৪ঠা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ  । ১৯শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ 

ঝিনাইদহের এমপি আনার হত্যাকাণ্ড নিয়ে অবাক গোয়েন্দারাও ‘রোগী’ হয়ে যায় ভারতে, খুন করে ফিরে আসে ঢাকায়

প্রতিদিনের ডেস্ক॥
ঝিনাইদহের এমপি আনোয়ারুল আজিম আনার খুনের ঘটনায় দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে বাংলাদেশের গোয়েন্দা পুলিশ। তার পরেই সামনে এসেছে একের পর এক নয়া তথ্য। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, সাংসদকে কেটে টুকরো টুকরো করার আগেই বালিশ চাপা দিয়ে অজ্ঞান করা হয়েছিল। দুই অভিযুক্ত বাইপাসের ধারে এক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে মেডিক্যাল ভিসা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন। এর পরেই সামনে এসেছে একের পর এক তথ্য তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন কী ভাবে ঘটেছিল সে দিন খুনের ঘটনা। ঝিনাইদহের এমপি খুনের ঘটনায় দুই অভিযুক্ত ফয়সল আলি এবং মোস্তাফিজুর রহমানকে বাংলাদেশের গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেপ্তার করার পরেই সামনে এসেছে এই তথ্য। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, কলকাতার ফ্ল্যাটে সাংসদকে কেটে টুকরো টুকরো করার আগে ক্লোরোফর্ম মাখা বালিশ চাপা দিয়ে অজ্ঞান করা হয়েছিল। সেই ক্লোরোফর্ম সাপ্লাই করেছিলেন পিন্টু নামে এক গাড়িচালক। যিনি আবার এরাজ্যের বাসিন্দা। এই ‘সন্দেহভাজন’ পিন্টুর হদিশ পেতে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে সিআইডিকে অনুরোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশের এমপি খুনের ঘটনার তদন্ত সেই দেশের গোয়েন্দা বিভাগের পাশাপাশি করছে এরাজ্যের সিআইডিও। ফলে দু’দেশের গোয়েন্দাদের হাতেই উঠে আসছে একের পর এক নতুন তথ্য। যার পরতে পরতে রয়েছে নন-ফিকশন ক্রাইম থ্রিলারের রসদ। রাজনৈতিক ঈর্ষা এবং ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কারণে যে এই খুন, সে সম্পর্কে ইতিমধ্যেই নিশ্চিত হয়েছে দুই দেশের পুলিশ। কিন্তু যেভাবে ৬ মাস ধরে খুনের স্ক্রিপ্ট লেখা হয়েছিল, তা অবাক করেছে দুঁদে গোয়েন্দাদেরও। কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ পুলিশ খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ের পাতাল কালী মন্দিরে হানা দিয়ে এই ঘটনার দুই অভিযুক্ত মোস্তাফিজুল এবং ফয়সলকে গ্রেপ্তার করে। পাজামা আর ধুতি পরে দুজন সেখানে কালীর সাধক হয়ে গিয়েছিলেন। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত সেই মন্দিরে পৌঁছে যান গোয়েন্দারা। হাতেনাতে পাকড়াও করা হয় দুজনকে। বাংলাদেশের গোয়েন্দা শাখার প্রধান হারুন অর রশিদ বলেন, ‘মোস্তাফিজ ও ফয়সলের সঙ্গে অন্তত ছ’মাস আগে যোগাযোগ করেন আমানুল্লা। দুজনের আর্থিক সঙ্কটের কথা জানতে পেরে মোটা অঙ্কের টোপ দিয়ে খুনের বরাত দেওয়া হয়। এরপর এপ্রিল মাসে মূলচক্রী, ব্যবসায়ী আখতারুদ্দিন শাহিন তাঁর বসুন্ধরার ফ্ল্যাটে দুজনকে বেশ কিছুদিন রেখে দেন। সেখান থেকেই কলকাতায় যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট ও ভিসার ব্যবস্থা করেন শাহিনের সহকারী সিয়াম হোসেন। ফয়সলের হৃদযন্ত্র ও মোস্তাফিজের কিডনি রোগের কথা বলে ভুয়ো নথি জমা দিয়ে মেডিক্যাল ভিসা নেওয়া হয়। পরে বাংলাদেশ থেকে রেলপথে কলকাতায় যেতে তাঁদের হাতে ২০ হাজার টাকা করেও দেওয়া হয়।’ পুলিশ জানতে পেরেছে, বাইকচালক মোস্তাফিজুরকে ‘জিএস ফুড প্রোডাক্টস’ নামের একটি কোম্পানির কর্তা এবং ট্রাকচালক ফয়সলকে ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছিল। ২ মে কলকাতায় গিয়ে প্রথমে নিউ মার্কেটের হোটেলে ও পরে সঞ্জীবা গার্ডেনে যান মোস্তাফিজ ও ফয়সল। ১৩ মে এমপি আনার যখন বরাহনগরের বন্ধু গোপাল বিশ্বাসের বাড়ি থেকে বের হন, তখন ফয়সলই তাঁকে গাড়িতে চাপিয়ে প্রথমে নিউ মার্কেট, পরে নিউটাউনে নিয়ে যান। এদিকে, তারও আগে কলকাতায় পৌঁছে যাওয়া সিয়াম ১৭ হাজার টাকা দিয়ে একটি চেয়ার স্থানীয় বাজার থেকে কেনেন আনারকে বেঁধে ফেলার জন্য। পাশাপাশি চপার, বস্তা, দড়িও কেনা হয়। শাহিনের নির্দেশে সেগুলি ফয়সল এবং মোস্তাফিজ গাড়ি করে নিউটাউনের ভাড়া করা ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। এমপিকে খুনের পরে দেহাংশ লোপাট হলে গেলে কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া পাঁচজন চলে যান। এরপর ফয়সল ও মোস্তাফিজ ঘটনাস্থল থেকে ফোন করেন শাহিনকে। তিনি নির্দেশ দেন, ফ্ল্যাটটিতে যেন রক্তের দাগ এবং অন্য কোনও চিহ্ন না থাকে। এমনকী, ১৯ মে শাহিন তাঁদের দেশে ফেরার টিকিটও কেটে দেন। ঢাকায় পৌঁছে শাহিনের ফ্ল্যাটের তিনতলায় দুজনে ফের থাকতে শুরু করেন। বাংলাদেশ পুলিশ সূত্রের খবর, আনার খুনের ঘটনায় অন্যতম মাস্টারমাইন্ড আমানুল্লা আমান ওরফে শিমুল ভুঁইয়া ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হতেই শাহিনের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে মোস্তাফিজ ও ফয়সল আত্মগোপনে চলে যান। তার আগে ওই ফ্ল্যাটে তাঁদের পাসপোর্ট জমা রেখে দেওয়া হয়। কিছুদিন এদিকওদিক ঘোরাঘুরি করার পরে তাঁরা খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ের পাতাল মন্দিরে কালীর পুজো শুরু করেন এবং নিজেদের নামও পাল্টে নেন। তবেও তাতেও লাভ হয়নি। ধরা পড়ে যান পুলিশের হাতে। গত ১২ মে চিকিৎসার জন্য কলকাতা এসেছিলেন এমপি আনার। ১৩ মে বরাহনগরের বিধান পল্লিতে বন্ধু গোপালের বাড়ি থেকে বের হন। পরে তাঁর মোবাইল থেকে এসএমএসে জানানো হয়, তাঁকে যেন ফোনে বিরক্ত করা না হয়। জরুরি কাজে তিনি দিল্লি চলে গিয়েছেন। এরপর আনারের পরিবার যোগাযোগ করতে না পেরে ১৮ মে নিখোঁজ ডায়েরি করে। ২২ মে জানা যায়, কলকাতার নিউটাউনের সঞ্জীবা গার্ডেনের একটি ফ্ল্যাটে এমপি আনারকে খুন করা হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য, ‘অপারেশন কাট-আউট’ শেষ হতেই বাংলাদেশে পৌঁছে আমানুল্লা ওরফে শিমুল ভুঁইয়া যোগাযোগ করেন ঝিনাইদহ জেলার আওয়ামি লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুর সঙ্গে। মিন্টুর ঘনিষ্ঠ নেতা কাজি কামাল আহমেদ ওরফে গ্যাসবাবুর কাছে এমপিকে খুনের প্রমাণ হিসেবে তিনি চেয়ারে মুখ এবং হাত বেঁধে রাখার ছবি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান। এরপর পাওনা দু’কোটি টাকার জন্য তাঁদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হওয়ার পরেই আচমকা আমানুল্লা গ্রেপ্তার হয়ে যান।
এতেই পুরো পরিকল্পনা ঘেঁটে যায়। শাহিন রাতারাতি দেশ ছেড়ে আমেরিকা পাড়ি দেন। গোয়েন্দাদের দাবি, একই দলের হলেও সাইদুল করিম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বলে মনে করতেন আনারকে। অন্যদিকে, সোনা চোরাচালানের ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে এমপি ছিলেন ‘বন্ধু’ আখতারুজ্জামানের চরম শত্রু। ফলে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলে যাওয়ায় যৌথ সিদ্ধান্তে এই খুনের প্ল্যান করা হয়।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়