দেশের নদীগুলোর অবস্থা যে শোচনীয়, তা নদীর সার্বিক চিত্র পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায়। এর পেছনে দখলদারিত্ব থেকে শুরু করে নানা অনিয়ম জড়িত। চট্টগ্রামের লাইফ লাইন কর্ণফুলী নদীতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দখল ও দূষণের মহোৎসব চলছে। এমনকি কর্ণফুলী রক্ষায় হাইকোর্ট রায় দিলেও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসব বিষয়ে তোয়াক্কা করছে না। জেলা প্রশাসন মাঝেমধ্যে কিছুটা উচ্ছেদ অভিযান চালালেও নদী রক্ষায় মূলত দায়িত্ব হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের। কিন্তু সেই বন্দর কর্তৃপক্ষই রহস্যজনক কারণে নীরব। শুধু তাই নয়, ফিরিঙ্গিবাজার থেকে মেরিনার্স রোড দিয়ে শাহ আমানত সেতুর দিকে যাওয়ার পথে দক্ষিণ দিকে কর্ণফুলী নদীর ভেতরের জায়গাতেই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বা ফিশারি ঘাট করার অনুমতি দিয়েছে। বেশ কয়েক বছর ধরে নদীর ভেতরেই মাটি ভরাট করে সেখানে নতুন করে ফিশারি ঘাট করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গত শনিবার চট্টগ্রামে চাক্তাই এলাকায় কর্ণফুলী নদীতীরে নদী রক্ষায় কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে। জানা যায়, বঙ্গোপসাগরের মোহনা থেকে কাপ্তাই পর্যন্ত কর্ণফুলীর দুই তীরে ৫২৮ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৮১ প্রজাতির উদ্ভিদ বিলুপ্তির হুমকির মুখে। দূষণ ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আরো ৬১ প্রজাতির উদ্ভিদ বিপন্ন হয়ে যাবে। দূষণের জন্য ৩০টি কারণ শনাক্ত করা হয়েছে। কর্ণফুলী নদীতে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭০০ এর বেশি নৌযান চলাচল করে। এসব নৌযানের ময়লা, পোড়া তেল সরাসরি নদীতে ফেলা হয়। এছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষ মাছ বাজার উচ্ছেদ না করে নতুন করে বরফকল স্থাপনের জন্য কর্ণফুলী নদীর মাঝখানে শাহ আমানত ব্রিজের মাঝ-পিলার বরাবর ২০০০ বর্গফুট নদী নতুন করে লিজ দিয়েছে, যা সরাসরি মহামান্য হাইকোর্টের আদেশের লঙ্ঘন। কর্ণফুলীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা দিলেও সেই আদেশ লঙ্ঘন করে দখল আর দূষণের মাধ্যমে নদীকে হত্যা করা হচ্ছে। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এই নদীর সঙ্গে ২ কোটির বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর কর্ণফুলীর দুই তীরে সীমানা নির্ধারণ করে। জরিপে কর্ণফুলী নদীর দুই তীরে প্রায় আড়াই হাজার অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়। এরপর বড় পরিসরে ও কয়েকটি সংস্থার সমন্বয়ে কর্ণফুলীর পাড়ে অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। কিন্তু অভিযান চললেও আশানুরূপ কোনো সাফল্য আমরা দেখিনি। কর্ণফুলী রক্ষা করতে একটি মহাপরিকল্পনাও নেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়ন শুরু না হওয়ায় তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। অবিলম্বে দখল ও দূষণ বন্ধ করতে জনসচেতনতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগের বিকল্প নেই। কর্ণফুলীসহ দেশের সব নদীকে বাঁচাতে হবে। নদীগ্রাস আগামী দিনে পরিবেশসহ সার্বিক পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নদীদূষণ ও দখল এখন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দখলে-দূষণে বিপর্যস্ত কর্ণফুলী হারাচ্ছে স্বাভাবিক নাব্য। নদীর পানি ধারণক্ষমতা অনেক কমে গেছে। নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় বন্যা ও জোয়ারের পানি নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত করছে। কর্ণফুলীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যেভাবেই হোক কর্ণফুলী নদী দখল ও দূষণমুক্ত করতে হবে। এ বিষয়ে অবিলম্বে সরকারের জোরালো পদক্ষেপ দেখতে চাই।
কর্ণফুলী নদী গ্রাস!
Previous article
Next article
আরো দেখুন
বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় দুরবস্থা
সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় একই অবস্থা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর অন্যতম কারণ আর্থিক বরাদ্দ একেবারেই অপ্রতুল। কিন্তু এটিও দেখা গেছে, যেটুকু বরাদ্দ রয়েছে,...
ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস, বাড়ছে খেলাপি ঋণ
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে দেশের অর্থনীতি রীতিমতো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এ সময়ে দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে।ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো গণহারে চাঁদাবাজি ও হামলার শিকার হতে...

