পরামর্শক ব্যয় ৬৩ লাখ টাকা, প্রয়োজন উল্লেখ নেই ডিপিপিতে

0
17

প্রতিদিনের ডেস্ক
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ১৫০ শয্যার বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চীনের অনুদান ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে প্রস্তাবিত এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০৫ কোটি ১৭ লাখ ১৩ হাজার টাকা। তবে এই প্রকল্পে একজন পরামর্শকের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩ লাখ টাকা। প্রকল্পে ২৬ মাসের জন্য ওই পরামর্শক নিয়োগের বিষয় উল্লেখ করা হলেও তার যোগ্যতা ও কার্যপরিধির বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। এমনকি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) ব্যয় সার-সংক্ষেপেও বিষয়টির উল্লেখ নেই।
এত টাকা ব্যয় করে নিয়োগ দেওয়া পরামর্শক কী কাজ করবেন- সে বিষয়েও বিস্তারিত উল্লেখ নেই। এই কাজে নিয়োগ পেতে হলে যোগ্যতা কী হতে হবে তাও উল্লেখ নেই। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এমন প্রস্তাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। এমনকি বিষয়টি স্পষ্ট করা ও যৌক্তিকতা উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে কমিশন।
‘স্টাবলিশমেন্ট অব চায়না এইড ১৫০ বেডেডে বার্ন ইউনিট অ্যাট চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হসপিটাল’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রস্তাবিত মোট ব্যয় ৩০৫ কোটি ১৭ লাখ ১৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১২৩ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। চীনের অনুদান ১৮১ কোটি ৮৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অনুমোদনের পরে দুই বছর মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে চায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
গত ২১ জানুয়ারি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) আবদুল বাকী। সভায় প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে নানান অসঙ্গতি পেয়েছে কমিশন। এগুলো দূর করতে ১৫টি মতামত দিয়েছে কমিশন।
এক পরামর্শকের পেছনে ৬৩ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) নার্গিস খানমের কাছে। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের পিইসি সভা হয়েছে। প্রকল্পের বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন যে কোয়েরি (প্রশ্ন) দিয়েছে সেগুলো ঠিক করা হবে। বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে চীন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পের খাতভিত্তিক ব্যয়ও চীন করেছে। তবে পরামর্শকের জন্য ৬৩ লাখ টাকা ব্যয় ও যোগ্যতার বিষয়ে আমরা তাদের কাছ থেকে আগে জানবো, এরপর তা ঠিক করবো।’
পরিকল্পনা কমিশন যা বলছে
পরিকল্পনা বিভাগের পরিপত্র অনুযায়ী প্রকল্পের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট করে ডিপিপিতে উল্লেখ করা প্রয়োজন। ডিপিপির ব্যয় সারসংক্ষেপে বিভিন্ন খাত যেমন আপ্যায়ন ব্যয়, শ্রমিক মজুরি, কমিশন, গ্যাস এবং ফুয়েল, পেট্রোল, অয়েল অ্যান্ড লুব্রিকেন্টস, সিকিউরিটি সার্ভিস ইত্যাদির সুনির্দিষ্ট একক ও পরিমাণসহ পূর্ণাঙ্গ ব্যয় প্রাক্কলন করা যৌক্তিক। এটা প্রকল্পে নেই।
প্রকল্পের প্রস্তাবিত মেয়াদ ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রকল্প শুরুর প্রস্তাবিত সময় এরই মধ্যে পার হয়ে গেছে। তাই বাস্তবতা বিবেচনায় প্রকল্পের আরম্ভকাল ২০২৪ সালের জানুয়ারি নির্ধারণ করে মেয়াদকাল পুনর্নির্ধারণ জরুরি। এছাড়া প্রকল্পের শিরোনাম হিসেবে চীন ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিতে উল্লেখিত শিরোনাম ‘চাইনা এইড প্রজেক্ট অব বার্ন ইউনিট অব চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হসপিটাল ইন বাংলাদেশ’ নির্ধারণ করা সমীচীন হবে বলে মনে করে কমিশন।
