বিশেষ প্রতিবেদক
ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে মধ্য জুলাই থেকে শুরু করে ৫ আগস্ট পর্যন্ত নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা শহরে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় অসংখ্য ছাত্র-জনতা। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর থেকে সাবেক মন্ত্রী-এমপি, নেতাকর্মী, পুলিশ, বিচারক ও আমলাদের বিরুদ্ধে শুরু হয় মামলা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সারাদেশে মামলা হয়েছে ১২২টি। বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শুধু ঢাকায় পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ২৮৪টি। এর মধ্যে বর্তমান ও সাবেক শতাধিক পুলিশ সদস্যের নাম রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলনে গুলি চালিয়ে লাশ ফেলার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করেছেন শতাধিক পুলিশ সদস্য। অনেকে আটকও হয়েছেন। পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে, ৩৮টি। এর পরের অবস্থানে রয়েছেন পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৩৬টি। সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা ৩৩, ডিএমপি যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারের বিরুদ্ধে ২৭, স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ১১, ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের ডিসি ইকবাল হোসাইনের নামে ৮, যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার এস এম মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধেও ৮ ও র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে হয়েছে ৫টি মামলা। মামলাগুলোর মধ্যে অধিকাংশই হত্যা মামলা রুজু হয়েছে।
মামলায় নাম রয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, সহকারী পুলিশ কমিশনার, একাধিক থানার ওসি, ইন্সপেক্টর, এসআই ও কনস্টেবলদেরও। সর্বোচ্চ মামলা হয়েছে যাত্রাবাড়ী থানায় ৯১টি। সরকারের কাছ থেকে আন্দোলন দমাতে যে মাত্রার নির্দেশনা পেয়েছিলেন তার চেয়ে প্রয়োগ করেছেন বহুগুণ বেশি। এ ধরনের ৯৪ জন পুলিশ সদস্যের নামে মামলা হলেও আরও বেশ কিছু পুলিশ সদস্যের নামে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকা ও মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করার অভিযোগে মামলা প্রক্রিয়াধীন। অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সম্প্রতি পর্যায়ক্রমে সেসব নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হতে শুরু করেছে। পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা কিছু মামলার এজাহার এবং ওই সময়ের ঘটনার ছবি ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশের তাণ্ডবের বেশ কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে।
৫ আগস্ট সরকার পতনের দিন বিকেলেও গুলি চালায় পুলিশ। এসব গুলিতে অনেকে নিহত হন। নিহতদের মধ্যে অনেকের মরদেহের হদিস পর্যন্ত মেলেনি এখনো। এর মধ্যে গাজীপুরের কোনাবাড়ী থানা এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন মো. হৃদয় (২০) নামে এক কিশোর। ঘটনার দিনের একটি ভিডিও সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ছেলেটিকে গুলি করার পর বস্তায় ভরে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। ওই দিন তার মতো আরও কয়েকজনের মরদেহ গুম করেছে থানা পুলিশ। একইভাবে ৫ আগস্ট দুপুরের পর ঢাকার আশুলিয়া থানার প্রধান ফটকসংলগ্ন স্থানে একটি ভ্যানে রাখা ছিল বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীর গুলিবিদ্ধ নিথর দেহ। ওই ভ্যানেই হাত-পা ধরে পুলিশকে আরেকটি মরদেহ তুলতে দেখা যায়। সম্প্রতি ফেসবুকে ভাইরাল এ সংক্রান্ত ভিডিও। পরে ভিডিওটি তদন্তে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে।
এর মধ্যে ওই ঘটনায় সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়া ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সুপারনিউমারারি পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) আবদুল্লাহিল কাফীকে গত সোমবার রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়। গতকাল কাফীর বিরুদ্ধে লাশ পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগে আশুলিয়া থানায় একটি মামলা এবং হাজারীবাগ থানায় একটি মামলা করা হয়।
আইজিপি ও অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা : সাবেক আইজিপি শহীদুল হকের বিরুদ্ধে সাতটি, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমদের বিরুদ্ধে একটি, সদ্য সাবেক আইজিপি আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে ৩৬টি, স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ১১টি, সাবেক সিআইডি প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়ার বিরুদ্ধে দুটি, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি, পুলিশ হেডকোয়ার্টারের অতিরিক্ত আইজি খন্দকার লুৎফুল কবির ও জামিল আহমেদের বিরুদ্ধে একটি, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক এম খুরশিদের বিরুদ্ধে একটি, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৩৩টি, ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তারের (অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) বিরুদ্ধে ছয়টি, ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ড. খ. মহিদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে।
ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা: ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে ৩৮টি, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একটি, সাবেক সিটিটিসি প্রধান মো. আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে তিনটি, সিটিটিসির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুটি, সাবেক ডিআইজি রিপন সরদারের বিরুদ্ধে একটি, ডিআইজি খালিদ হাওলাদারের বিরুদ্ধে একটি, অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়াদ্দারের বিরুদ্ধে একটি, ডিএমপি যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারের বিরুদ্ধে ২৭টি, যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার এস এম মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে ৮টি, যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে একটি ও সঞ্জিত কুমার রায়ের বিরুদ্ধে একটি, রংপুর রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি রশিদুল হকের বিরুদ্ধে একটি, ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মারুফ হোসেন সরদারের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে।
পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা: ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের ডিসি ইকবাল হোসাইনের বিরুদ্ধে ৮টি মামলা, রমনা বিভাগের সাবেক ডিসি মোহাম্মদ আশরাফ ইমামের বিরুদ্ধে একটি, ডিএমপির ডিসি তানভির সালেহীন ইমনের বিরুদ্ধে একটি, গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগের ডিসি মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে দুটি, ডিসি ডিবি রাজিব আল মাসুদ ও মাহফুজুল আল রাসেলের বিরুদ্ধে একটি করে মামলা, সিটিটিসির ডিসি জাহিদ তালুকদার ও মতিঝিলের ডিসি হায়াতুল ইসলামের বিরুদ্ধে একটি করে, উত্তরার ডিসি আশরাফুল আজিমের বিরুদ্ধে দুটি, তেজগাঁও বিভাগের সাবেক ডিসি এইচ এম আজিমুল হক ও হাফিজ আল ফারুকের বিরুদ্ধে একটি, লালবাগের ডিসি মাহাবুব-উজ-জামানের বিরুদ্ধে একটি ও লালবাগ বিভাগের সাবেক ডিসি জাফর হোসেনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা: ওয়ারী জোনের এডিসি নুরুল আমিন, সবুজবাগ জোনের এডিসি গোবিন্দ চন্দ্র, ডিবির এডিসি শাহিন শাহ মাহফুজ, ডিএমপির এডিসি হাফিজ আল আসাদ, কোতোয়ালি জোনের সাবেক এডিসি মুহিত কবির সেরনিয়াবাত, লালবাগ জোনের সাবেক এডিসি শহিদুল আসলাম, ডিবির এডিসি জুয়েল রানা, হাসান আরাফাত, নাজমুল ইসলাম, মতিঝিল বিভাগের এডিসি সাব্বির রহমান, ডিবির এডিসি ফজলে এলাহী, মোহাম্মদপুর জোনের এডিসি মো. রওশানুল হক সৈকত ও ওয়ারী বিভাগের এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীমের বিরুদ্ধে একটি করে মামলা হয়েছে। এছাড়া ডিবির এডিসি আফজাল হোসেন টুটুলের বিরুদ্ধে রুজু হয়েছে দুটি মামলা।
সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা: নিউমার্কেট জোনের এসি রেফাতুল ইসলাম রিফাত, কোতোয়ালি জোনের সাবেক এসি শাহীনুর রহমান, পেট্রোল-মোহাম্মদপুরের এসি মো. শহীদুল হক, মোহাম্মদপুর জোনের এসি মিজানুর রহমান, ট্রাফিক-যাত্রাবাড়ী জোনের এসি তানজিল আহমেদ ও মতিঝিল জোনের এসি গোলাম রুহানীর বিরুদ্ধে একটি করে মামলা হয়েছে। এছাড়া ইন্সপেক্টর-এসআই-এএসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তা ও কনস্টেবলের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা হয়েছে।
১৫ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর: গত ১৩ আগস্ট পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মনিরুল ইসলাম ও সদ্য সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। ২১ আগস্ট পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি মো. আতিকুল ইসলাম, মো. আনোয়ার হোসেন ও সিটিটিসি প্রধান মো. আসাদুজ্জামানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এরপর শিল্পাঞ্চল পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাহাবুবর রহমান, সদ্যসাবেক সিআইডি প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া এবং পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি জয়দেব কুমার ভদ্রকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। ২৭ আগস্ট চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনের সাবেক কমিশনার পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি কৃষ্ণপদ রায়, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) মো. মোজাম্মেল হক ও খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার সরদার রাকিবুল ইসলামকে অবসরে পাঠায় সরকার। সবশেষ ২ সেপ্টেম্বর ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মীর রেজাউল আলম, পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার লুৎফুল কবির, সিআইডির ডিআইজি মো. ইমাম হোসেন ও নোয়াখালী পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত ডিআইজি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবিরকে অবসরে পাঠানো হয়।

