মণিপুরী সম্প্রদায়ের মেয়ে অনিমার কাহিনি আছে যে উপন্যাসে

0
27

তানজিনা হোসেন
তোমাকে অভিনয় করতে হবে।
চিশতীর কথা শুনে একেবারে চমকে উঠল অনিমা। ‘কী বলছ এসব? আমি কী করে…?’
‘আরে, রজতদা তোমাকে আজই নিয়ে যেতে বলছেন।’ চিশতী উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘জানো না চুমকি অ্যাকসিডেন্ট করেছে? বাড়ি গেছিল, কুমিল্লায়। ফেরার পথে বাস খাদে। পা ভেঙে গেছে। এখন পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি। গ্রুপে এখনই একটা মেয়ে লাগবে। নাটক নামার আর মাত্র বারো দিন বাকি।’
‘কিন্তু চিশতী…’
চিশতী তার দুটো আঙুল অনিমার ঠোঁটের ওপর রাখল, ‘শ্শ্শ্…। কাজ শেষ করো। আমি নিতে আসব বিকালে।’
সারা দুপুর একটু পরপর নিজের ঠোঁটের ওপর হাত বোলাল অনিমা। শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠল বারবার। চিশতীর শক্ত, সিগারেটের গন্ধওয়ালা খসখসে আঙুলের স্পর্শ। অনিমার ইচ্ছে হচ্ছিল, আরও অনেকক্ষণ ওই আঙুল দুটো তার ঠোঁটের ওপর চেপে থাকুক। দোকানের কাজে মন লাগাতে পারছিল না অনিমা। একটা অজানা আশঙ্কাতেও মন কেমন করছিল। এই এত বড় মঞ্চ, এত সব শিক্ষিত শহুরে মানুষ দর্শকের আসনে, এত আলো আর এত বাজনা, আর সে একটা গ্রামের মেয়ে, যে কোনো দিন শেক্‌সপিয়ারই পড়েনি। পড়বে কী, নামই তো শোনেনি।
একটা জীর্ণ, ফ্যাকাশে রঙের সালোয়ার-কামিজ পরেছে আজ অনিমা। জামায় ইস্তিরি নেই। ওড়নাটার এক কোণ একটু ছেঁড়া। বাসায় গিয়ে কি কাপড়টা পাল্টে নেবে? চুলটাও কেমন জবজবে, শ্যাম্পু করা হয়নি কাল। চোখের নিচে কালি। রিকশায় বসে হাসি পেল অনিমার, ‘আমি হব রাজপুত্রের প্রেমিকা? কী যে বলো!’
‘কেন? না হয় আমি একজন গরিব অভিনেতা, কিন্তু তোমার রাজপুত্রের প্রেমিকা হতে সমস্যা কোথায়?’ অনিমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় পুরে চিশতীও হাসে।
‘চোখের নিচে কালি পড়ছে। গলার হাড় বের করা। ফকিন্নির মতো চেহারার মেয়ের সঙ্গে রাজপুত্রের প্রেম? হা হা হা।’
চিশতী হঠাৎ অনিমার গলার পেছনে মুখ নিয়ে ওর কাঁধে ছোট্ট একটা চুমু খেল। তারপর অনিমার ঘাড়ের চুলগুলো আঙুল দিয়ে জড়াতে জড়াতে বলল, ‘যদি রাজপুত্রের সঙ্গে কখনো প্রেম হয়েই যায়, তো আমাকে কি ভুলে যাবে?’
অনিমার বুকের থরথর আর থামে না। কার্তিকের এই রাঙা বিকালে উন্মুক্ত শহরের রাস্তায় তার ইচ্ছে হয়, রিকশার ভেতর চিশতীকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে। তার চওড়া বুকে মুখ ঘষে। কিন্তু বাস্তবে নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল, ‘আমি যে লেখাপড়া জানি না ওদের মতো। ওরা কত কী পড়াশোনা করে। কত কিছু জানে!’
অনিমার প্রশ্নের উত্তর দেন রজতদাই। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলেন, ‘তুমি গাইতে পারো?’
‘জি, কীর্তন গাইতে পারি।’ অনিমা মাটির দিকে চেয়ে ভয়ে ভয়ে উত্তর দেয়।
‘নাচতেও পারো?’
অনিমা মাথা ওপর-নিচ করে, ‘রাসলীলায় নাচছি গ্রামে। আমি বেশির ভাগ চন্দ্রাবলী হতাম।’
রজতদা শিস দিয়ে উঠলেন, ‘চন্দ্রাবলী! বাহ্‌! চন্দ্রাবলী ভালোবেসেছে কৃষ্ণকে, সঁপে দিয়েছে নিজেকে কৃষ্ণপ্রেমে। কিন্তু বিনিময়ে কী পেয়েছে বলো তো?’
