বাংলাদেশের পশ্চিম, উত্তর, পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্বে ঘিরে রয়েছে যথাক্রমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিয়ানমার সীমান্ত। বাংলাদেশের স্থলসীমান্তের ৯২ শতাংশ ভারতের সঙ্গে, বাকি ৮ শতাংশ সীমান্ত মিয়ানমারের সঙ্গে। আর এই সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো হয়ে উঠেছে অপরাধের আঁতুড়ঘর। কোথাও নিত্যপণ্যের চোরাকারবারি তো, কোথাও মাদকের। এর মধ্যে স্বর্ণ চোরাচালানের বিষয়টি খুবই উল্লেখযোগ্য। ভারতে এখন পর্যন্ত আটক পাচারকৃত স্বর্ণের ৭৩ শতাংশই এসেছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে। দেশটিতে চীন থেকে আসা স্বর্ণ চোরাচালান হচ্ছে মিয়ানমার হয়ে। আবার মিয়ানমারেও বাংলাদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ স্বর্ণ চোরাচালান হচ্ছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য-আফ্রিকাসহ বিভিন্ন উৎস থেকে পাচার হওয়া স্বর্ণের সবচেয়ে বড় করিডোর এখন বাংলাদেশ। শুধু স্বর্ণ পাচার পর্যন্ত এই অপরাধীরা সীমাবদ্ধ থাকে না। লেনদেনের বিতর্ক, দখলদারিত্ব এসব নিয়ে হয় খুনাখুনির মতো সহিংস কর্মকাণ্ড। সর্বশেষ দেশে স্বর্ণ চোরাচালান বেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে ভারতে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। বিভিন্ন সময় তার বিরুদ্ধে স্বর্ণ পাচারসহ চোরাচালান কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। কয়েক বছর আগেও ইন্টারপোলের ওয়ান্টেড তালিকায় ছিল তার নাম। প্রতাপশালীদের সংশ্লিষ্টতায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালানের বড় হাব করে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্যমতে, যে পরিমাণ স্বর্ণ পাচারের সময় আটক হয়, পাচার হয় তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। প্রতি বছর সীমান্তবর্তী ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে স্বর্ণ পাচার হচ্ছে। পাচার হওয়ার রুট হিসেবে তিনটি বিমানবন্দরও ব্যবহার হচ্ছে। সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও প্রশাসনের একশ্রেণির কর্মকর্তাকে পছন্দের লোক হিসেবে বদলি করিয়ে নেয় স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেট। সেখানে তাদের নিজস্ব লোক বসানো হয়। এয়ারপোর্টেও তাদের নিজস্ব লোক থাকে। দু-একটা চালান মাঝেমধ্যে ধরা পড়ে। তবে যা উদ্ধার হয়, তা মহাসমুদ্রের মধ্যে এক ফোঁটা পানির মতো।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো এখন পর্যন্ত অনেক পাচারকারীকে ধরতে সক্ষম হলেও এর মূল হোতারা সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকায় খুনাখুনির ঘটনা অনেক ঘটেছে। কিন্তু বিচার হয়নি একটি ঘটনারও। অনেকে আটক হয়েছেন, জেলে থেকেছেন। কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে তারা খালাস পেয়ে গেছেন। আবার অনেকে জেলখানায় থেকেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছেন। ভারতে স্বর্ণের চাহিদা অনেক বেশি। প্রতি বছর দেশটিতে ৯২ টন স্বর্ণের প্রয়োজন হয়। এই স্বর্ণের ওপর ১৫ ভাগ আমদানি শুল্ক ও ৫ ভাগ সম্পূরক শুল্ক দিতে হয়। এই কারণে বৈধ পথে স্বর্ণ আনলে তাদের তেমন লাভ হয় না। এ জন্য স্বর্ণ চোরাচালানের জন্য বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সীমান্ত বেছে নিয়েছে চোরাচালানকারীরা। ১৯৮৬ সাল থেকে এ সীমান্ত দিয়েই স্বর্ণ চোরাচালান হয়ে আসছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তের উভয় দেশের মানুষ স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। এই সিন্ডিকেটে এমপি আনারও ছিলেন। তার হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল সিন্ডিকেটের টাকার লেনদেন। এ অবস্থায় স্বর্ণ চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সীমান্তে এমন সহিংসতা বা অরাজকতা কখনো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তাই সরকারের উচিত স্বর্ণ চোরাচালানের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া এবং অপরাধী চক্রকে দমন করা।
স্বর্ণ চোরাচালানকারীদের দমন করুন
Previous article
Next article
আরো দেখুন
বাড়ছে ভ্যাটের আওতা
আগামীকাল বৃহস্পতিবার উপস্থাপন করা হচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট সরকারের প্রথম বাজেটকে একটি মাইলফলক বাজেট হিসেবেই প্রণয়ন করা হয়েছে।
বাজেটের...
দ্রুত বিচারের অনন্য দৃষ্টান্ত
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইতিহাসের দ্রুততম রায়ের মধ্য দিয়ে দেখা গেল, সদিচ্ছা থাকলে মাত্র পাঁচ কর্মদিবসেও বিচারকার্য সম্পন্ন...

