বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের ভয়াবহ প্রবণতা আবারও আলোচনার কেন্দ্রে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ বাংলাদেশের অর্থনীতির এক অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি আমানতের পরিমাণ ৩৩ গুণ বেড়েছে। শুধু সুইজারল্যান্ড নয়, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, দুবাইসহ অনেক দেশে এখন বাংলাদেশি বিত্তবানদের সম্পদ, বাড়ি ও গোপন অর্থ ছড়িয়ে রয়েছে। এই প্রবণতা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের টাকার পরিমাণ ৩৩ গুণ বেড়ে প্রায় আট হাজার ৯৭২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এটি এমন এক সময় ঘটছে, যখন অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য চেষ্টা করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ক্ষমতার পালাবদল এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ—এই উল্লম্ফনের প্রধান কারণ। বিশেষ করে ব্যাংক পর্যায়ের আমানতের এই বৃদ্ধি বৈদেশিক বিনিয়োগ বা আমদানি-রপ্তানির আড়ালে অর্থপাচারের ইঙ্গিত দেয়। বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এই অর্থ দেশে বিনিয়োগ না হয়ে বিদেশে চলে যাওয়া মানে দেশের উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ ব্যাহত হওয়া। অন্যদিকে দেশের ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। ২০২৫ সালের মার্চ মাস শেষে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে চার লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকায়।
কিছু প্রভাবশালী ব্যাংক মালিক পারস্পরিক যোগসাজশে ঋণ নিয়ে বিপুল অর্থ নিজেদের পকেটে পুরেছেন। দুর্নীতির মাধ্যমে গচ্ছিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমেও বিদেশে পাচার হচ্ছে এবং অনেকেই ক্ষমতা হারিয়ে দেশ ছাড়ার আগে নিজেদের জমিজমা বিক্রি করে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিচ্ছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচনের অনিশ্চয়তা এবং ক্ষমতার পালাবদলের শঙ্কা এই প্রবণতা ত্বরান্বিত করেছে। বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, কেবল অবৈধ উপার্জন নয়, অনেকে বৈধ উপার্জিত অর্থও রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে বিদেশে স্থানান্তর করছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন অর্থপাচারের দুটি মূল কারণ তুলে ধরেছেন : দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ গোপন রাখা এবং দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল আইনের শাসন ও আস্থার অভাবে নিরাপদ বোধ না করা। এই গুরুতর সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে অবিলম্বে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা অত্যাবশ্যক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, যাতে তারা কোনো চাপ বা হস্তক্ষেপ ছাড়াই অনিয়মগুলো চিহ্নিত ও প্রকাশ করতে পারে। সরকার অর্থপাচার রোধে টাস্কফোর্স গঠন করেছে, কিছু ব্যাংক হিসাব জব্দও হয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো এখনো এক টাকাও ফেরত আসেনি। বড় বাধা হলো ‘লেয়ারিং’ বা অর্থ গন্তব্য দেশ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে স্থানান্তরের জটিলতা, যা প্রমাণ করা আইনি দিক থেকে কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। যেসব রাজনীতিক, আমলা, ব্যবসায়ী পাচারের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দিকেও নজর দিতে হবে।

