Saturday, December 3, 2022
হোম সাহিত্যআমার হুমায়ূন

আমার হুমায়ূন

Published on

সাম্প্রতিক সংবাদ

গাড়ির নিচে নারীকে টেনে নেওয়া: ঢাবির সাবেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা

বার্তাকক্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চাকরিচ্যুত শিক্ষকের প্রাইভেটকারে টেনে নেওয়া রুবিনা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় শাহবাগ...

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল নেতার বাড়িতে বিস্ফোরণ, নিহত ৩

বার্তাকক্ষ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কাঁথিতে এক তৃণমূল নেতার বাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার রাতের এ...

বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতির নেতার মৃত্যুতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ

নিজস্ব প্রতিবেদক ৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি অভয়নগর থানার একতারপুর গ্রামতলা কমিটির সাবেক সভাপতি...

কোভিডের নতুন ভ্যারিয়েন্টের ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা ডব্লিউএইচওর

বার্তাকক্ষ কোভিড মোকাবিলায় মানুষের সতর্কতা কমে যাওয়া এই ভাইরাসের মারাত্মক নতুন ভ্যারিয়েন্ট তৈরি করতে...

সেঁজুতি জাহান
হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ক্লাস সিক্সে; না, সাক্ষাৎ মানে সরাসরি দেখা নয়, তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচয়ের কথা বলছি। তাঁর ‘এপিটাফ’ নামের উপন্যাসটি আমি কোত্থেকে যে পেয়েছিলাম ঠিক মনে করতে পারছি না। উপন্যাসের কাহিনিও হুবহু মনে নেই। ইন্টারনেটের যুগে চাইলেই আর একবার পড়ে ফেলা যায়। কিন্তু পড়ব না। কারণ, তখন যে নাতাশাকে (নামটাও ভুলে গিয়েছিলাম) আমার কচি হৃদয়ে যেভাবে স্থান দিয়েছিলাম সেই অনুভূতি নষ্ট করতে চাই না। মাত্র বারো বছর বয়সে ব্রেইনের মধ্যে টিউমার গজানো একটা মেয়ের ডায়েরি পড়েছি আর কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়েছি। এই কান্না যতোটা না নাতাশার জন্য তার চেয়েও বেশি নিজের জন্য। ছোট মানুষ, বাবা-মা একটু বকা দিলেই নিজের ভেতর নাতাশাকে প্রতিস্থাপন করে নিয়ে চোখ ভাসাতাম। মনে হতো যেন নাতাশা আমাকে বেতন দিয়ে নিয়োগ দিয়েছিল তার কান্না উদযাপনের জন্য।
হন্যে হয়ে খুঁজেছিলাম এপিটাফের অর্থ। ইংলিশ টু বেঙ্গলি ডিকশনারিতে পেয়েছিলাম অর্থটা। সাগর সেঁচে মুক্তা বের করার মতো আনন্দ অনুভব করেছিলাম ইংরেজি ডিকশনারি থেকে ‘এপিটাফ’-এর অর্থ বের করে।তখন মনে হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদ না জানি কতো বড় জ্ঞানী মানুষ! এমন একটা গভীর ইংরেজির অর্থ সম্পর্কে জানতেন!
