Thursday, December 1, 2022
হোম মুক্ত ভাবনাপাকিস্তান ছাদে পাঁচ শতাধিক লাশ ধামাচাপায় ব্যস্ত কেনো?

পাকিস্তান ছাদে পাঁচ শতাধিক লাশ ধামাচাপায় ব্যস্ত কেনো?

Published on

সাম্প্রতিক সংবাদ

পুতিনের রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা দেখছে না ইউক্রেন

বার্তাকক্ষ রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতারা একটি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ৯ মাস দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান...

পাপড়ি-করামত আলী সাহিত্য পুরস্কার পেলেন তানভীর সিকদার

পাপড়ি-করামত আলী সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন তরুণ কবি তানভীর সিকদার। তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সেফটিপিনে গেঁথে...

১১২ বছরের রেকর্ড ভেঙে দিলো ইংল্যান্ড

বার্তাকক্ষ সব শঙ্কাকে পাশ কাঁটিয়ে নির্ধারিত সময়েই পাকিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নামে ইংল্যান্ড। বৃহস্পতিবার (১...

আইজিপির নেতৃত্বে আইনের শাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুতের আশা বিএনপি মহাসচিবের

বার্তাকক্ষ ‘রাজনৈতিক নিপীড়নমূলক বেআইনি, মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দায়ের বন্ধ করা এবং দায়েরকৃত সব...

