৭ জানুয়ারি কেন ভোট দিতে যাবেন?

0
29

মো. জাকির হোসেন
আগামী ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪৪টি দলের মধ্যে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৮টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের বিপরীতে ১৯৭০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। বিএনপি ও তার মিত্ররা নির্বাচন বর্জন করে হরতাল-অবরোধ, সহিংসতা-নাশকতা ও ভোটদানে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থায় লবিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচন প্রতিহত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন বিষয়ে সংলাপের জন্য রাষ্ট্রপতি বিএনপিকে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন একাধিকবার সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে।
তফসিল ঘোষণার পরও নির্বাচন কমিশন বারবার তাদের নির্বাচনে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, বিএনপি নির্বাচনে এলে তফসিল পেছানো হবে। নির্বাচন কমিশনকে ‘গরু-ছাগল’, ‘পা-চাটা গোলাম’, ‘আওয়ামী মাফিয়া’ বলে আখ্যায়িত করে তাচ্ছিল্যভরে সেসব আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি।
তাদের এক দাবি- শেখ হাসিনা পদত্যাগ না করলে কোনও আলোচনা নয়। কেবলমাত্র শেখ হাসিনার পদত্যাগের পরই সংলাপ হতে পারে। ভোটে অংশগ্রহণ করা বা না করা যে কোনও রাজনৈতিক দলের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা। কিন্তু নির্বাচন প্রতিহত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৮২ ধারা অনুযায়ী ভোটদানে বাধা প্রদানের শাস্তি ১ বছর থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।
এমতাবস্থায় বাংলাদেশের সব দায়িত্বশীল নাগরিকের প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ- আসুন আমরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করে বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে সহযোগী হই। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, একজন সাধারণ নাগরিকের পক্ষে এমন আহ্বান-অনুরোধ জানানো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। আপনি সঠিক বলেছেন। অন্য নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচন ভিন্ন।
বিএনপি ও তার মিত্ররা বিশেষ করে পশ্চিমাদের সাথে বিশেষ যোগাযোগ আছে এমন কিছু সুশিল-বুদ্ধিজীবী বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থাকে অসত্য, বিকৃত তথ্য দিয়ে ও লবিং করে দেশকে কৃত্রিম সংকটে ফেলেছে। কোনও কোনও এনজিও বিদেশিদের উসকে দিতে মানবাধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছে। মওকা পেয়ে পশ্চিমা কোনও কোনও দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে থাবা বসাতে উদ্যত হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেশ দখল নয়, বাণিজ্য করতে এসেছিলো। কিন্তু মীরজাফর, জগৎশেঠ, ইয়ার লতিফ, রায় দুর্লভ, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, কৃষ্ণবল্লভ, মানিক চন্দ্র আর ঘষেটি বেগমরা নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা করে বাংলার স্বাধীনতা তুলে দেয় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। এরপর টানা ১৯০ বছর ধরে বাঙালির ললাট লিখন ইংরেজদের গোলামি করা।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কাগুজে স্বাধীনতা পেলেও, পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিদের বিরুদ্ধে একের পর এক ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্রের দোসর হয় এ দেশেরই কিছু বিশ্বাসঘাতক। ’৭১ সালে অসম মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের নৃশংসতায় জীবন দিতে হয় ৩০ লাখ বাঙালিকে। বাঙালি জাতিসত্তাকে পাল্টে দিতে পরিকল্পিতভাবে ২-৩ লাখ বাঙালি নারীকে ধর্ষণ করা হয়। বাঙালি জাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পঙ্গু করে দিতে এ দেশের বিশ্বাসঘাতকদের সহায়তায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের বাসা থেকে ধরে নিয়ে অত্যন্ত ঠাণ্ঠা মাথায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। বাংলার স্বাধীনতা নস্যাৎ করতে পাকিস্তান-পেন্টাগনসহ দেশি-বিদেশি মদতে বাঙালি জাতির প্রাণভোমরা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। মীরজাফর, জগৎশেঠ, ইয়ার লতিফ, রায় দুর্লভ, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, কৃষ্ণবল্লভ, মানিক চন্দ্র আর ঘষেটি বেগমদের নব্য প্রতিভূরা আবার সক্রিয় হয়েছে। অতি চড়া মূল্যে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা- সার্বভৌমত্ব ঘিরে যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তার দায় যতটা না বিদেশিদের তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী দেশবিরোধী কিছু বর্ণচোরা বিশ্বাসঘাতক। যে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ঘিরে যে ষড়যন্ত্র হচ্ছে তার প্রমাণ কী?
