সুন্দর সাহা
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সোনা পাচারের ট্রানজিট পয়েন্ট এখন যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা এবং চুয়াডাঙ্গা জেলার সীমান্তের বিভিন্ন অবৈধ ঘাট। যশোরের শার্শা-বেনাপোল-ঝিকরগাছা এবং চৌগাছার, ঝিনাইদহের মহেশপুর, সাতক্ষীরার ভোমরা, কলারোয়া, চুয়াডাঙ্গারা দর্শনাসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার হচ্ছে সোনার বার। বিগত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের শীর্ষ জনপ্রতিনিধিদের ম্যানেজ করে এসব সীমান্ত ঘাট দিয়ে মন-মন সোনার বার ভারতে পাচার করা হতো। কিছুদিন ঘাপটি মেরে থাকার পর সোনা পাচারকারী চক্র রং বদলে ফের সোনা পাচার শুরু করেছে। যার প্রমাণ মিলেছে গতকাল যশোর ও সাতক্ষীরায় পৃথক অভিযানে সোনার বারসহ একজন নারী ও একজন পুরুষকে আটকের মাধ্যমে। সশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যশোর ব্যাটালিয়নের (৪৯ বিজিবি) সদস্যরা ২৫ জুন বুধবার যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে পাঁচটি সোনার বারসহ একজন চোরাকারবারীকে আটক করেছে। আটক সোনার ওজন ৫৮৫.৫৪ গ্রাম। আরেক অভিযানে ভারতে পাচারের চেষ্টাকালে সাতক্ষীরায় ৫১৭ গ্রাম ৮৫ মিলিগ্রাম ওজনের ছয় টুকরা দেশী তেজাবী (হাতপাকা) সোনাসহ নাসরিন নাহার (৩০) নামের এক নারী চোরাকারবারিকে আটক করেছে সাতক্ষীরা বিজিবি সদস্যরা। বুধবার (২৫ জুন) সকালে সাতক্ষীরা সদর উপজেলাধীন সাতক্ষীরা-ভোমরা সড়কের আলীপুর এলাকা থেকে এই সোনাসহ তাকে আটক করা হয়।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, যশোর (২৫ জুন) বুধবার যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে ৫৮৫.৫৪ গ্রাম ওজনের পাঁচটি সোনার বারসহ একজন চোরাকারবারীকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (৪৯ বিজিবি)। মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে বিজিবি সদস্যরা ময়নাল মোল্লা (৩৫) নামে ওই ব্যক্তিকে আটক করে। বিজিবির টহলদল জানায়, ময়নালের জুতার সোলের ভেতরে বিশেষ কায়দায় লুকানো ছিল সোনার বারগুলো। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, ঢাকার গাবতলী এলাকার একটি চক্রের কাছ থেকে স্বর্ণ সংগ্রহ করে সাতক্ষীরা সীমান্ত হয়ে ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল। আটককৃত ব্যক্তি ময়নাল ঢাকার উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মিরপুর এলাকার ৯ কোর্টবাড়ী গ্রামের জয়নালের ছেলে। উদ্ধারকৃত সোনার আনুমানিক বাজারমূল্য ৮৬ লাখ ৭৭ হাজার ৭০২ টাকা এবং সঙ্গে থাকা মোবাইলের মূল্য ৩০ হাজার টাকা, মোট জব্দকৃত মালামালের মূল্য প্রায় ৮৭ লাখ ৭ হাজার টাকা। বিজিবি সূত্র জানায়, আটককৃত স্বর্ণ ও আসামিকে যশোর কোতোয়ালি থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে এবং সোনা ট্রেজারিতে জমা দেওয়ার কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন। যশোর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল্লাহ্ সিদ্দিকী মিডিয়াকে জানান, সীমান্তবর্তী এলাকায় স্বর্ণ, মাদক, অস্ত্র, ডলারসহ অন্যান্য চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি ও আভিযানিক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে পৃথক অভিযানে ভারতে পাচারের চেষ্টাকালে সাতক্ষীরায় ৫১৭ গ্রাম ৮৫ মিলিগ্রাম ওজনের ছয় টুকরা দেশী তেজাবী (হাতপাকা) স্বর্ণসহ নাসরিন নাহার (৩০) নামের এক নারী চোরাকারবারিকে আটক করেছে সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়নের (৩৩ বিজিবি) সদস্যরা। বুধবার (২৫ জুন) সকালে সাতক্ষীরা সদর উপজেলাধীন সাতক্ষীরা-ভোমরা সড়কের আলীপুর এলাকা থেকে এই স্বর্ণসহ তাকে আটক করা হয়। আটক স্বর্ণ চোরাকারবারি নাসরিন নাহার সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী ভোমরার টাওয়ার এলাকার ইমাম হোসেনের