Wednesday, February 1, 2023
হোম মুক্ত ভাবনা৭২-এর সংবিধানে দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছিল

৭২-এর সংবিধানে দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছিল

Published on

সাম্প্রতিক সংবাদ

মিয়ানমারে সেনা শাসনের দুই বছর, জনগণের নীরব প্রতিবাদ

বার্তাকক্ষ ,,দুই বছর হয়ে গেছে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের। সামরিক শাসন, গনতন্ত্রের অধিকার হরণ ও...

৭ দিনের আয়ে ইতিহাস গড়ল ‘পাঠান’

বার্তাকক্ষ ,,সমালোচকদের দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে দুর্দান্তভাবে ফিরলেন বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খান। দীর্ঘ চার বছরেরও...

ফিফা কাউন্সিলের নির্বাচনে হেরে গেলেন মাহফুজা আক্তার

বার্তাকক্ষ ,,টানা তৃতীয় মেয়াদে ফিফার কাউন্সিল মেম্বার হওয়া হলো না মাহফুজা আক্তার কিরণের। টানা...

আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী না : ঢাবি অধ্যাপক

বার্তাকক্ষ ,,পাঠ্যবই সংশোধনী কমিটিতে সদস্য হিসেবে কাজ করার কোনো আগ্রহ নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা...