বাস্তবায়নকালীন প্রকল্প পরিচালকসহ জনবলের বিষয়ে অর্থ বিভাগের জনবল কমিটির সুপারিশ পাওয়া গেলেও জনবল বাবদ আর্থিক সংস্থান রাখা হয়নি। সেক্ষেত্রে কীভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রয়োজন। একই ধারাবাহিকতায় অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ ব্যয় খাতের ৫ লাখ টাকা বাদ দেওয়া সমীচীন। এছাড়া প্রকল্পের বাস্তবায়নোত্তর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, জনবল, আর্থিক চাহিদা ও উৎসের তথ্যসহ বিস্তারিত প্রকল্পে রাখতে হবে।
প্রকল্পের আর্থিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ করা হয়নি। প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতা ও প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় উপযুক্ত মানদণ্ডের ভিত্তিতে আর্থিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ দরকার। এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ডিপিপিতে সংযুক্ত নেই। এ সংক্রান্ত ছাড়পত্র সংগ্রহ করে ডিপিপিতে সংযুক্ত করা প্রয়োজন।
কোন খাতে কত ব্যয় ধরা হয়েছে
অনিয়মিত শ্রমিক ও কমিশন বাবদ জিওবি অংশে ২১ লাখ এবং অনুদান অংশে ৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ খাতের ব্যাখ্যাসহ ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি ও বিস্তারিত বিভাজন প্রকল্পে নেই। প্রকল্পের জিওবি খাতে যানবাহন (একটি জিপ ও দুটি অ্যাম্বুলেন্স) কেনা বাবদ এক কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং দুটি মাইক্রোবাস ভাড়া বাবদ ৬২ লাখ ৪০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে একটি পরিবহন সেবা (ড্রাইভার) ক্রয়ের বিষয়ে অর্থ বিভাগের জনবল কমিটির সুপারিশ পাওয়ায় গাড়ি ভাড়ার সংস্থান রাখা সমীচীন হবে। অর্থ বিভাগের পরিপত্র অনুসারে মোটরযান কেনার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে যানবাহন কেনার খাত এবং সেগুলোর জ্বালানির খরচ বাদ দিয়ে ডিপিপি পুনর্গঠন যৌক্তিক হবে বলে মনে করে কমিশন।
প্রকল্পের কাস্টমস ডিউটি বা শুল্ক কর খাতে ৮০ কোটি, সিকিউরিটি সার্ভিসে দেড় কোটি, আয়করে এক কোটি এবং সার্ভে খাতে ১৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকার প্রাক্কলন করা হয়েছে। এসব খাতের ব্যাখ্যাসহ প্রাক্কলনের ভিত্তি, কাজের বিবরণ, পরিমাণ ও বিস্তারিত বিভাজন ডিপিপিতে উল্লেখ করা দরকার। প্রকল্পের নির্মাণ ও পূর্ত (আবাসিক ভবন, অনাবাসিক ভবন ও আনুষঙ্গিক কাজ) কাজের প্রাথমিক ড্রয়িং-ডিজাইন ডিপিপিতে সংযুক্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে এসব ভবনের বিস্তারিত বিবরণ, ফ্লোর প্ল্যানসহ চূড়ান্ত ড্রয়িং-ডিজাইন ডিপিপিতে সংযুক্ত করা প্রয়োজন।
এ প্রকল্পের আওতায় সাততলা ফাউন্ডেশন বিশিষ্ট ছয়তলা বার্ন ইউনিট ভবন এবং একতলা ফাউন্ডেশন বিশিষ্ট একতলা ইকুইপমেন্ট ভবন নির্মাণ করা হবে। এতে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৪৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, যা অর্থায়ন করবে চীন। এছাড়া ভবনের বাইরে পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন, সীমানা প্রাচীর, কাঁটাতারের বেড়া ও গেট, আরসিসি রাস্তা, রিটেইনিং ওয়াল ও ড্রেনের নির্মাণকাজে অর্থায়ন করবে বাংলাদেশ সরকার। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। সবমিলিয়ে এতে ৫৫ কোটি ২৭ লাখ টাকার ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। অথচ প্রকল্পের ব্যয় সারসংক্ষেপে নির্মাণ খাতে ১২৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
