তাদের কাজে কেউ বাধা দিতে গেলে তাকে প্রহৃত হওয়াসহ নানা রকম বিপদের মুখে পড়তে হয়েছে। কেউ কেউ হত্যাকাণ্ডেরও শিকার হয়েছেন।
এটা মানতে দ্বিধা নেই, আমাদের আইন অনুযায়ী শিশু এই ছেলেগুলোর কর্মকাণ্ড সমাজের অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভয়ংকর পর্যায় গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের নানা রকম শাস্তির ভয় দেখানো আর শাস্তি দেওয়া কি পারবে সমাজ থেকে অপরাধ কমিয়ে আনতে? দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তো অনেক কঠোর আইন আছে, শাস্তির ভীতি আছে, কাউকে কাউকে শাস্তি দেওয়াও হচ্ছে, কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধ কি কমেছে এই দেশে? দেশের পরিস্থিতি এবং এই সমাজে অপরাধী তৈরি হবার কারণ বোঝার জন্য সাভারে ঘটা ঘটনার কিছু বিষয় আমাদের জানা দরকার। ছাত্র জিতু যে তার শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে পিটিয়ে হত্যা করেছে, সেটা মুহূর্তের উত্তেজনার বশে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনা নয়। জিতু রীতিমতো পরিকল্পনা করে তার শিক্ষককে পিটিয়েছে। নানা কুকর্মের জন্য শিক্ষকের শাসনের পরিপ্রেক্ষিতেই জিতু সেই শিক্ষককে পেটানোর পরিকল্পনা করে। একটি পত্রিকার বিস্তারিত রিপোর্টে জানা যায়, যেহেতু স্কুলের প্রতিটি জায়গায় সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল, তাই হামলার আগে জিতু বিদ্যুৎ সঞ্চালনের মেইন সুইচ বন্ধ করে নিয়েছিল। কতটা ঠান্ডামাথায় পরিকল্পনা করলে একজন মানুষ এটা করতে পারে, সেটা বোঝা কঠিন নয়।
এই ঘটনায় আছে আরও ভয়ংকর তথ্য। শিক্ষককে পেটানোর পরই কিন্তু জিতু পালিয়ে যায়নি, এলাকায়ই ছিল। তাকে দীর্ঘ সময় এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। কয়েক ঘণ্টা পরে যখন খবর এলো প্রহৃত শিক্ষকের বেঁচে থাকা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছে, তখন জিতু এলাকা থেকে পালিয়ে যায়। অর্থাৎ জিতু এটা নিশ্চিত ছিল ভয়ংকরভাবে পেটানোর পরও এলাকায় থাকায় তার কোনও সমস্যা নেই, শিক্ষক মারা গেলে তার সমস্যা হতে পারে। পত্রিকার খবরে জানা যায়, এটি শিল্প এলাকা বলে সেখানে বেশিরভাগ অধিবাসীই অ-স্থানীয় এবং ভাসমান। কিন্তু জিতুর পরিবার ওই এলাকার স্থানীয় এবং প্রভাবশালী। শুধু সেটাই না, যে কলেজের (হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ) শিক্ষককে পিটিয়ে মেরে ফেললো জিতু, সেই কলেজের ম্যানেজিং কমিটিতে আছে তার পরিবারের লোক।
একজন কিশোর কতটা বেপরোয়া হলে, কতটা দুঃসাহসী হলে মনে করতে পারে একজন শিক্ষককে পিটিয়ে ভয়ংকরভাবে আহত করার পরও সে মনে করছে তার কোনও সমস্যা হবে না। তার ওপরে শিক্ষকটি যদি হন ধর্মীয় সংখ্যালঘু? পেটানোর ফলে জনাব উৎপল মারা না গেলে তার কিছু হবে না, এমনটা ভেবে থাকলে জিতু কি ভুল ছিল আসলে? এই দেশে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি যদি কারও থাকে তাহলে তার পক্ষে এই দেশে যাচ্ছেতাই করেও পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব। তাই এই দেশে নানা