১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড় পত্র ছিলনা কোন দিনই: যশোর জনতা হসপিটাল এন্ড ডায়গনস্টিক সেন্টার চলছে ডাক্তার-নার্স আর বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই!

সুন্দর সাহা
অনিয়ম আর চরম অব্যবস্থাপনায় চলছে যশোর শহরের জনতা হসপিটাল এন্ড ডায়গনস্টিক সেন্টার। এখানে নেই কোন নিজস্ব চিকিৎসক। নেই কোন ডিগ্রিধারী নার্স। অপারেশন থিয়েটারে নেই কোন ওটি লাইট। নেই হসপিটাল আর ডায়গনস্টিক সেন্টারের বৈধ লাইসেন্স। পরমানু কমিশনের সার্টিফিকেট বা অনুমোদন ছাড়াই চলছে এক্স-রে বিভাগের কাজ। সিল সর্বস্ব প্যাথলজিক্যাল রিপোর্টে চলছে রোগীদের সাথে প্রতারনা। নেই দক্ষ কোন জনবল। আর পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র তো ছিলো না কোন দিনই। কেবলমাত্র গ্রাম্য কোয়াক ডাক্তারদের ওপর ভর করে খোদ শহরের বুকে এমন একটি হসপিটালের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগের সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষসহ ক্ষতিগ্রস্থরা। বিষয়টি নিয়ে জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটি ও জেলা মাসিক উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির একাধিক সভায় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন, প্রেস ক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন, যশোর চেম্বারের সভাপতি মিজানুর রহমান, জেলা ওলামা দলের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মোশারফ হোসেনসহ একাধিক বক্তা আলোচনা করেন। সভার সভাপতি জেলা প্রশাসক মহোদয়ও এসব ভূয়া হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রনার্থে করনীয় বিষয়ে একাধিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

