দেশে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বাতিল ইলেকট্রনিকস যন্ত্র থেকে সৃষ্ট বর্জ্য বা ই-বর্জ্যরে পরিমাণ। এ থেকে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণ। গতকাল ভোরের কাগজে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ই-বর্জ্য নিয়ে এক রকম বিপদেই আছে এশিয়ার দেশগুলো। ২০২০ সালে জাতিসংঘের প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা গেছে, ২০১৯ সালে বিশ্বজুড়ে ৫২ দশমিক ৭ মিলিয়ন টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়েছিল। সেগুলোর মাত্র ৫ ভাগের এক ভাগ রিসাইকেল করা হয়। ২০১৯ সালে বিশ্বে যত ইলেকট্রনিকস বর্জ্য তৈরি হয়েছিল; সেগুলোর ওজন ইউরোপের সব পূর্ণবয়স্ক মানুষের চেয়েও বেশি। আবার বর্জ্যগুলো এক সারিতে রাখলে তা ৭৫ মাইলের চেয়েও দীর্ঘ হতো। জাতিসংঘ সতর্ক করে জানিয়েছে, ২০৩০ সালে বিশ্বে ই-বর্জ্য হবে ৭২ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-বর্জ্য পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির নতুন এক আতঙ্ক। মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য এই ই-বর্জ্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ই-বর্জ্যরে ঝুঁকি কমাতে সরকার ২০২১ সালে ‘ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা’ তৈরি করলেও এর প্রয়োগ নেই। এ সমস্যা সমাধানের ভালো একটি উপায় রিসাইক্লিং। রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে অন্যান্য বর্জ্য সমস্যা যেভাবে সমাধান করা হয়, সেভাবেই ই-বর্জ্যরে পরিমাণ অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ই-বর্জ্য প্রসঙ্গে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (বেস্ট) প্রকল্পের অধীনে একটি ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট নির্মাণ করা হবে। সূত্র থেকে আরো জানা যায়, গাজীপুরে দেশের প্রথম ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট নির্মাণ হচ্ছে। পরিবেশসংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বেস্ট প্রকল্পের কাজ চলমান। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের এ প্রকল্পের চতুর্থ কম্পোনেন্টের অধীনে নির্মিত হবে এই প্লান্ট। এজন্য প্রাথমিকভাবে ব্যয় হবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। ই-বর্জ্যরে ক্ষতিকর ভারি ধাতু ও রাসায়নিক মাটি, পানি ও বায়ুকে দূষিত করছে। ছড়াচ্ছে ক্ষতিকর রেডিয়েশন। যা পরিবেশের ক্ষতি করে। ফলে মাটি, গাছপালা, ফসল ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। সিসা ও পারদের মতো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পদার্থ খোলা জায়গায় ফেলে রাখার কারণে মানুষের ত্বকের বিভিন্ন রোগ, কিডনি, ফুসফুস, হৃদযন্ত্র¿, স্নায়ুতন্ত্র, যকৃৎ, মায়েদের স্তন ও মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি করে। অটিজম ও মানসিক বিকাশ না হওয়ার একটি কারণও এটি। ই-বর্জ্য শিশুর মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলছে। দেশে যে পরিমাণ ই-বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে সে পরিমাণ বর্জ্য রিসাইক্লিনিং করা যাচ্ছে না। সরকারের একার পক্ষে এটি করা সম্ভব নয়। সরকারি ও বেসরকারি পার্টনারশিপে যেতে হবে। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আনতে হবে আধুনিক উপায়। আমাদের মনে রাখতে হবে, ই-বর্জ্য শতভাগ রিসাইকেল হবে না। যেগুলো রিসাইকেল হবে না; সেই বর্জ্যগুলোর কী হবে সেটিও ভাবতে হবে। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দক্ষ জনবলের অভাব এবং এর জন্য যে প্রযুক্তিগত দিকটি থাকা দরকার সেটিও আমাদের নেই। সেই লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ই-বর্জ্য দূষণ রোধে নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রশাসনের কঠোরতা নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিকর দিকগুলো উপস্থাপনের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়াও জরুরি।
আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জরুরি
Previous article
Next article
আরো দেখুন
মানব পাচারকারী চক্রের ভয়ংকর তৎপরতা
একটু ভালো করে বাঁচার আশায়, একটু বেশি উপার্জনের জন্য অনেকে বিদেশে যেতে চান, প্রয়োজনে অবৈধ পথে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি লক্ষ...
মধ্যবিত্ত শ্রেণি তীব্র সংকটে
দেশের অর্থনীতির চাকা ঠিকমতো চলছে না। নতুন বিনিয়োগ নেই। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। শিল্প ও কৃষি উভয় খাতই ধুঁকছে।অপরিহার্য নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়ে...