অনিমা এবার সরাসরি রজতদার চোখের দিকে তাকায়, ‘চোখের জল আর দুর্নাম। আর কিছু না।’
রজতদা উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়লেন চেয়ার ছেড়ে, ‘যদি তুমি চন্দ্রাবলীর বেদনা বুঝতে পারো, তবে ওফেলিয়াকেও বুঝবে। ওফেলিয়াও নিষ্পাপ, পদ্মফুলের মতো। তার প্রেমে কোনো স্বার্থ নেই, বড় কোনো চাওয়াও নেই। আর ওফেলিয়াও প্রেমের বিনিময়ে পেয়েছে কেবল বেদনা। কেবলই কষ্ট। চিশতী, তুই অনিমাকে স্ক্রিপ্ট বুঝিয়ে দে। ও পারবে।’
রিহার্সাল কক্ষের চার দেয়াল গমগম করে উঠল একটু পর।
চিশতীকে হতাশ দেখাল একটু। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল সে, ‘শীলার সঙ্গে তোমাকে একটুও মানায় না, অনিমা। তুমি রাগ করো আর যা-ই করো, শীলা আর তোমার মধ্যে অনেক তফাত।’
সে রাতে রিহার্সাল শেষে চিশতীর সঙ্গে খেয়েদেয়ে ফিরতে অনিমার দেরি হলো অনেক। কেন যেন শীলাকে ফোন করা হয়নি, শীলাও ফোন করে জানতে চায়নি কিছু। কাঁটাবনে ওদের ছয়তলা বিল্ডিংয়ের টিমটিমে আলো জ্বলা সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় বুকটা ঢিপঢিপ করছিল অনিমার। শীলা রাগ করেনি তো। কিন্তু ঘরের দরজার বাইরে থেকে হাসির শব্দ শুনে একেবারে অবাক হয়ে গেল সে।
একটু ইতস্তত করে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে মনটা ভালো হয়ে গেল তার। তাদের বিছানায় পা তুলে বসে আছেন মোহিনী ম্যাডাম। মুখে চড়া মেকআপ, চুলে নতুন বব ছাঁট দিয়েছেন। ভারি সুন্দর লাগছে তাকে আজ। তার পাশে মেঝেতে একটা ম্যাট পেতে বসে গল্প করছে শীলা। অনিমাকে দেখে দুজনই হই হই করে উঠল। শীলা বলল, ‘আরে, কই ছিলি এতক্ষণ। ম্যাডাম এতক্ষণ ধরে তোর জন্যই অপেক্ষা করে আছেন। দারুণ খবর আছে!’
অনিমা ব্যাগ রেখে হাসল, ‘আমার কাছেও দারুণ খবর আছে। আগে তোরটা শুনি।’
শীলা হাসতে হাসতে বলল, ‘আরে, খবর আমার জন্য না। তোর জন্যই। ম্যাডাম তোর জন্য একটা প্রস্তাব এনেছেন। একটা অনুষ্ঠানে তোকে কীর্তন গাইতে হবে। ম্যাডামের বাসায়।’
মোহিনী ম্যাডামও হাসলেন অনিমার ভ্যাবাচেকা মুখ দেখে। ‘আরে, আসো সেলিব্রেট করি আজকের দিনটা। আমি চিকেন ফ্রাই এনেছি, আর তোমাদের জন্য কোক। আমার অবশ্য ওতে চলবে না। আমার জন্য রেড ওয়াইন এনেছি। চাইলে তোমরাও শামিল হতে পারো। হা হা হা…’
‘জীবনের ভার কে বইবে? জীবনের ঘানি কে টানবে? তারপরও টেনে চলা, কেননা মৃত্যুর পরে আছে ঘোর শঙ্কা অজানার। মৃত্যু মানে সেই দেশ, যে দেশ থেকে ফেরে না কেউ, কোনো যাত্রী! আর সেই ভয়ে সংকল্প আছাড় খায়। মনে হয় অজানার চেয়ে জানার যে কষ্টের চিত্র, সেখানেই একা থাকা ভালো। অতএব জন্ম নেয় একেকটি কাপুরুষ এই আমাদেরই প্রত্যেক ভেতরে। স্রোত ঘুরে যেতে থাকে! কর্ম তার উদ্যম হারায়! ওই বুঝি ওফেলিয়া! স্বর্গের বালিকা, ওগো, আমার বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা পাক হৃদয়ে তোমার!’
কী সুন্দর কণ্ঠ হ্যামলেটের! ভরাট দরাজ গলা। শুনতে শুনতে অনিমা এত অভিভূত হয় যে নিজের সংলাপ ভুলে যায়। হ্যামলেটরূপী আনিস ভাই ওর দিকে চেয়ে অপেক্ষায় রইলেন। সে কিছু বলতে পারল না। রজতদা ধমকে উঠলেন, ‘অনিমা! সংলাপ বল! দেখে দেখেই বল। কী হলো?’
অনিমা সচকিত হলো। আনিস ভাই এবার ওর হাত ধরলেন। হেসে বললেন, ‘ভয়ের কিছু নেই। প্রথম প্রথম এমন হয়। কথা আটকে আসে। তুমি ধরে নাও, এখানে তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ নাই। চারদিক ভুলে যেতে পারলেই তবে তুমি ওফেলিয়া হয়ে উঠবে। নাও, আমি আবার বলছি। রজতদা, ওকে ঘাবড়ায়ে দিয়েন না প্রথম দিনই। পরে যদি কেঁদে ফেলে! এখনই তো চোখ ছলছল করছে। আরে, ওর তো গ্লিসারিন লাগবে না মনে হচ্ছে!’