রকম অপরাধ করা এবং সেটা নিয়ে ন্যূনতম পরোয়া না করার অর্থই হচ্ছে অপরাধী মনে করে অপরাধ করে তার কিছু হবে না। তার সেই প্রতিপত্তি আছে সমাজে। কলামের শুরুর দিকে বলেছিলাম, সরকার সবসময় চায় অপরাধকে শুধু ব্যক্তির গায়ে ট্যাগ করে সেটা নিয়ে আলোচনা করা হোক। এতে আসলে আমরা সেই বিষয়গুলো আলোচনায় আনি না কেন এবং কীভাবে এই সমাজের অপরাধী তৈরি হয়। অপরাধ বিজ্ঞানের খুব বেসিক জ্ঞান বলে শুধু অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করে একটা সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখা যায় না। যে সমাজে অপরাধী হয়ে ওঠার মতো পরিবেশ বিরাজ করে সেই সমাজে নিয়মিত অপরাধী তৈরি হবে, যতই শাস্তির ভয় দেখানো হোক না কেন। তাই আমরা যখন অপরাধী নিয়ে কথা বলবো, হোক সেটা কোনও শিশু কিংবা প্রাপ্তবয়স্কের অপরাধ, তখন আমাদের খুব গুরুত্ব দিয়ে সমাজে অপরাধী তৈরি হবার পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করতেই হবে। যে শিশুটা এই দেশে জন্মে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে, তার কাছে অপরাধের সংজ্ঞা কী হবে? যেসব কাজকে আমরা অবশ্যই অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করবো, সেসব ঘটনা চারপাশে ঘটতে এবং এর জেরে তাদের কোনও সমস্যা না হওয়া দেখে একজন শিশু কী বুঝবে? বেড়ে ওঠার বয়সে সে যখন দেখবে এই সমাজে দাপট না থাকলে যেকোনও মানুষ মূল্যহীন, তখন যেকোনও মূল্যে রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক দাপট তৈরি করতে কি সে চাইবে না? তখন যদি এলাকার কিছু রাজনীতিবিদ তাদের ব্যবহার করতে চায়, এবং ব্যবহৃত হবার বিনিময়ে যদি একজন কিশোর সমাজে দাপটের অধিকারী হতে পারে, তাহলে কেন সে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হবে না? যখন একটা সমাজে অপরাধী তৈরি হবার পরিবেশ নিয়ে আলাপ হবে, যখন একটা রাষ্ট্রে বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে আলাপ হবে, যখন মানুষের সামনে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যাচ্ছেতাই করার উদাহরণ সামনে আসবে, তখন সেই দায় অনিবার্যভাবেই গিয়ে পড়বে ক্ষমতাসীন শাসকের ওপরে। জনগণ জেনে যাবে যেসব ভয়াবহ, বর্বর অপরাধ আমরা আমাদের সমাজে ঘটতে দেখি, তার পেছনে সবচেয়ে বড় দায় শাসকগোষ্ঠীর। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই দেশের শাসকগোষ্ঠী কখনোই চায় না এসব আলাপ হোক জনপরিসরে।
লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

spot_img
spot_img

এধরণের সংবাদ আরো পড়ুন

কোয়ার্টারের পথে আর্জেন্টিনা

ডা. পলাশ বসু যদিও দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলা অনুষ্ঠিত হতে বাকি আছে ফলে এ ধরনের শিরোনামকে...

তলাবিহীন ঝুড়ির কিসসা

মহসীন হাবিব তলাবিহীন ঝুড়ির ব্যবহারিক অর্থ কী তা বুঝতে বাংলাদেশের কোনো মানুষেরই অসুবিধা নাই। একটি...

চীনা ঋণের ফাঁদ: বাংলাদেশ নেই তো?

বিভুরঞ্জন সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি ছিল। দেশের ভেতরে যেমন দেশের বাইরেও তেমন। মুক্তিযুদ্ধের...