আরও যেসব প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনের
প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনায় পণ্যের ক্ষেত্রে ১৫টি, পূর্ত কাজে সাতটি এবং সেবা কার্যক্রমে তিনটিসহ মোট ২৫টি প্যাকেজ প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সমজাতীয় খাতগুলো একই প্যাকেজে রেখে প্যাকেজের সংখ্যা যৌক্তিকভাবে কমানো যেতে পারে। পণ্য, পূর্তকাজ ও সেবা ক্রয় পরিকল্পনার তিনটি ছকেই পণ্য উল্লেখ করা হয়েছে, যা সংশোধন প্রয়োজন। জিওবি অংশে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম খাতে এক কোটি ৯ লাখ টাকা, অফিস সরঞ্জাম খাতে ১০ কোটি ৬৯ লাখ ও আসবাবপত্র খাতে ৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এছাড়া চিকিৎসা যন্ত্রপাতি খাতে ২৩ কোটি ১১ লাখ এবং যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম খাতে প্রাক্কলন করা হয়েছে ২৬ কোটি ২০ লাখ টাকা। এসব খাতে ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি জানা যেতে পারে। বাজারদর কমিটির মাধ্যমে এসব খাতের পরিমাণ, স্পেসিফিকেশন, ব্যয় নির্ধারণ করা দরকার বলে জানায় কমিশন।
এ বিষয়ে আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) মো. আব্দুর রউফ বলেন, ‘প্রস্তাবিত প্রকল্পের পিইসি সভা হয়েছে। সভায় আমরা বেশকিছু বিষয়ে কোয়েরি দিয়েছি। এর পরে বসে আবারও প্রকল্পের ডিপিপি ঠিক করা হবে। এখনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। প্রকল্পটি এখন একেবারেই প্রাথমিক ধাপে।’
প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য
প্রকল্পের উদ্দেশ্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপন। চট্টগ্রাম ও আশপাশের জেলাগুলোতে প্রায় চার কোটি মানুষের বসবাস। এতে এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর পোড়া এবং এজাতীয় রোগের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্পন্ন চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এখানে এক হাজার ৬৫ জন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী এবং সহায়তাকর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। এর মাধ্যমে তৈরি হবে পোড়া রোগীদের চিকিৎসা সেবার জন্য দক্ষ জনগোষ্ঠী।
দেশের বেশিরভাগ ভারী শিল্প, পোশাক কারখানা, শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড এবং কেমিক্যাল ডিপো চট্টগ্রামে। পাশাপাশি এ জেলায় দেশের সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর থাকায় এখানে দুর্ঘটনা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বেশি। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য ঢাকায় এসে চিকিৎসা নেওয়া কঠিন। এসব বিষয় মাথায় রেখে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট স্থাপনে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ বিষয়ে চীনকে প্রস্তাব দেওয়া হলে ২০১৬ সালে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ করে দেশটি। এরপর বার্ন ইউনিট প্রকল্প বাস্তবায়নে দুই সরকারের মধ্যে চুক্তি সই হয়।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় বার্ন ইউনিটের জন্য ৯ হাজার বর্গমিটারের একটি নতুন ভবন নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র সংগ্রহ করা হবে। প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন, নির্মাণ যন্ত্রপাতি/সরঞ্জাম ও উপকরণ সরবরাহ, নির্মাণ সমন্বয়ের জন্য প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ প্রেরণ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র সরবরাহ এবং প্রকল্প শেষে এক বছরের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে চীন।