সভার সভাপতি মহোদয় এসব অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সিভিল সার্জনকে নির্দেশনাও প্রদান করেন। কিন্তু অদ্যাবধি সেই বিষয়ে কোন উদ্যোগ নেননি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান সিভিল সার্জন। এসব বিষয়টি নিয়ে সিভিল সার্জন ডাক্তার মাসুদ রানার দৃষ্টি আকর্ষন করা হলেও কোন সদুত্তর মেলেনি। সূত্র বলছে, এই ধরনের অবৈধ হসপিটাল এন্ড ডায়গনস্টিক সেন্টার থেকে মাসিক চুক্তি থাকায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ এসব অনিয়ম আর দূনীতি দেখেও না দেখার ভান করেন। সূত্র বলছে, আজ থেকে প্রায় ২ যুগ আগে যশোর সমবায় ব্যাংকের সম্পত্তি ২৫ বছরের চুক্তিতে লীজ নিয়ে যশোর জেল রোডে জনতা হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি গড়ে ওঠে। শুরুতে এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন বা লাইসেন্স গ্রহণ করলেও গ্রহণ করেননি পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন ছাড়পত্র। অথচ পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এবং পরমানু কমিশনের অনুমোদনপত্র ছাড়া কোন ক্রমেই হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও এক্স-রে বিভাগ পরিচালনা করা সম্পূর্ণ অবৈধ। কিন্তু এক অজানা রহস্যে যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্রে বছরের পর বছর ধরে এই ভূয়া প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের নামে মানুষ ঠকানোর ব্যবসা করে যাচ্ছে। আর এই সব কিছুই সম্ভব হচ্ছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কতিপয় দূর্নীতিগ্রস্থ কর্মকর্তা আর কর্মচারীর যোগসাজসে। সূত্র বলছে, একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার পূর্বশর্ত হচ্ছে দক্ষজনবল ও প্রয়োজনীয় মানসম্মত যন্ত্রপাতি দিয়ে এক বা একাধিক ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা। বিশেষ করে বৈধ প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা কমপক্ষে ডিপ্লোমাধারী ল্যাব এ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ, এমবিবিএস ডিগ্রিধারী প্যাথলোজিষ্ট নিয়োগ করা, উন্নতমানের রি-এজেন্ট ব্যবহার করা, ডিজিটালাইজিষ্ট পরীক্ষাগার স্থাপনসহ স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়ম কানুন মেনে চলা। এছাড়া এক্স-রে বিভাগের জন্য বাংলাদেশ পরমানু কমিশনের লাইসেন্সসহ বৈধ ডিগ্রিধারী টেকনিশিয়ান নিয়োগ করা বাধ্যতামূলক হলেও ব্যতিক্রম জনতা হসপিটাল কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ২০ বেডের হসপিটালের জন্য সার্বক্ষনিক ২জন এমবিবিএস ডাক্তার ও বৈধ ডিগ্রিধারী ৬জনডিপ্লোমা পাস নার্স নিয়োগ করা বাধ্যতামুলক হলেও জনতা হসপিটাল কর্তৃপক্ষ তা করেননি কোনদিনই। অনেকটা জোড়াতালি দিয়েই তারা এই প্রতিষ্ঠানটি চালিয়ে যাচ্ছেন রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে। একাধিক সূত্র বলছে, জয়েনস্ট্রক কোম্পানী কর্তৃক রেজিষ্ট্রেশন পাওয়ার পর থেকে গত ২২/২৩ বছর এই প্রতিষ্ঠানের এমডি, পরিচালকবৃন্দ বা শেয়ার হোল্ডারগণ ইচ্ছামতো শেয়ার বিক্রি করে মোটা অংকের অর্থ বাজার থেকে তুলে নিলেও তা হসপিটালের কাজে লাগানো হয়নি। কতিপয় ব্যক্তি সেই অর্থ ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। যার ফলে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এই হসপিটালটি নাম ছাড়া কোন কিছুই জনস্বার্থে বা চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের স্বার্থে কোন বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। বিশেষ করে ২০ বেডের এই হসপিটালের নেই কোন বৈধ লাইসেন্স। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নেই অনুমোদন। এক্স-রে বিভাগ চলছে মনগড়া ভাবে। আর পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছিল না কোন দিনই। কেবলমাত্র ছাড়পত্রের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করেই খালাস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জনতা হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বর্তমানে ৩৪ জন স্টাফ বা কর্মচারী কর্মরত আছেন। কিন্তু এদের কারোই কোন বৈধ নিয়োগপত্র নেই। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানের এমডি মিসেস আফরোজা ইসলাম বলেন, আমার কাছে কোন তথ্য নেই। আমার স্বামী মরহুম সাচ্চু ছিলেন এই হসপিটালের শেয়ার হোল্ডার। তার মৃত্যুর পর পরিচালকবৃন্দ আমাকে ধরে এনে জোর করে এই চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছেন। আমি ছিলাম একজন গৃহিনী। হসপিটালের কাজ কর্মের সাথে আমার কোন সম্পর্ক ছিলো না। আমি কোন দিন কোন অফিসে চাকুরীও করিনি। তারপরও সবাই মিলে আমাকে বসিয়ে দিয়েছেন। আমার কাছে কোন ফাইলপত্র নেই। সব জানে ম্যানেজার মনিরুল ইসলাম ও হিসাবরক্ষক মিজানুর রহমান। তিনি তার ব্যর্থতা অপকটে স্বীকার করে বলেন, আমি এই হসপিটাল ব্যবসার কোন কিছুই বুঝিনা। ফলে এ বিষয়ে আপনি