আমি আমার বক্তব্যের সমর্থনে কয়েকটি তথ্য উপাত্ত তুলে ধরছি –
এক. ২০২৪ সালে আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও ওশেনিয়া মহাদেশের ৬৪টি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় নির্বাচন মিলিয়ে প্রায় ১৫১টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এশিয়ায় বাংলাদেশ ছাড়াও আজারবাইজান, জর্জিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কোম্বোডিয়া, ইরান, মঙ্গোলিয়া, তাইওয়ান, তুরস্ক, দক্ষিণ ওশেটিয়া, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও ভূটানের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের নির্বাচন প্রকৃত অর্থে কোনও নির্বাচনই নয়। পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনায় নির্বাচনের দিন ১৬ জন ও তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনের আগে আরও ১৯ জনসহ মোট ৩৫ জন নিহত হয়েছে। অসংখ্য আহত হয়েছে। নির্বাচনে ব্যালট ছিনতাই, ব্যালট বাক্স পুড়িয়ে দেওয়া, ব্যালট বাক্সে পানি ঢেলে দেওয়া, জোর করে ব্যালট পেপার সিল দেওয়াসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ কিংবা ইইউ’র কোনও উদ্বেগ বা বিবৃতি নেই।
ইসরায়েল প্রতিদিন নিরীহ-নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের গণহত্যা করছে ইতোমধ্যে ২৩ হাজার নিরপরাধ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে যার প্রায় অর্ধেকই শিশু। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার বাসিন্দাদের আফ্রিকায় পাঠানোর পরিকল্পনা করছে দখলদার সন্ত্রাসী ইসরায়েল। এ ব্যাপারে তারা কঙ্গোসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে গোপন আলোচনা করছে জানা গেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
তথ্যানুযায়ী, এসব দেশকে ইসরায়েল আহ্বান জানিয়েছে তারা যেন ফিলিস্তিনিদের শরণার্থী হিসেবে গ্রহণ করে। এর মধ্যে কঙ্গো রাজিও হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বের মানুষ অর্ধাহার- অনাহারের নিদারুণ কষ্টের জীবন-যাপন করছে। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে চীন-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে
এতসব ভয়ঙ্কর বৈশ্বিক সঙ্কট সত্ত্বেও কেবলমাত্র বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রায় প্রতিদিন হোয়াইট হাউজে সংবাদ সম্মেলন স্বাভাবিক ঘটনা নয়। কয়েকজন কংগ্রেসম্যানের বিশেষ সক্রিয়তা, কিছু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওর অস্বাভাবিক দৌড়ঝাঁপ ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত বহন করে বৈকি।
দুই. শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, জার্মানিসহ এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, ও আমেরিকা মহাদেশের বহু রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণ।
যুক্তরাজ্যের (ইউকে) প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একজন সফল অর্থনৈতিক নেতা হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, ‘আপনি আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। আমি আপনাকে অনেক বছর ধরে অনুসরণ করছি। আপনি একজন সফল অর্থনৈতিক নেতা। আপনি আমার দুই মেয়ের জন্য মহান অনুপ্রেরণা।’
ভূমিহীন ও গৃহহীন বাংলাদেশের জনগণকে সরকারি খরচে বাড়ি দেওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে শেখ হাসিনার গৌরবময় ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।
২০১৭ সালে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন ঢাকায় এসে বাংলাদেশের উন্নয়নের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেন তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় বাংলাদেশ ভ্রমণে না আসতে পারার কারণে দুঃখিত। তিনি আরও বলেন বাংলাদেশের বিষয়ে গর্বিত হওয়ার জন্য তার পক্ষে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট শেখ হাসিনাকে এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘আপনি বিশ্বের জন্য সহানুভূতি ও উদারতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।’ যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান এন্ড্রু গারবারিনো বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অভাবনীয় উন্নতি বাকি বিশ্বের জন্য উদাহরণ হতে পারে। বাংলাদেশ গত দেড় দশকে যে সাফল্য দেখিয়েছে, তা অর্জনের জন্য অন্যান্য দেশের চেষ্টা করা উচিত।’
কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বলেছেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নতি, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নতির মতো বিষয়গুলো এ দেশের মানুষের সামনে নতুন নতুন সম্ভাবনা এনে দিয়েছে।’
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রো বাংলাদেশে সফরে এসে বলেছেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ট্রিমেন্ডাস উন্নতি করেছে। ফ্রান্স সবসময় বাংলাদেশের পাশে রয়েছে।’
শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘ফ্রান্স এই নেতৃত্বকে সবসময় সহযোগিতা করবে।’
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ দারুণ কিছু সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হয়েছে এবং দ্রুত বর্ধনশীল বিশ্বের কাতারে নিজেদের স্থান করে নিয়েছে। ৬ শতাংশের অধিক জিডিপির মাধ্যমে বাংলাদেশ তার দেশের মানুষের জীবনকে উন্নত করছে এবং বিশ্ব থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। চীন বাংলাদেশের এমন উন্নয়নে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে।’
বঙ্গবন্ধুকন্যার একান্ত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেন, ‘আপনাদের দেশ অগ্রগতি ও ক্রমাগত উন্নয়নের দিকে স্থিরভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মর্যাদা অর্জন করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার বাংলাদেশ।’