এই বলে আনিস ভাই জোরে হেসে উঠলেন। অনিমার সত্যি কান্না পাচ্ছিল। এবার চারদিকে সবাই হেসে উঠতে নিজেকে সামলে নিল। চন্দ্রাবলী সাজার সময় সে নিজেকে বহুবারই খুঁজে পেয়েছে কুঞ্জবনে, কুটিরে, একাকী দেবতা কৃষ্ণের সামনে। সেই বনে তারা দুজন ছাড়া কেউ নেই। সে একজন সমর্পিতা আর স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণ তার সামনে। তিনিও প্রেমে আকুল, কামনায় কাতর। কিন্তু দ্বিধায় খণ্ডিত। যদি রাধিকা জানতে পারেন এ গোপন প্রেমের কথা। যদি দুর্নাম রটে! ওফেলিয়াও দ্বিধান্বিত। চন্দ্রার মতোই।
টেলিভিশন আর মঞ্চের বিখ্যাত অভিনেতা আনিস জুবের তাঁর উদাত্ত কণ্ঠে আবার কথা বলতে শুরু করলেন, ‘ওফেলিয়া! স্বর্গের বালিকা, ওগো, আমার বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা পাক তোমার হৃদয়ে!’
অনিমা এবার নিজেকে শক্ত করল, ‘প্রভু, আমি বহুদিন ধরে ভাবছি, আপনার উপহারগুলো ফিরিয়ে দেব। এই যে এনেছি।’
আনিস আনমনা হয়ে বললেন, ‘কই, যে দিয়েছে, সে—সে তো আমি নই।’
অনিমা অভিমান ভরে বলল, ‘প্রভু, আপনি ভালো করেই জানেন যে আপনি দিয়েছেন। দেওয়ার সময় মিষ্টি মিষ্টি যে কথাগুলো বলেছিলেন, উপহারগুলো তাতে আরও মহার্ঘ হয়ে উঠেছিল আমার কাছে। এখন সুবাস শেষ, ফিরিয়ে নিন। উপহার যে দেয়, সে যদি নির্দয় বলে প্রমাণিত হয়, তখন যতই মূল্যবান হোক উপহার, তার মূল্য কী থাকে আর?’
শেষ দিকে অনিমার গলা ভারী হয়ে আসে বেদনায়, কান্না জমে যায় তার কণ্ঠজুড়ে। কঠোর হতে হতে তার কণ্ঠ পিছলে যেতে থাকে বেদনায়। পাছে ‘রাধিকা লইয়া বড়ায়ি গেলি ঘর!’ দেবতা কৃষ্ণের মতো যুবরাজ হ্যামলেটও যে উদাসীন, অমনোযোগী। তিনিও উপেক্ষা করেন, অবহেলায় ভুলে যান সহচরীকে। নির্দয় হন, ফিরে যান। অনিমা এ বেদনা কত কতবার সয়েছে! কৃষ্ণ তাকে ছেড়ে চলে গেছেন বারবার।
সহ-অভিনেতাদের হাততালির শব্দে অনিমার ঘোর ভাঙে। আনিস জুবের তার দুকাঁধ ধরে ঝাঁকান, ‘বাহ্‌, চমৎকার অনিমা! তোমার এক্সপ্রেশন দারুণ! দারুণ! আর তোমার গলায় বেদনা তো দারুণ খেলে!’
আনিস তারপর রজতদার দিকে তাকিয়ে হাসলেন, ‘দেখলেন দাদা? এ জাত অভিনেত্রী!’
ফেরার পথে চিশতী রিকশায় বসে অনিমার হাত দুটো তুলে মুখের কাছে এনে আলতো চুমু খেয়ে বলল, ‘উফ, কত দিন ধরে এ দিনটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম! অনিমা, তোমাকে ওই শাড়ির দোকানে একদম মানায় না। মনে হয় যেন কুঞ্জবন ছেড়ে এক গোপী বনের মধ্যে পথ হারিয়ে ফেলেছে। তোমার আসল জায়গা এখানে। এই স্টেজে। তুমি অনেক ভালো করবে, অনিমা। আমি জানি।’
অনিমা হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘কিন্তু অভিনয় করে কি পেট ভরবে?’
‘আরে, তুমি একদিন অনেক নাম করবে। একবার নাম হয়ে গেলে আর দেখে কে? টাকাপয়সা তখন পায়ের কাছে লুটাবে দেখো। আমাকে তখন ধার দিয়ো। এখন চলো, আমরা দিনটা সেলিব্রেট করি। তোমার প্রথম রিহার্সাল। চলো, রাজ্জাকের বিরিয়ানি খাই। আর বোরহানি।’
অনিমা বলল, ‘শীলা শুনলে খুব খুশি হবে। ওকেও ফোন করে আসতে বলি?’