রেজাউল করিম, লোহাগড়া
আমার ছেলেকে এখানে ভর্তি করিয়েছি। ডায়রিয়া ওয়ার্ডে কোনো বেড নেই। ঠান্ডায় মেঝেতে কষ্ট করে থাকতে হচ্ছে। সবগুলো বাথরুম অপরিষ্কার। হাসপাতালের পরিবেশ একদম অস্বাস্থ্যকর ।ওষুধ-পাতিও তেমন পাওয়া যায় না, বাইরে থেকেই কিনতে হয়, গরীব মানুষের জন্য এটা অনেক বড় সমস্যা। সরকারি হাসপাতালে আমরা আসি তো বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ পেতে, তা যদি না পাওয়া যায়, তাহলে সরকারি হাসপাতাল থেকে সাধারন জনগনের কি লাভ। সম্প্রতি নড়াইলের কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা নিতে এসে এসব কথা বলেন স্বপন বিশ্বাস নামে এক রোগীর পিতা। তাঁর বাড়ি কালিয়া পৌরসভার মির্জাপুর এলাকায়। জনবল সংকট ও ওষুধের অপর্যাপ্ততায় শুধু স্বপন বিশ্বাস নন, উপজেলার অনেক রোগীই কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে কাক্সিক্ষত স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৮ সালে ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটি স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ এটিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। বর্তমানে হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের ২১টি পদ থাকলেও আছেন মাত্র ৭ জন। চক্ষু, নাক, কান, গলা (ইএনটি), মেডিসিন, চর্ম ও যৌন, গাইনি, অর্থোপেডিকস ও কার্ডিওলজিসহ বিশেষজ্ঞদের ১০ টি পদই বর্তমান শূন্য। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত গাইনী ও অর্থোপেডকিস বিশেষজ্ঞ পদে দুুই চিকিৎসক ছিলেন। নার্স ৩৭ জনের মধ্যে আছেন ২৫ জন। তৃতীয় শ্রেণির ২৮ টি পদের বিপরীতে রয়েছেন ১৮ জন। অফিস সহায়ক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, স্ট্রেচার বহনকারী ও ল্যাব অ্যাটেনডেন্টসহ চতুর্থ শ্রেণির ৩৬ টি পদে আছেন মাত্র ৬ জন কর্মচারী। ফলে অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন থাকে হাসপাতাল চত্বর। চিকিৎসকরা বলছেন, চিকিৎসক সংকটের কারণে অফিস টাইমের বাদেও দীর্ঘ সময় হাসপাতালে তাঁদের রোগী দেখতে হয়। এটা তাঁদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। বাড়তি চাপ নিয়ে রোগী দেখতে হয়। তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও রোগীদের পুরোপুরি সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এছাড়া চিকিৎসক সংকটের কারণে মাসে মাত্র দুই দিন হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে, তাও নড়াইল সদর থেকে চিকিৎসক এনে। সরেজমিন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ফটক পেরিয়ে কিছুটা সামনে বহিঃর্বিভাগের রোগীদের সারি। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে ভিড় ঠেলে টিকিট কেটে রোগীরা যাচ্ছেন চিকিৎসককের কক্ষের সামনে। সেখানেও একই রকম ভিড়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা পর চিকিৎসককে দেখিয়ে ওষুধ কাউন্টারে গিয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না রোগীরা।শিশুকন্যাকে নিয়ে চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অপেক্ষমাণ উপজেলার বিলবাউচ গ্রামের সাবিনা বেগম বলেন, ‘জ্বর- কাশিতে আক্রান্ত মেয়েকে নিয়ে আধাঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি। এখনো ডাক্তার দেখাতে পারিনি। কখন সিরিয়াল পাবো তার ঠিক নেই।মহিলা ওয়ার্ডে থাকা উপজেলার তেলিডাঙ্গা গ্রামের মুক্তা খানম বলেন, ৬ দিন হলো হাসপাতালে আইছি। এখান থেকে কোনো ওষুধ দেয়নি। বাইরে থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার ওষুধ কিনছি। গরিব মানুষ সবই যদি কিনে আনতি হয়।কমল কৃষ্ণ দাস নামে একজন বলেন, হাসপাতালে ভর্তির পর টাকা খরচ করে বাইরে থেকে রক্ত পরীক্ষা করেছি। পরে ডাক্তার আবার এক্সরে করতে বলেছে। হাসপাতালে না হলেও বাইরে থেকে করতে হবে, বাঁচতে তো হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ জন রোগী ভর্তি থাকেন। প্রতিদিন এখানে বহির্বিভাগে ৪০০ থেকে ৪৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। তাঁদের চিকিৎসা দিতে হয় মাত্র ৭ জন চিকিৎসককে। কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার না থাকায় এই ৭ জনই সব ধরনের রোগী দেখেন। ফলে রোগী দেখতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় তাঁদের। এছাড়া বিগত আগস্টের পরে টেন্ডার না হওয়ায় ওষুধের ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। গত দুই মাসে এই সংকট তীব্র হয়েছে। আগে যেখানে ২৭-৩০ প্রকার ওষুধ প্রদান করা হতো, সেখানে এখন ৬-৭ প্রকারের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে রোগীদের। প্যারসিটামল, ক্যালসিয়াম, গ্যাসের ওষুধ ও এন্টিবায়োটিকের সংকট সবচেয়ে বেশি। হাসপাতালের একমাত্র এক্সরে মেশিন দুই বছর ধরে বিকল, টেকনিশিয়ানের পদও ফাঁকা। এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক কর্মকর্তা (আরএমও) ও দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ পার্থ প্রতীম বিশ্বাস বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসক থেকে শুরু করে সব পদেই জনবল সংকট রয়েছে। যার ফলে চিকিৎসাসেবা অনেকাংশে ব্যাহত হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী না থাকায় হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রোগীর ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে। গত ছয় মাস যাবত টেন্ডার বন্ধ থাকায় ওষুধের প্রচুর সংকট রয়েছে, তাই রোগীদের পর্যাপ্ত ওষুধ দিতে পারছি না। এ বিষয়গুলো আমরা ঊর্ধ্বতন মহলকে জানিয়েছি। তাঁরা সমাধানের চেষ্টা করছেন।

