প্রতিহতের নামে সহিংসতার মধ্যে কাল নির্বাচন

0
26

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
বাংলাদেশে কাল নির্বাচন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। শেখ হাসিনার অধীনে এটি তৃতীয় নির্বাচন যেটি বর্জন করছে বিএনপিসহ বেশ কিছু দল। নির্বাচন একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। তবে বিএনপির যে দাবি, অর্থাৎ নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার, তা সংবিধানে পুনরুজ্জীবিত করতে সম্মত হয়নি শেখ হাসিনার সরকার। ফলে নির্বাচনে আসেনি বিএনপি।
এই নির্বাচন যাতে এভাবে না হয় সেজন্য আন্দোলন হয়েছে, সহিংসতা হয়েছে। এখনো হচ্ছে। শুক্রবার রাতে ঢাকার গোপীবাগে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন দিয়ে বহু মানুষ খুন আর দগ্ধ করেছে হারমাদরা। স্কুল পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। তবুও নির্বাচন আটকাতে পারেনি বিএনপি। তবে এই সহিংসতা ভোটার উপস্থিতিতে কী প্রভাব রাখে সেটা দেখার বিষয়।
এই আলোচিত নির্বাচনে আমেরিকা, রাশিয়া এবং চীনের মতো পরাশক্তিগুলোও জড়িয়ে পড়েছিল, জড়িয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ কেন্দ্রিক রাজনৈতিক বিতর্কে। বিএনপি আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে তাদের পক্ষে যত যুক্তি দেয়া যায় সেসব দিয়ে। আমেরিকা সে অনুযায়ী প্রতিক্রিয়াও দেখিয়েছে যা দুই দেশের সম্পর্কে দৃশ্যমান টানপোড়েন সৃষ্টি করেছে। তবে শেখ হাসিনা নিজে অটল ছিলেন যে নির্বাচন বর্তমান সরকারের অধীনে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন কর্তৃক অনুষ্ঠিত হবে এবং সুষ্ঠুভাবেই হবে।
সব অনিশ্চয়তা কাটিয়ে সেই নির্বাচন কাল হতে চলেছে। দাবি মানা না হলে বিএনপি নির্বাচনে আসবে না – এই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে বিষয়টি ছিল নির্বাচনের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা। সে কাজটি শেখ হাসিনা করেছেন দক্ষতার সাথেই। তাঁকে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হয়েছে এই নির্বাচনের জন্য। প্রথমত কেউ যেন ২০১৪ সালের মতো বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসতে না পারেন, মাঠে যেন প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে এবং ভোট কেন্দ্রে যেন ভোটার উপস্থিতি ভালোভাবেই দৃশ্যমান হয়।
নিজের দলের মনোনয়নের বাইরে দলীয় স্বতন্ত্রদের তাই সুযোগ দেয়া হয়েছে, জাতীয় পার্টি, ১৪ দলের শরিকদের সাথে আসন সমঝোতা করা হয়েছে এবং নতুন দল ও ব্যক্তিকে নির্বাচনে আসতে উৎসাহিত করা হয়েছে। দলীয় স্বতন্ত্রদের সাথে নৌকার প্রার্থীদের নানা জায়গায় সংঘাত ও সহিংতা হয়েছে, একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন এবং সেগুলো নির্বাচনের পরিবেশকে অনেক আসনেই উত্তপ্ত করেছে।
নির্বাচন কমিশন, মাঠ প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এসব জায়গায় বেগ পেতে হয়েছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে। কিছু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, নির্বাচনী ক্যাম্প জ্বলেছে, আহত হয়েছে অনেকে।এতসব ছাপিয়েও কাল নির্বাচনের জন্য অপেক্ষায় আছে জাতি।
সামগ্রিক বিবেচনায় এবারের নির্বাচনটি নির্বাচনী প্রথায় কিছুটা হলেও ব্যতিক্রমধর্মী যে বড় লড়াইটা হচ্ছে আওয়ামী লীগের নিজের মধ্যে। দলের মনোনীত বনাম দলীয় স্বতন্ত্র বিষয়টি একেবারেই নতুন এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এই দ্বন্দ্ব দল কীভাবে সামাল দিবে সেটাও দেখার বিষয় হবে।
এবারের নির্বাচন এমন এক প্রেক্ষাপটে হচ্ছে যখন বাংলাদেশের বিভাজিত রাজনীতির পরিসরে আমেরিকার বড় সক্রিয়তা দেখা গেছে। চুপ থাকেনি রাশিয়া এবং চীনও। ইউরোপীয় ইউনিয়নও অনেক কথা বলেছে। তবে কোনো পক্ষই স্পষ্ট করে বলেনি যে, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্ধীনে নির্বাচন চায়। তারা সংলাপের কথা বলেছে বারবার।
বিশ্ববাসীর চোখ আগামীকালের নির্বাচনের দিকে। তাই নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবাধ করার বিকল্প নেই এবং সেটাই হবে জনগণের দিক থেকে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনকে কঠোর থাকতে হবে যে—যেখানেই সহিংস ঘটনা ঘটবে, সেখানেই তাৎক্ষণিক ভোটগ্রহণ বন্ধ হয়ে যাবে এবং যে প্রার্থীর সমর্থকরা সহিংসতা ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হবে, ওই প্রার্থীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুলিশ এবং প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
এত এত টেলিভিশন, অনলাইন, পত্রিকা এবং শত শত পর্যবেক্ষক থাকছে নির্বাচন দেখতে। তাই প্রতিটি কেন্দ্রে ভোট কারচুপির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে সবার কাছে মনে হয় অপকর্ম করে কেউ পার পাচ্ছে না।
যা বলছিলাম, আমরা জানি ২০১৪ সালের মতো না হলেও এবারও জামায়াত-বিএনপি নির্বাচনে সহিংসতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টির জন্য এর মধ্যেই সহিংসতা শুরু হয়েছে, ভোট কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে এমন স্কুল পোড়ানো হয়েছে।
এই পরিবেশটাই চায় একটি মহল। সহিংসতা নির্বাচনী পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে এবং ভোটাররা উদ্বিগ্ন হয়। অনেক জীবনের অবসান হবে, সম্পদ ধ্বংস হবে, পরিস্থিতি সহিংস হয়ে উঠবে, কিন্তু সহিংসতা সৃষ্টিকারীরা নির্বাচন ঠেকাতে সফল হবে বলে মনে হচ্ছে না। পরিস্থিতি এমন যে, যেকোনো মূল্যে নির্বাচন প্রতিহত করতে চায় বিএনপি, জামায়াতসহ তাদের সহযোগীরা, অন্যদিকে যে কোনো মূল্যে সন্ত্রাস দমন করে নির্বাচনে প্রতিজ্ঞ সরকার ও নির্বাচন কমিশন।
অনেকদিন ধরেই এই চোরাগুপ্তা হামলা চলছে। হরতাল আর অবরোধ ঘোষণা হলেই শুরু হয় আগের দিন থেকে শুরু হয় থেকে মানুষ ও যানবাহন পোড়ানো। কিন্তু যারা এটা করছে তারা হয়তো বুঝতে পারছেনা যে, রেললাইনের ফিশ প্লেট তুলে ফেলা, রেল ও গণপরিবহনে আগুন লাগানো কোনো ভাল ও কার্যকরী রাজনৈতিক কৌশল না। তবুও সরকারকে চাপে ফেলতে যতো দিক দিয়ে সম্ভব সমন্বিত সহিংসতা চলছে এবং এর মধ্যেই কাল নির্বাচন হচ্ছে।
লেখক: প্রধান সম্পাদক, গ্লোবাল টেলিভিশন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here