নাতাশার দুঃখবোধ যে আমার নিষ্পাপ মনকে আবিষ্ট করে রেখেছিল এবং এখনও পর্যন্ত ভেতরের অহেতুক দুঃখবোধটিকে যে মাথা থেকে খসাতে পারি না, এর জন্য মনে হয় হুমায়ূন আহমেদ ও তাঁর সৃষ্ট নাতাশাই অনেকাংশে দায়ী।
‘কালো জাদুকর’ পড়েছিলাম সম্ভবত ক্লাস নাইনে। পড়ে কেন যেন টগরের (অন্তর্জাল দেখে খুঁজে নিয়েছি নামটা) মতো হতে ইচ্ছে করতো। বাসায় একটা খেজুর গাছ ছিল। রোজ ভোরে উঠে খেজুর গাছকে চোখ বুজে জড়িয়ে ধরে থাকতাম। সেই অনুভূতিও ভুলবার নয়। গাছের সঙ্গে কথা বলতে যে দারুণ আরাম সেটা হয়তো হুমায়ূন আহমেদ না বলে দিলে জীবনেও ট্রাই করতাম না।
ছোটবেলায় বিটিভি ছিল আমাদের ভিজ্যুয়াল বিনোদনের একমাত্র উৎস। ডিজনির কার্টুন প্রচারিত হত বিটিভিতে। ডোনাল্ড ডাকের একটা পর্বে দেখেছিলাম ডোনাল্ড ডাকের তিনটা না চারটা (মনে নাই) ভাতিজা সম্পর্কের হাঁসের বাচ্চা ব্যাগপাইপ বাজাচ্ছে। ব্যাগপাইপের একটা বিশেষ ধরনের কস্টিউম আছে। চেক স্কার্টের মতো কিছু একটা। সেটা পরে ব্যাগপাইপ বাজিয়ে বাজিয়ে ভাতিজা-সম্পর্কের হাঁসের বাচ্চারা ডোনাল্ড ডাকের ঘুম হারাম করে দিচ্ছিল। সেই পর্বের পুরো কাহিনি মনে নেই। কিন্তু ব্যাগপাইপের ভিন্নরকম তীক্ষ্ণ আওয়াজে যে বিরক্তি জাগে সেটা ওখান থেকে জানতে পারলেও বিষয়টি পরিষ্কার হয় ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় হুমায়ূনের ‘বুড়ি’ গল্পটি পড়ে। ‘বুড়ি’ গল্পের বুড়িটির একাকিত্বের সঙ্গে ডোনাল্ড ডাকের ভাতিজা-হাঁসদের দলীয় দুষ্টুমির মিল না থাকলেও উভয়েরই আছে অপরের দৃষ্টি আকর্ষণের সুমহান উদ্দেশ্য।বুড়ি’ গল্পটি পড়ে গল্পটির নাম ‘বুড়ি’ না হয়ে ব্যাগপাইপ হল না কেন সেই প্রশ্ন এখনও আমার মাথায় ঘুরপাক খায়।
বায়োলজিক্যালি ব্যাগপাইপ বাজাতে ফুসফুসের জোর বেশি লাগে, কিন্তু এর সুর আসলে মন নিঙড়ানো গভীর যন্ত্রণাকেই কেমন যেন আশ্রয় করে বের হয়। দুই বছর আগে ইউটিউবে ‘পাইরেটস অব দ্যা ক্যারিবিয়ান’ মুভির থিম সঙটি নিয়ে এই ব্যাগপাইপের সাহায্যে এক নারীর করা পারফর্মেন্স দেখলাম। একই রকম বেদনাদায়ক সুখ অনুভব করলাম। সত্যি বলতে কী আজকাল ব্যাগপাইপের সুরের ভেতর রস-ভক্তি বা বিরক্তির চেয়ে একাকিত্বকেই যে বেশি অনুভব করি সেটার জন্য হুমায়ূন আহমেদই দায়ী।
আমার নানির রান্নার হাত ছিল একেবারেই প্রথম শ্রেণির। নানির মেয়ে হিসেবে মায়ের রান্নাও ভালো ছিল। কিন্তু নানির জীবনের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান ছিল কী করে ভালো রান্না করা যায়, আর স্বল্পের মধ্যে বিরাট সংসারকে অগ্রগামী করা যায়। হুমায়ূনের ‘কুটু মিয়া’ যখন হাই স্কুলে থাকতে পড়লাম, তখন চোখের সামনে নানির চেহারা ভেসে উঠেছিল।