আমাদের চেয়ারম্যান ও ম্যানেজারের সাথে কথা বলেন। যোগাযোগ করলে হিসাবরক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, তিনি এলজিডিতে চাকুরী করতেন। বর্তমানে অবসরে আছেন। তাই অবসর জীবনে এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়ে নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখতে চাচ্ছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই হসপিটাল ব্যবসার বিষয়ে তার কোন পূর্ব অভিঙ্গতা নেই। তিনি এই হসপিটালের একজন শেয়ার হোল্ডার। তবে বর্তমানে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মচারী। তিনি জানান, তাদের হসপিটালে নিয়োগ দেয়া কোন এমবিবিএস ডাক্তার নেই। তবে অন-কলে কিছু সরকারী- বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসকরা এই হসপিটালে রোগী দেখেন। পরিসংখ্যান তুলে ধরে ম্যানেজার মনিরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে জনতা হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একজন অনকল ডাক্তার যিনি ল্যাব ইনচার্জ, ম্যানেজার ১ জন, এক্স-রে টেকনিশিয়ান ১জন (ননটেক), ল্যাব ইনচার্জ ১ জন (নন টেক), ওটি ইনচার্জ ১ জন (নন টেক), ওটি এ্যাসিট্যান্ট ২ জন (নন টেক), কম্পিউটার অপারেটর ১ জন, রিসিপশনিষ্ট ২জন, রিপোর্ট ডেলিভারী-১ জন, ডাক্তারের এ্যাসিসট্যান্ট ২ জন (নন টেক), মার্কেটিং অফিসার ২জন, সেবিকা ৭ জন (নন ডিপ্লোমাধারী), ল্যাব সহকারী ১ জন (নন টেক)। এছাড়া ইমাম, পিয়ন, আয়া, ডে গার্ড, নাইট গার্ড ও ক্লিনার হিসেবে ৯ জন কর্মরত আছেন। এই ৩৪ জন স্টাফের বেতন সর্বোচ্চ ১৩ হাজার আর সর্বনিম্ন সাড়ে ৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান ম্যানেজার মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে যারা কর্মরত আছেন তাদের কোন নিয়োগপত্র দেওয়া হয়না। তবে তাদের সকলের সিভি জমা আছে। তবে তাদের কোন বেতন কাঠামো বা রেজিস্ট্রার নেই বলে তিনি দাবি করেন। এদিকে খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানে সুন্দর বিল্ডিং থাকলেও নেই কোন মানসম্মত অপারেশন থিয়েটার বা ওটি। এখানে অপারেশন লাইটের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় সাধারণ বাল্বের লাইট। নেই পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার বড়ই অভাব। লাইসেন্স বা প্রয়োজনীয় অনুমোদনহীন এই প্রতিষ্ঠানটি কিভাবে বছরের পর বছর মানুষ ঠকানোর ব্যবসা করছে সে বিষয়ে হসপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, শুরুতে আমাদের সব ছিলো। পর্যায়ক্রমে সব নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা নতুন করে সব ঠিকঠাক করার উদ্যোগ নিচ্ছি। তবে পরিবেশের ছাড়পত্র নেই বলে গত ৪/৫ বছর ধরে আমাদের সব লাইসেন্স হেল্ডআপ রয়েছে। নবায়ন করা যাচ্ছে না। এক্স-রে বিভাগের অনুমোদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা বহু আগে পরমানু কমিশনে লাইসেন্স বা অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু গত ১০/১২ বছরে সেই বিষয়টি ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে। বর্তমানে কর্মরত স্টাফদের বৈধ নিয়েগপত্র দেখতে চাইলে তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, তাদের স্টাফদের কোন নিয়োগপত্র নেই। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন স্টাফ বলেন, এই হসপিটালে বৈধ নিয়োগ করা কোন ডাক্তার বা কোন নার্স বা কোন প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত টেকনিশিয়ান নেই। সবই কোয়াক। হাতে কলমে প্রশিক্ষন নিয়েই তারা এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। কি ল্যাব, কি প্যথলজি, কি এক্স-রে বা কি ওটি- সর্বত্রই একই দশা। মালিকদের লক্ষ্য শুধু টাকা কামানো। সেবা বলতে এই হসপিটালে কিছুই নেই। যা হচ্ছে তা সবই প্রতারনা। ডাঃ এ কে এম আব্দুল আওয়াল নামের একজন প্যাথলজিষ্ট ডাক্তারের সিল বানানো আছে। ল্যাবে কর্মরত নন টেকনিশিয়ানরা কম্পিউটার থেকে রিপোর্ট বের করে ওই ডাক্তারের সিল মেরে নিজেরাই তাতে স্বাক্ষর দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। এই রিপোর্ট চ্যালেঞ্জ করলে সব জারিজুরি ফাঁস হয়ে যাবে। এসব বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা: মাসুদ রানার দৃষ্টি আকর্ষন করলে তিনি বলেন, জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির মিটিংয়ে এসব অনুমোদনহীন হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিষয়ে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা শহরের বেশ কয়েকটি এই ধরনের অনুমোদনহীন হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে সিলগালা করা হয়েছে। বহু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে সব প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করা হবে। তবে এই ক্ষেত্রে তিনি লোকবল স্বল্পতার কথা তুলে ধরেন।

 

 

 

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়