মো. আবু জাফর সিদ্দিকী
বাংলাদেশের সংবিধানের সুবর্ণজয়ন্তীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের শাসনতন্ত্র রচনার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পটভূমির প্রাসঙ্গিক আলোচনা– আবহমান বাংলার অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কেবল ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধই ছিল না, মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলার কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-জনতার দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের এক চূড়ান্ত রূপ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্রিটিশ বণিক গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রে এদেশীয় বিশ্বাসঘাতকদের সহায়তায় ১৭৫৭ সালে স্বাধীন বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার পলাশীর আম্রকাননে নির্মমভাবে হত্যা করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এই অঞ্চলের ক্ষমতা দখল করে। ক্ষমতা দখলের পর থেকেই তাদের শাসন-শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ক্রমান্বয়ে বাংলার নির্যাতিত মানুষ বিদ্রোহ শুরু করে।
এদেশের সাঁওতাল-গারো-হাজং আদিবাসীদের বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী-ফকিরদের বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহ, মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, শান্তি ঘোষ, বাঘা যতিন, ক্ষুদিরাম প্রমুখ দেশপ্রেমিক বিপ্লবীদের নেতৃত্বে সংঘটিত অগ্নিযুগের সশস্ত্র জাতীয় বিপ্লব ও স্বদেশি আন্দোলনসহ জনগণের বহুমাত্রিক সংগ্রামে ব্রিটিশ শাসনের ভিতকে কাঁপিয়ে তুলেছিল। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালে এ অঞ্চলে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলেও সাম্প্রদায়িক ও দ্বিজাতি-তত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত দুই হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষা-ভাষীদের নিয়ে পাকিস্তান নামক এক অদ্ভুত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয় আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ
পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর জাতিগত বৈষম্য, শোষণ-শাসন, দমন-পীড়ন ও প্রতিক্রিয়াশীল নীতির বিরুদ্ধে বাংলার কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-জনতা, মুটে-মজুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে তীব্র আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তোলে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৫৪’-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২’-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৪’-এর স্বাধিকার আন্দোলন, ৬৬’-এর ৬ দফার আন্দোলন, সবশেষে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলার রাখাল রাজা শেখ মুজিব কারামুক্তির পর ঢাকার ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে ছাত্র জনতার বিশাল জনসমুদ্রে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন।
১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর মুক্তিতে এ দেশের কৃষক-শ্রমিক, কুলি-মজুর, ছাত্র-জনতা এক নবজাগরণে উজ্জীবিত হয়েছিল এবং তীব্র গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পতনের পর ছাত্র-জনতার উত্তাল সংগ্রাম ও গণদাবির মধ্য দিয়ে জেনারেল ইয়াহিয়ার অধীনে ৬ দফার ভিত্তিতে ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পাকিস্তানি স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া-ভুট্টোর ষড়যন্ত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে তারা সমগ্র বাঙালি জাতির ওপর নির্যাতনের পথ বেছে নেয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বাঙালি জাতির উদ্দেশে মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনামূলক ঐতিহাসিক ভাষণে ‘যার যা আছে তাই নিয়ে সমগ্র জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান করেন’। ৭ মার্চ থেকেই মূলত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলাদেশ পরিচালিত হতে থাকে এবং সমগ্র জাতি মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে ধানমন্ডির ৩২নং রোডের বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, যা তৎকালীন ইপিআর বাহিনী কর্তৃক ওয়্যারলেসযোগে দেশে-বিদেশে প্রচারিত হয়। নব প্রজন্মের জানা প্রয়োজন, হঠাৎ করে সেনা ছাউনি থেকে বেরিয়ে কারও হুইসেলে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি।
বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের ত্যাগ, নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্য দিয়ে তাঁর বলিষ্ঠ ও বিচক্ষণ নেতৃত্বে বাঙালি জাতির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হয়েছিল ৭১’-এ মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল নির্বাচিত গণপরিষদ কর্তৃক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল’৭১ কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলায় (মুজিবনগর) নবগঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথগ্রহণ করেন এবং তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও গণপরিষদ সদস্য ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলামের রচিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ ও অনুমোদনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক ও আইনানুগভাবে পরিচালিত হয় নবগঠিত সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।
১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের পূর্ব পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালে ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে জাতির পিতা মুক্তি পেয়ে লন্ডন ও ভারত হয়ে ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে কেন্দ্রবিন্দু করে হাত দেন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে। একই সঙ্গে নবজাতক বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে শুরু করেন কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা এবং দেশ পরিচালনার জন্য কাঙ্ক্ষিত শাসনতন্ত্র রচনার কাজে।
জাতির পিতা অতি অল্প সময়ের মধ্যে মাত্র ১০ মাসে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ লিখিত শাসনতন্ত্র আমাদের উপহার দিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় লিখেছিলেন, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, যেখানে সব নাগরিকের জন্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য নিশ্চিত হবে।
রাষ্ট্র পরিচালিত হবে ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে, যা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলে বিবেচিত হবে এবং সাম্যবাদী সমাজ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করা হবে। রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হবে বাংলার কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষসহ জনগণের অনগ্রসর অংশকে সব ধরনের শোষণ থেকে মুক্তি প্রদান করা। ১৯৭২ সালের সংবিধানে স্পষ্টভাবে লেখা হয়েছে– পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশ, নাগরিকদের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সব নাগরিকের জন্য সমতা, মানুষে-মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্যের বিলোপ সাধন করা। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্র কী হবে তা সুস্পষ্টভাবে সংবিধানে উল্লেখ করেছিলেন।
১৯৭২-এর সংবিধান প্রবর্তিত রাজনীতি, অর্থনীতি ছিল এ দেশের কৃষক-শ্রমিক, মুটে-মজুর, ছাত্র-জনতা ও মেহনতি মানুষের স্বার্থে। সংবিধানের ৪ মূলনীতির আলোকে দেশ চলতে শুরু করে। যার ফলে পাকিস্তানের পরাজিত শক্র এবং তাদের মদতপুষ্ট দেশীয় বুর্জোয়া শ্রেণি, পাকিস্তানপন্থি উচ্চাভিলাষী কিছু সামরিক অফিসার ও দলের অভ্যন্তরে বর্ণচোরা বিশ্বাসঘাতকদের সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী চক্র ক্ষুব্ধ হয়ে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে পাকিস্তানিদের দোসর ও স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি ক্ষমতা দখল করে লাখো শহীদের রক্তে লেখা সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘সমাজতন্ত্র’কে বাদ দিয়ে একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করার অপচেষ্টা করেছে, অন্যদিকে সামরিক শাসনকে বৈধতা দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় স্থায়ীভাবে ক্ষত সৃষ্টি করে। উচ্চ আদালতের রায়ে সামরিক ফরমান বৈধকরণের সংশোধনীসমূহ অবৈধ ঘোষণার ফলে পুনরায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে দেশকে বিচ্যুত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, যা এখনও অব্যাহত আছে। ৭২’-এর সংবিধানের কিছু পরিবর্তন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি এবং পাকিস্তানি আদর্শবান্ধব হিসেবে সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়।