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশের বিস্ময়কর উন্নয়ন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস এবং বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও করপোরেট সেক্রেটারি মার্সি টেমবন।সেই সঙ্গে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন ও সাফল্যকে অনুকরণীয় বলে অভিবাদনও জানিয়েছেন দু’জন। মহামারির ক্রান্তিকালে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বের প্রশংসা করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস পার্লামেন্টে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন যুগান্তকারী কাজ ও সাহসী প্রকল্পের প্রশংসা করে মোশন পাস করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট সিনেট বাংলাদেশের প্রশংসা করে গত মার্চে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক শান্তি-স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধিতে অবদান এবং মানবিকতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে ওই প্রস্তাব গৃহীত হয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও আর্থসামাজিক অগ্রগতির প্রশংসা করে কংগ্রেসনাল বাংলাদেশ ককাসের পক্ষ থেকে সাউথ ক্যারোলিনার রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান জো উইলসন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫২তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে মার্কিন কংগ্রেসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং আর্থসামাজিক অগ্রগতির স্বীকৃতির প্রশংসা করে এই প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয়েছে।
বৈশ্বিক রাজনীতির আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিকস’১৭৩ জন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে অনুসন্ধান করে যে ফলাফল প্রকাশ করেছে তাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বের তৃতীয় সৎ ও পরিচ্ছন্ন সরকার প্রধান এবং বিশ্বের চতুর্থ কর্মঠ সরকার প্রধান হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘দ্য স্ট্যাটিসটিক্স ইন্টারন্যাশনাল’ তাদের এক জরিপে বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বেছে নিয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে দক্ষ নেতৃত্ব, রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণাবলি, মানবিকতা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত থাকা।
শেখ হাসিনা অন্তত পক্ষে ৩২টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও পদকে ভূষিত হয়েছেন। এসব পুরস্কার ও পদকের মধ্যে এমন মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ও পদক রয়েছে যা জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ও জাতিসংঘ মহাচিব বান কি-মুন পেয়েছেন। সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও ব্রিকস সম্মেলন ও জি-২০ সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানানো শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতির বহিঃপ্রকাশ।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক সন্ত্রাসবাদ নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস এর ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্লোবাল টেরোরিজম ইনডেক্স বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ সূচকে পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের চেয়েও বাংলাদেশ অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে
শিশু অধিকার বিষয়ে একমাত্র বৈশ্বিক সূচক ‘কিডসরাইটস ইনডেক্স’ এর প্রতিবেদন বলছে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের শিশুরা ভালো আছে। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ রোল মডেল। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) প্রতি বছর ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ’ নামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্সে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবার চেয়ে ভালো করছে।
ডব্লিউইএফ গতকাল জেনেভা থেকে ২০২৩ সালের যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তাতে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন উপসূচকে বাংলাদেশ প্রথম। শিক্ষা উপসূচকে নারীদের মাধ্যমিক শিক্ষায় ভর্তি মানদণ্ডেও বাংলাদেশ প্রথম অবস্থানে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য উপসূচকে জন্মহারের মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থান ১ নম্বরে। দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতায় বাংলাদেশ সারা বিশ্বে প্রশংসিত। ২০২৩ সালে প্রকাশিত ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ডেমোক্র্যাসি ইনডেক্সে ১০-এর মধ্যে ২.৯ স্কোর নিয়ে কম্বোডিয়ার অবস্থান ১৩০তম। আর লিবারেল ডেমোক্র্যাসি ইনডেক্সে ০.০৭ স্কোর নিয়ে কম্বোডিয়ার অবস্থান ১৬০তম।
অন্যদিকে, ৬.০০ স্কোর নিয়ে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ডেমোক্রেসি ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ৭১তম। তার মানে, ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ডেমোক্রেসি ইনডেক্সে বাংলাদেশ ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রের দ্বারপ্রান্তে। আর মাত্র ০.০১ স্কোর করলেই ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রের কাতারে শামিল হবে বাংলাদেশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশও রয়েছে।
এশিয়া-অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক দেশের হাইব্রিড শাসনের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫তম। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বাইরে বাংলাদেশের রয়েছে সর্বোচ্চ আঞ্চলিক গড়।
গত কয়েক মাস ধরে বিরোধীদল বাধাহীন সভা-সমাবেশ করেছে। এই সময় কোনও বিচার-বহির্ভূত হত্যা কিংবা গুমের ঘটনা ঘটেনি। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র ভিসানীতি আরোপ করেছে। নেপথ্যে কি এমন কারণ থাকতে পারে যেজন্য ভিসানীতি ও ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হলো?