স্ত্রী। বিজিবি সূত্র জানায়, ভারতে পারের উদ্দেশ্যে সোনার একটি চালান সাতক্ষীরা এলাকা থেকে ভোমরা সীমান্তের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সাতক্ষীরাস্থ বিজিবি ৩৩ ব্যাটালিয়নের অধীনস্থ বাঁকাল চেক পোস্টের হাবিলদার শাহীন আহমেদের নেতৃত্বে একটি অভিযানিক দল সকালে সদর উপজেলার আলীপুর এলাকায় অবস্থান নেয়। এসময় ভোমরা সীমান্তের দিকে যাওয়ার পথে সন্দেহভাজন হিসাবে নাসরিন নাহারকে আটক করে বিজিবি। পরে তল্লাশি চালিয়ে তার কাছ থেকে ছয় টুকরা দেশী তেজাবী (হাতপাকা) স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। যার ওজন ৫১৭ গ্রাম ৮৫ মিলিগ্রাম। উদ্ধারকৃত স্বর্ণের মূল্য প্রায় ৭৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। সাতক্ষীরাস্থ বিজিবি ৩৩ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মো. আশরাফুল হক পিবিজিএম, পিএসসি, জি সোনাসহ এক নারী চোরাকারবারিকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আটক নারীকে সাতক্ষীরা সদর থানায় হস্তান্তর এবং জব্দকৃত স্বর্ণ ট্রেজারিতে জমা দেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সীমান্তের সূত্রগুলো জানায়, যশোরের শার্শা-বেনাপোল-ঝিকরগাছা ও চৌগাছা, ঝিনাইদহের মহেশপুর, সাতক্ষীরার ভোমরা কলারোয়া, চুয়াডাঙ্গারা দর্শনাসহ বিভিন্ন সীমান্তের শতাধিক অবৈধ ঘাট দিয়ে ইতিপূর্বে বিপুল পরিমাণ সোনা পাচার করেছে সংঘবদ্ধ পাচারকারীরা। এই ঘাটগুলো চালু করেছে আন্তর্জাতিক সোনা সিন্ডিকেটের হোতা ভারতের ওপারের মাফিয়া ডন খ্যাত বস্ গৌতম, কুখ্যাত আজগার, অপু সাহা, দিলীপ ঘোষ, নাসির, রবিউল, ছোট গৌতম, রাজিব, ডাকুসহ বিভিন্ন সিন্ডিকেট মালিকরা। যাদের মূল হোতা হচ্ছে, আর্ন্তজাতিক সোনা চোরাচালানী দুর্ধর্ষ কিলার বস্ গৌতম, মাফিয়া ডন আজগার এবং কুখ্যাত অপু সাহা গং। একইভাবে এপারে রয়েছে শতাধিক সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেটের প্রতিটির রয়েছে আবার ১০ থেকে ৫০ জন ক্যারিয়ার। এপারে ক্যারিয়ার নিয়ন্ত্রণকারীদের মধ্যে প্রধান হচ্ছে আন্তর্জাতিক সোনার ডিলার হচ্ছে ঢাকার সুমন, ঢাকার আওলাদ, ইমরাণ, আরিফ, রাম ও খোকাসহ কয়েকডজন সিন্ডিকেট। তাদের মাধ্যমে কয়েকশ ক্যারিয়ার সোনা নিয়ে ছোটে সীমান্তের দিকে। সোনা আন্তর্জাতিক সোনা পাচারকারী সুমন ও আওলাদ হচ্ছে মাফিয়া ডন বস্ গৌতমের খুব কাছের লোকেদের মধ্যে একজন। যাদের মাধ্যমে সোনা ঢাকা থেকে এই অঞ্চলেল বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। মাঝে-মধ্যে এই চক্রের ক্যারিংম্যান সোনার চালানসহ ধরাও পড়ে। কিন্তু সিন্ডিকেটের মূল মালিকরা থেকে যায় পর্দার আড়ালে। বিগত সরকারের আমলে সীমান্ত এলাকার আওয়ামী লীগের অনেক জনপ্রতিনিধি সোনা চোরাচালানের অবৈধ ঘাটগুলোর অঘোষিত মালিক ছিলেন। তাদের অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে আছে দেশেই। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পাচারকারী আর গডফাদাররা জার্সি বদল করে আছে বহাল তবিয়তে। সীমান্তের সূত্রগুলো জানায়, পূর্বের ধারা বাহিকতায় বর্তমানেও বিজিবির অভিযানে সোনার বার আটক হচ্ছে। আটকের পর পর পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। কিন্তু অদৃশ্য কারনে আটক হচ্ছে না সোনা পাচারের মূল হোতারা। সোনা পাচারের গডফাদাররা কেন অধরা থাকছে এমন প্রশ্নের কোন জবাব নেই। সীমান্তে সোনাসহ যারা বিজিবির অভিযানে ধরা পড়ে তারা বাহক মাত্র। একারণে যেমন শিকড়ের গোড়ায় যাওয়া যায় না। তাছাড়া আটক ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে থানায় দিতে হয় এ কারণে বিজিবির আভিযানিক দলের সদস্যদের আটককৃতদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ নেই। কিন্তু পুলিশ আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে ব্যাপক রিম্যান্ডের মাধ্যমে আরো গভীরে যেতে পারে। যে সুযোগ বিজিবির নেই।