ফারাজী আজমল হোসেন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, ‘পাকিস্তান বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশগুলোর একটি’। তার এই মন্তব্য নিয়ে বিতর্কের কোনও জায়গা নেই। সেখানকার সরকারি হাসপাতালের ছাদ থেকে পাঁচ শতাধিক লাশ উদ্ধারের ঘটনাটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তারা এখন বিষয়টি ধামাচাপা দিতে চাইলেও অনেকেই মনে করেন পাকিস্তান নিজের দেশেরই বেলুচিস্তান এবং খাইবার পাখতুনখাওয়া থেকে বেলুচ বা পশতুনদের তুলে নিয়ে এসে নৃশংসভাবে হত্যা করে তাঁদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচার করে দিয়েছে।
অবশ্য এর আগেও পাকিস্তান থেকে চীনে মানুষের অঙ্গ পাচারের অভিযোগ উঠেছিল। তাছাড়াও প্রশ্ন উঠছে, সরকারের নিজস্ব বেসামরিক হাসপাতালেই যদি এতো লাশের পাহাড় জমে থাকে তবে সামরিক বা বেসরকারি হাসপাতালে কতো লাশ রয়েছে? এক্ষেত্রেও সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তির বদলে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়াটাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে পাকিস্তান সরকার। তাতে করে আরও বেশি সন্দেহ বাড়ছে। পাকিস্তান মুখে ইসলামের কথা বললেও আদতে যে তারা ইসলাম ধর্মের কোনও শিক্ষাই নেয়নি সেটা লাশগুলিকে অসম্মান করে বুঝিয়ে দিয়েছে। ইসলাম-সহ সব ধর্মই মৃতদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারকে প্রশ্রয় দেয়না।
পাকিস্তানের অর্থনীতি ও মানবাধিকার চিত্র আরও একবার প্রমাণ করে, কেনো ১৯৭১ ঘটা নিশ্চিত ছিলো। তাদের সেই সময়কার নৃশংসতার চিত্র যেনো ফুটে উঠেছে এই লাশ উদ্ধারের ঘটনায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন না করলে পাকিস্তানে সরকারি মদদে এভাবেই হয় বাংলাদেশের হাসপাতালের ছাদ জুড়ে থাকতো বাংলাদেশের মানুষের সারিবদ্ধ লাশ।
বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বর্বরতার প্রমাণ পেয়েছেন। বেলুচ ও পাশতুনরা আজও সেই পাকিস্তানি নৃশংসতারই শিকার। গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করে সেখানকার মানুষদের ওপর একাত্তরের কালো দিনগুলির মতোই দানবিক অত্যাচার চালাচ্ছে পাকিস্তান। দুর্গম এলাকার হাজার হাজার মানুষ আজও নিখোঁজ। বেলুচ নেতাদের অভিযোগ, সেখানকার পুরুষদের লাশ গুম করছে পাকিস্তান সরকার। নিজেদের অধিকার আদায়ে লড়াই করলেই বিভিন্ন অজুহাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা চরমে পৌঁছায়। খান সেনার বর্বরতা যে আজও বন্ধ হয়নি সেটা বেলুচিস্তান বা পাখতুনখাওয়ার মানুষ আজও টের পাচ্ছেন। কিন্তু এমন নৃশংসভাবে লাশ থেকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খুবলে নেওয়া মানব সভ্যতার ইতিহাসেই বিরলতম নৃশংসতার অন্যতম উদাহরণ।
পাঁচ শতাধিক লাশ উদ্ধারের ঘটনা পাকিস্তান লুকানোর চেষ্টা করলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমের দৌলতে ছবি ও ভিডিও আজ গোটা দুনিয়া দেখে ফেলেছে। চলতি মাসেই পাঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা চৌধুরী জামান গুজ্জর মুলতানের পাঞ্জাব নিশতার হাসপাতাল পরিদর্শন গিয়েছিলেন। সেখানে স্থানীয়দের অনুরোধে তিনি ছাদে উঠতেই বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে। ক্যামেরায় ধরা পড়ে অগণিত লাশ। লাশগুলি থেকে খুবলিয়ে তোলা হয়েছে বুক ও পেটের বিভিন্ন অংশ। তারপরও কবর না দিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে।
প্রথম থেকেই অবশ্য শুরু হয় বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার প্রক্রিয়া। চৌধুরী জামান গুজ্জরের মতে, ওই দেহগুলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছিল। সামাজিক গণমাধ্যমে পাঁচ শতাধিক লাশ দেখা গেলেও তিনি সংখ্যাটি কমাতেও ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তারপর পাঞ্জাব সরকার গতানুগতিক তদন্তের নির্দেশ দেয়। কিন্তু তদন্ত নিয়েও আন্তরিকতার অভাব প্রকট। এটাই প্রমাণ করে পাকিস্তান সরকারের সত্য উদঘাটনে আদৌ রাজি নয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মীনা গাবিনা জানান, পাকিস্তান এখন ভৌতিক দেশে পরিণত হয়েছে। নৃশংসতার চূড়ান্ত নিদর্শন ফুটে উঠেছে নিশতার হাসপাতালে। তাঁর মতে, ছবিই প্রমাণ করছে ৫০০-রও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এমন