বৈশ্বিক অনেকগুলো গবেষণা বলছে, প্রায় ১৫ বছরের ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির জীবনযাত্রার মানের সবচেয়ে বড় উন্নতিতে অবদান রেখেছেন। চীন ও ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থকেও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন তিনি। সাম্প্রতিক মার্কিনভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের’ এক সমীক্ষা শেখ হাসিনাকে শতকরা ৭০ ভাগ রেটিং দিয়েছে। গত ৪ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রিট জার্নাল লিখেছে, ৭৬ বছর বয়সী শেখ হাসিনার রয়েছে এমন সব অর্জন, যা অনেক উন্নয়নশীল দেশের নেতারাও দাবি করতে পারেন না।
শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদ দমন করেছেন, বিভিন্ন সময় ফিরে আসা সামরিক শাসনের বিপরীতে জনগণের শাসনের আধিপত্য নিশ্চিত করেছেন। এছাড়াও চরম দরিদ্রতা থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে আনা এবং নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাস অনেক বেশি উজ্জ্বল বলেও জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। প্রতিবেদনে আরও প্রকাশ, বাংলাদেশে সবসময়ই স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কিন্তু এমন অনেক দেশকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যাদের রেকর্ড বাংলাদেশের চেয়েও অনেক বেশি খারাপ।
তিন. এদেশের কিছু মানুষ অসত্য-বিকৃত তথ্য দিয়ে ও লবিং করে বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থাকে কেবল হাসিনার বিরুদ্ধেই বৈরি করে তুলেনি, বরং দেশকে কৃত্রিম সংকটে ফেলেছে।
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও জাতিসংঘে সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
চার. বাংলাদেশকে বিনা দোষে দোষী সাব্যস্থ্য করা হয়েছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশসমুহের ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদের ক্রসফায়ারের শিকারে পরিণত করা হয়েছে বাংলাদেশকে।
যুক্তরাজ্যের ‘ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)’ বলছে, ২০৪০ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের ২০তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে। অন্যদিকে পৃথিবী বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান বোস্টন কনসালটিং গ্রুপ বলছে, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দেশ হবে।
গত ২৮ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩৭ সালের মধ্যে বিশ্বের ২০তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ।
জাপান ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেআইটিও) তথ্য অনুযায়ী ২০০৮ সালে বাংলাদেশে চালু জাপানি কম্পানির সংখ্যা ছিল ৭০। এর প্রায় এক যুগের মাথায় (চলতি বছরের এপ্রিল) দেশে চালু জাপানি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে ৩২১টিতে দাঁড়িয়েছে। নামিদামি জাপানি কোম্পানিগুলো এখন বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের জোয়ার আসছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বলেছেন, আড়াই হাজারে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে কারখানা করবে জাপানি বিনিয়োগকারীরা।
শুধু অর্থনৈতিক অঞ্চল নয়, দেশি-বিদেশি বিশ্লেষকরা বলছেন, কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে জাপানের সহায়তায় নির্মিতব্য গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ‘গেম চেঞ্জার’হবে।
পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, ঢাকা ও চট্টগ্রামের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকার সাথে দক্ষিণবঙ্গ ও কক্সবাজারের রেলসংযোগ, কর্ণফুলী নদীর নিচের টানেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ মেগা প্রজেক্টগুলো কেবল আমাদেরকেই নয় বিশ্বকেও চমকে দিয়েছে।
উন্নয়ন অগ্রগতির এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে আমাদের ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে। দেশের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র মোকাবিলার একমাত্র কার্যকর দাওয়াই হলো জনগণের শক্তি তথা অধিকসংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।
গণতন্ত্রে নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতা বদলের আর কোনও বিকল্প নেই। বিএনপির নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আইনগতভাবে বাস্তবায়ন অসম্ভব। সর্বোচ্চ আদালত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করেছেন। আদালতের রায়কে নির্বাহী বিভাগ কিংবা সংসদ বাতিল করতে পারে না। এর যে কোনও পরিবর্তন, পরিমার্জন কেবল আদালতই করতে পারেন। বিএনপি যে আন্দোলন করছে তার অংশ হিসাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারতো। নির্বাচনে কারচুপি, জালিয়াতি হলে জনগণকে সাথে নিয়ে গণবিস্ফোরণ ঘটাতে পারতো। প্রয়োজনে বিদেশিদের কাছে কারচুপি, জালিয়াতির তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরে সরকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করতে পারতো। কিন্তু বিএনপি তা করেনি। বিএনপি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে নাগরিক হিসোবে আমাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের দায়িত্বপালনে আমরা কেন বিরত থাকবো?
লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here