ভালো রান্না মানেই বুঝতাম নানির রান্না। কুটু মিয়ার মতো আমার নানির রান্না কোনোদিন খারাপ হয়নি। নানি যা-তা রান্না করলেও খেতে কুটু মিয়ার রান্নার মতো অমৃত লাগতো। কিন্তু নানি কুটু মিয়ার মতো রহস্যময় চরিত্র নন, তিনি বরং হুমায়ূন আহমেদের খোলা বইয়ের মতোই সহজপাঠ্য। ভার্সিটি লাইফে ‘পায়ের তলায় খড়ম’ পড়েও বইয়ের একটি মুরুব্বি চরিত্রের সঙ্গে আমার নানির চরিত্রগত কিছু মিল পেয়েছিলাম। সম্ভবত মিজান সাহেবের মা বাড়ির জন্য ও বাড়িতে থাকা হাঁসের জন্য আমেরিকা থেকে হেঁটে বরিশাল রওয়ানা দেয়ার ঘটনার সঙ্গে আমার নানির কিছু মিল পেয়েছিলাম। নানিও ঢাকা থেকে গ্রামে যেতে চান নিজের কয়েকটা মুরগি ও প্রকৃতির মাঝে মাটির সঙ্গে থাকার জন্য। স্বভাবতই হুমায়ূনের বর্ণনায় হাস্যরস ছিল। কিন্তু বিষয়টা সিরিয়াস। বাস্তব প্রেক্ষাপট প্রতিকূল হলেও মাটির কাছে ফিরবার যে আজন্ম আকুতি সেটা আমার নানিদের প্রজন্মের মনোগঠনের মূল ভিত্তি। একে অস্বীকার বা অবজ্ঞা করা যায় না।
দেবী, নিশীথিনী, দ্বৈরথ, রূপার পালঙ্ক, রূপা, তোমাকে, মেঘ বলেছে যাব যাব, নি, শূন্য, ইমা, কুহক, বোতল ভূত, জনম জনম, নন্দিত নরকে, পারুল ও তিনটি কুকুর, অপেক্ষা, তেতুল বনে জ্যোৎস্না, গৌরীপুর জংশন ইত্যাদি উপন্যাস গোপনে বইয়ের ভেতরে করে পড়তাম স্কুল ও কলেজ লাইফে। ভাইয়া সব নতুন বই কিনতো, দ্রুত পড়ে আমাকে দিত। আমি, ভাইয়া আর আমার বন্ধু লীমা এবং পরাগ- এই কয়জনের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ আর কাজী আনোয়ার হোসেন খুব চালাচালি হত। বেশি হত পরাগ আর ভাইয়ার মধ্যে। এরা খুব দ্রুত পড়তে পারত।
আব্বু-আম্মুর ভয়ে আমি আর ভাইয়া বইগুলো টেক্সট বইয়ের ভেতরে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। ফলে, হুমায়ূন আহমেদের প্রতি আমাদের প্রজন্মের একটা গোপন প্রেম ছিল। একে তো গোপনে পড়ার আনন্দ, দ্বিতীয়ত যা লিখতো তার সবই যেন আমাদের কথা- ভালো না লেগে কোথায় যাবে? হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতি বছর বইমেলায় ভাইয়া হুমায়ূন আহমেদের প্রায় সবগুলো বই কিনেছেন। কেনার সঙ্গে সঙ্গে পড়া শেষ এবং আমার পাতে চলে আসতো। একটু পড়ালেখা জানা জ্ঞানী মানুষ দেখলেই মনে হতো এরা মনে হয় মিসির আলী, হিমু না হয় রূপা! কী অদ্ভুত এবং জীবন্ত এইসব চরিত্র হুমায়ূনের মতো বাংলাদেশে আর কেউ সৃষ্টি করতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ।
‘কোথাও কেউ নেই’- এর বাকের ভাই তো রীতিমতো কিংবদন্তি। দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় এমন চরিত্র বাংলাদেশে আর একটিও নেই।
বলা বাহুল্য বাংলা বিভাগে পড়ার অসুবিধাজনিত কারণে হুমায়ূনের প্রতি সেই গোপন প্রেমময় সম্পর্ক আর বেশিদিন টিকলো না। এই বিভাগে তখন ‘হুমায়ুন আজাদ কলোনির’ রমরমা দশা। সবাই কলকাতার সুধা আস্বাদনে বুঁদ হয়ে থাকে। যে দুই-একজন হুমায়ূন পড়ত, তাদের রেজাল্ট ভালো না।