ভয়ঙ্কর সত্য ঘটনা যেন বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ওসামা ক্যুরেশের কাছে অবশ্য বিষয়টি তেমন একটা আশ্চর্যজনক নয়। কারণ প্রতিদিনই তিনি পাকিস্তানি বর্বরতা প্রত্যক্ষ করছেন। তার সামাজিক গণমাধ্যমের পাতা ভরে ওঠে প্রতিদিনই বেলুচ আর পাশতুনদের ওপর পাকিস্তানি বর্বরতার ছবি ও ভিডিওয়। ওসামা নিশ্চিত দেহগুলি বেলুচ আর পাশতুনদের। বুক বা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কাটা থাকলেও লাশগুলি যে পাহাড়ি অঞ্চলের সেটা বোঝা যাচ্ছে। ডিএনএ টেস্টের দাবি উঠলেও এখনও সেবিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি ইসলামাবাদ।
তবে লোকদেখানো তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চৌধুরী পারভেজ এলাহী ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গড়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও তদন্ত করে জড়িতদের শাস্তির ইঙ্গিতও দিয়ে রেখেছেন। পাশাপাশি নিশতার মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মারিয়াম আশরাফ ৫০০ লাশের কথা অস্বীকার করতে শুরু করেছেন। তার মতে, ডাক্তারি পড়ুয়াদের জন্যই কয়েকটি বেওয়ারিশ লাশ রাখা হয়েছিল।
প্রশ্ন উঠছে লাশ যদি বেওয়ারিশই হবে, সেগুলি কোন সম্প্রদায়ের? পাকিস্তানি গণমাধ্যম ডন জানাচ্ছে, লাশের পরিচয় জানতে তাদের জাতীয় অ্যাসেম্বলিতেও সরকার ও বিরোধী পক্ষ একযোগে দাবি তোলে ডিএনএ টেস্টের। এমকিউএম সদস্য কিশ্বর জেহরা প্রথম বিষয়টি তুললে নির্দল সদস্য মহসিন দাওয়ার তাকে সমর্থন করেন। পিপিপি-র আবদুল কাদির মন্ডোখেল পাঞ্জাব সরকারের কড়া সমালোচনা করেন। তবে ফেডারেল সরকারের পরিষদের মন্ত্রী মুর্তাজা জাভেদ আব্বাসি বিষয়টি প্রাদেশিক সরকারের বিচারাধীন বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী আবদুল রহমান কাঞ্জু ডিএনএ টেস্ট দাবির যৌক্তিকতা মেনে নেন। ন্যাশনাল অবশ্য এবিষয়ে কোনও রুলিং না দিয়ে ইসলামাবাদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে।
এদিকে, হাসপাতালের আশেপাশে চিল আর শকুনের ভিড় বাড়ছে। লাশের গন্ধে রোগীদের পাশাপাশি স্থানীয়দেরও জীবন দুঃসহ হয়ে উঠেছে। পাঞ্জাব সরকার অবশ্য লাশগুলিকে এখন কবরে পাঠাতে সক্রিয় হতে বাধ্য হয়েছে। তবে ডিএনএ তদন্তের দাবি তো দুরস্ত, আদৌ সেগুলির পোস্টমর্টেমটুকু হচ্ছে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। তাই বেলুচ ও পাশতুনরা ধরে নিয়েছেন, এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পাকিস্তানে এধরনের নৃশংসতা বহুদিন ধরেই চলছে।
নিশতারের ঘটনা উদাহরণ মাত্র। তাঁদের আশঙ্কা, বিভিন্ন সামরিক হাসপাতালও মানব অঙ্গ পাচারের সঙ্গে যুক্ত। কারণ সেখানে গোপনীয়তা রক্ষার সুবিধা রয়েছে। হাজার হাজার বেলুচ ও পাশতুন নিখোঁজের ঘটনায় তাদের উদ্বেগ আরও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে বেলুচ ও পাশতুনদের দাবি, পাকিস্তানি নৃশংসতার নিরপেক্ষ তদন্তে এগিয়ে আসুক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। মানবাধিকার লুণ্ঠনের যে প্রক্রিয়া সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে তারা শুরু করেছিল, সেটি আজও বন্ধ হয়নি। তাই মানব সভ্যতার স্বার্থে আন্তর্জাতিক দুনিয়া কড়া ব্যবস্থা নিক, সেই দাবি ফের উঠছে পাকিস্তানের মাটি থেকেই।
পাকিস্তানের অর্থনীতি ও মানবাধিকার চিত্র আরও একবার প্রমাণ করে, কেনো ১৯৭১ ঘটা নিশ্চিত ছিলো। তাদের সেই সময়কার নৃশংসতার চিত্র যেনো ফুটে উঠেছে এই লাশ উদ্ধারের ঘটনায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন না করলে পাকিস্তানে সরকারি মদদে এভাবেই হয় বাংলাদেশের হাসপাতালের ছাদ জুড়ে থাকতো বাংলাদেশের মানুষের সারিবদ্ধ লাশ।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

spot_img
spot_img

এধরণের সংবাদ আরো পড়ুন

কোয়ার্টারের পথে আর্জেন্টিনা

ডা. পলাশ বসু যদিও দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলা অনুষ্ঠিত হতে বাকি আছে ফলে এ ধরনের শিরোনামকে...

তলাবিহীন ঝুড়ির কিসসা

মহসীন হাবিব তলাবিহীন ঝুড়ির ব্যবহারিক অর্থ কী তা বুঝতে বাংলাদেশের কোনো মানুষেরই অসুবিধা নাই। একটি...

চীনা ঋণের ফাঁদ: বাংলাদেশ নেই তো?

বিভুরঞ্জন সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি ছিল। দেশের ভেতরে যেমন দেশের বাইরেও তেমন। মুক্তিযুদ্ধের...