১৯৭২ সালের সংবিধানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ ঘোষণা কেবল ঘোষণাই ছিল না, ওই সংবিধানের বিধানেই বলা হয়েছে যে সংবিধানের মৌলিক নীতিসমূহ বাংলাদেশ পরিচালনার মূলনীতি হবে। আইন প্রণয়নকালে রাষ্ট্র তা প্রয়োগ করবে, এই সংবিধান ও বাংলাদেশের অন্যান্য আইনের ব্যাখ্যাদানের ক্ষেত্রে তা নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে এবং উহা রাষ্ট্র ও নাগরিকদের জীবন ও কার্যের মূলভিত্তি হবে।
জাতির পিতা ৭২-এর সংবিধানে দেশের আপামর জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। মানবাধিকার, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় জাতির পিতা প্রণীত সংবিধানের নির্দেশনা অনুসরণের বিকল্প নেই। চার মূলনীতির মধ্যেই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দিকনির্দেশনা রয়েছে। ৫০-এর দশক থেকে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিফলন ঘটেছিল সংবিধানে। ৭২-এর সংবিধান ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কাঠামোগত রূপ। ৫ম ও ৭ম সংশোধনী দিয়ে সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জনগণের যে প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছিল, তা বিভাজনের কারণে সম্পূর্ণ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা নিয়ে আজও চলছে নির্লজ্জ অপচেষ্টা। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট কেনাবেচা করে ৩০ লাখ শহীদকে অসম্মানিত করেছে। অসম্মানিত করেছে আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযুদ্ধের ৫১ বছর পরেও মুক্তিযোদ্ধার যাচাই-বাছাইয়ের কথা শুনতে হয়। এটা জাতির জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও লজ্জাকর। রাষ্ট্রের ৪টি মূলনীতির মধ্যে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র ছেঁটে ফেলাসহ জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ধর্মের মিশ্রণ ঘটিয়ে জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞাই বদলে দেওয়া হয়েছিল।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে জাতির পিতা হত্যার বিচার বন্ধে জারিকৃত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে খুনিদের বিচারের মাধ্যমে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছেন এবং ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসাবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াসে জাতিকে ক্ষতমুক্ত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ওই সংশোধনীতে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
সংবিধান একটি দেশের দর্পণ, সংবিধানে দেশের সার্বিক কাঠামো দেখা যায়। দেশ কীভাবে চলবে, নাগরিকদের অধিকার, সরকারের শাসন ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, বৈদেশিক নীতি, রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থান, এসব বিষয়ে নির্দেশনা দেয় সংবিধান, যা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অপরিহার্য। সংবিধান ব্যতিরেকে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। সে কারণেই সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, ‘সংবিধান রাষ্ট্রের এমন এক জীবন পদ্ধতি, যা রাষ্ট্র স্বয়ং নিজের জন্য বেছে নেয়।’
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে। নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাছে মাতৃত্ব যেমন হার মানে, তেমনি আমাদের সংবিধানকেও হার মানতে হয়েছে বারবার। ৫০ বছরে বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সংবিধানে চালানো হয়েছে অস্ত্রোপচার-কাটাছেঁড়া। সংবিধান প্রণয়নের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৭টি সংশোধনী আনা হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে আত্মপ্রকাশের পরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে প্রত্যাবর্তনের পরের দিন ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। একই দিনে তিনি বাংলাদেশ অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারি করেন। অস্থায়ী সংবিধান আদেশে বলা হয়, সংবিধান রচনার জন্য বাংলাদেশে একটি গণপরিষদ গঠন হবে।
রাষ্ট্রপতি সরকার ব্যবস্থা থেকে পরিবর্তিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার প্রবর্তন হবে। সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল ড. কামাল হোসেনকে আহ্বায়ক করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৭২ সালের ১৭ এপ্রিল থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত সংবিধান কমিটির সভা এবং জনগণের মতামতের ভিত্তিতে ৯৮টি সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। এছাড়া ভারত ও ইংল্যান্ডসহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সংবিধান কমিটি একটি খসড়া সংবিধান তৈরি করেন এবং ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ‘খসড়া সংবিধান’ বিল আকারে উত্থাপিত হয়।
পরীক্ষা-নিরীক্ষান্তে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়। এ কারণেই ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান দিবস হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস থেকে আমাদের সংবিধান কার্যকর হয়েছে। গণপরিষদে সংবিধানের ওপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবেগ আপ্লুতভাবে বলেন, ‘এই সংবিধান শহীদের রক্ত দিয়ে লেখা, এই সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।’ শিল্পী আব্দুর রউফ ৯৩ পাতার লেখা সংবিধানটি হাতে লিখেন এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সংবিধানের অঙ্গসজ্জা করেছিলেন। বাংলাদেশের সংবিধান কেবল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইনই নয়, সংবিধানে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের চরিত্র বর্ণিত হয়েছে এবং দেশের ভৌগোলিক সীমারেখা বিধৃত আছে। বাংলাদেশ হবে প্রজাতান্ত্রিক, গণতন্ত্র হবে দেশের প্রশাসনিক ভিত্তি, জনগণ হবে সকল ক্ষমতার উৎস এবং বিচার বিভাগ হবে স্বাধীন। জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস কিন্তু দেশ পরিচালিত হবে আইন দ্বারা। জাতির পিতার ইচ্ছা ছিল সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।
বিভিন্ন সময়ে আমাদের সংবিধানে সংশোধনী আনা হয়েছে। এ সময়কালের ১০টি সংসদের মধ্যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদকালের সপ্তম সংসদে সংবিধানে কোনও সংশোধনী আনা হয়নি।
সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের অভিভাবক, সংবিধান প্রণয়নের ৫০ বছর পূর্তির ঐতিহাসিক সুবর্ণজয়ন্তীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ৩০ লাখ শহীদের রক্তের আখরে লেখা সংবিধানকে সমুন্নত রেখে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতির পিতার স্বপ্নপূরণ আজ সময়ের দাবি। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
লেখক: বিচারপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ; জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে হত্যা মামলার আপিল বিভাগে নিয়োজিত সরকারি কৌঁসুলি এবং ১/১১ সরকারের আমলে কারারুদ্ধ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী) ব্যক্তিগত কৌঁসুলি।

spot_img
spot_img

এধরণের সংবাদ আরো পড়ুন

ভাষা চেতনার মাসে আশা

ড. হারুন রশীদ বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা এবং একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসও। রক্তস্নাত...

উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া ও বিএনপির রাজনীতি

ড. মিল্টন বিশ্বাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল ও আশুগঞ্জ) আসনের উপ-নির্বাচনের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া...

সিলেক্টিভ প্রতিবাদ

প্রভাষ আমিন ফেসবুক আমার খুব পছন্দের এবং খুব অপছন্দের জায়গা। একই সঙ্গে পছন্দ এবং অপছন্দ...