সুতরাং সাহিত্য পাঠ করতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো একজন সহজাত এবং জাত সাহিত্যিককে আমি ভুলতে বসে গেলাম।
গত কয়েক বছর আগে আমি ‘প্রিয়তমেষু’ দ্বিতীয়বারের মতো পড়লাম। প্রথমবার পড়ার মতো সেই আবেগ আর কাজ করেনি। কিন্তু যেটা কাজ করেছে সেটা হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদকে আমার সাহিত্যপাঠের জ্ঞান দিয়ে নতুন করে আবিষ্কার করার উদ্দীপনা। এমন সহজ এবং বিচক্ষণ গদ্যশিল্পী যে আমাদের বাংলা সাহিত্যে ছিল আমি তা ‘চক্ষু মেলিয়া’ দেখতে পাইনি, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের আরোপিত হেজিমনির বাহুবলের ঠেলায়।
সর্বশেষ গত বছর পড়লাম ‘নলিনীবাবু বিএসসি’। মনুষ্য স্বভাবে যে মীনের বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে কিংবা সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে এতো চমৎকার চরিত্রায়ন এবং বয়ান কৌশলও যে বাংলাদেশের সাহিত্যে থাকতে পারে তা জানতে পারলাম। এই জানার ভেতর দিয়ে নিজের শিশুমনের ভালো লাগার প্রতি আবার আস্থা স্থাপন করলাম।
বাঙালি জীবনে হুমায়ূন পাঠের সুবিধা ও গুরুত্বকে আরও বেশি করে বিভিন্ন দৃষ্টিতে আলোচনা করা জরুরি। মেকি ও খাপছাড়া জীবনের খোলস ত্যাগ করে আমাদের বাংলাদেশের মানুষের আরও বেশি বেশি হুমায়ূন আহমেদীয় পাগলামোর প্রাক্টিস করা উচিৎ। তাতে অন্তত কিছু মানুষ নিজের জীবনটাকে স্বস্তিদায়ক পথে যাপন করতে পারতো।
পরিশেষে হুমায়ূন আহমেদের ‘বাসর’ কবিতাটি সম্পর্কে একটি কথা বলে তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি। প্রতিভার নানা নমুনা আমরা হুমায়ূনের মধ্যে দেখি। কিন্তু বেহুলার অতিরিক্ত ভালোবাসাই যে লখিন্দরের মৃত্যুর কারণ- এই নয়া মিথের স্রষ্টা আমাদের হুমায়ূন আহমেদ।
‘কী হয়েছে, তুমি এতো ঘামছ কেন?’ (বাসর)
নারীজাতির এই স্বভাবগত স্যাঁতস্যাঁতে প্রেমই যেন পুরুষকে মর্মে ও শরীরে মেরে ফেলে বলে মনে করেন কবি হুমায়ূন আহমেদ। সত্যিই আজব এক মিথ এবং থিমের স্রষ্টা তিনি!
জন্মদিনে হুমায়ূন আহমেদকে শ্রদ্ধা জানাই।

spot_img
spot_img

এধরণের সংবাদ আরো পড়ুন

আমার চরিত্রগুলোর উৎস কোথায় ।। শেষ পর্ব

অনুবাদ : সাজিদ উল হক আবির আমার উপন্যাস কাফকা অন দ্য শোরের মাঝপথে এসে আমি...

রীতা আক্তারের দুটি কবিতা

নির্জীব মনের চৌকাঠ ভেঙে যাচ্ছে অস্তিত্বের দেওয়াল ভীষণ মন খারাপের দিনে বৃষ্টি বুঝি নামলো ওই আগন্তুকের মতো ঝড়ো...

পাপড়ি-করামত আলী সাহিত্য পুরস্কার পেলেন তানভীর সিকদার

পাপড়ি-করামত আলী সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন তরুণ কবি তানভীর সিকদার। তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সেফটিপিনে গেঁথে...