সাইফুল হোসেন
ব্যবসা গড়ে তোলা যেমন কঠিন, তা টিকিয়ে রাখা আরও কঠিন। আর এই টিকে থাকার কেন্দ্রীয় উপাদান হলো—আর্থিক ব্যবস্থাপনা। ব্যবসা ছোট হোক বা বড়, নগদ অর্থপ্রবাহ (cash flow), খরচ নিয়ন্ত্রণ, পুঁজির পুনঃবিন্যাস, এবং লাভজনকতা নিরূপণ ছাড়া কোনো উদ্যোগ টিকে থাকতে পারে না। একজন উদ্যোক্তার স্বপ্নকে বাস্তবায়নের পেছনে যতটা প্রয়োজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনা, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন অর্থের যথাযথ পরিচালনা।
বিশ্বখ্যাত ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট বলেছিলেন, “Do not save what is left after spending; instead, spend what is left after saving.” অর্থাৎ, খরচ করার আগে সঞ্চয়ের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। এই নীতিই একজন ব্যবসায়ীকে আর্থিক দায়বদ্ধতা শেখায়। একজন ব্যবসায়ী যদি বুঝতে না পারেন, কখন কোথায় খরচ করতে হবে, কখন বিনিয়োগ করতে হবে এবং কখন সংযম প্রদর্শন করতে হবে—তাহলে তার ব্যবসা দ্রুতই ঝুঁকির মুখে পড়বে।বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায়, আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব আরও বেশি। অনেক উদ্যোক্তা শুধুমাত্র ভালো পণ্য বা সেবা থাকা সত্ত্বেও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হন শুধু দুর্বল অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কারণে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দেশের অন্যতম রিয়েল এস্টেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রূপায়ণ গ্রুপ। তারা একসময় ব্যাপক সম্প্রসারণে গিয়েছিল, কিন্তু আর্থিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে একাধিক প্রকল্পে আর্থিক সংকটে পড়ে। পরে তারা অর্থ ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা আনেন এবং ধাপে ধাপে তাদের ব্যালেন্স শিট পুনর্গঠন করে ঘুরে দাঁড়ান।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতও অর্থ ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। SME ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের ৬৫% ক্ষুদ্র ব্যবসা তাদের প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে—অপরিকল্পিত ঋণগ্রহণ, আয়-ব্যয়ের রেকর্ড না রাখা এবং মূলধন ঘাটতি। মূলধনের যথাযথ ব্যবহার ও পর্যবেক্ষণ না থাকলে ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা অসম্ভব।
একজন উদ্যোক্তার জন্য প্রাথমিক পর্যায়েই একটি বাজেট নির্ধারণ করা অপরিহার্য। বাজেটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে খরচ, লাভ, ক্ষতি ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা সম্ভব। অনেক সময় দেখা যায়, উদ্যোক্তারা ব্যক্তিগত ব্যয়ের সাথে ব্যবসার অর্থ মিশিয়ে ফেলেন, ফলে ব্যবসার প্রকৃত লাভ-ক্ষতি নিরূপণ করা যায় না। এক্ষেত্রে ব্যবসায়িক হিসাব পৃথক রাখা এবং নিয়মিত অডিট করানো জরুরি।
আর্থিক ব্যবস্থাপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ঋণ ব্যবস্থাপনা। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০% ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু তারা অনেকেই সঠিকভাবে ঋণ ব্যবহার করতে না জানার কারণে দেউলিয়াত্বের পথে চলে যান। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নারায়ণগঞ্জের একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার প্রথমদিকে অল্প পুঁজি নিয়ে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ালেও অর্থ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে তিনি প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে এক অভিজ্ঞ ব্যবসায়িক পরামর্শদাতার সাহায্যে তিনি তার লোন রিস্ট্রাকচার করেন, নির্দিষ্ট ব্যয় পরিকল্পনা তৈরি করেন, এবং ধীরে ধীরে ব্যবসাকে লাভজনক অবস্থানে ফিরিয়ে আনেন।
অনেক সময় উদ্যোক্তারা শুধু বিক্রির দিকে মনোযোগ দেন, কিন্তু লাভজনকতা (profit margin) বিশ্লেষণ করেন না। শুধু বেশি বিক্রি হলেই যে ব্যবসা ভালো চলছে, তা নয়। প্রতি পণ্যে কত টাকা লাভ হচ্ছে, সেটি বিশ্লেষণ না করলে ব্যবসার আর্থিক স্বাস্থ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। এই কারণে উদ্যোক্তাদের নিয়মিত লাভ-ক্ষতির বিবরণী (Profit & Loss Statement), নগদ প্রবাহের প্রতিবেদন (Cash Flow Statement) ও ব্যালেন্স শীট বিশ্লেষণ করা উচিত।
অর্থ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার এখন একান্ত প্রয়োজন। ব্যবসায়িক হিসাব রাখা, ইনভয়েসিং, স্টক ম্যানেজমেন্ট ও বাজেটিং-এর জন্য বিভিন্ন সফটওয়্যার যেমন QuickBooks, Tally বা Zoho Books এখন সহজলভ্য। অনেক উদ্যোক্তা প্রযুক্তির ব্যবহার না জানার কারণে ম্যানুয়াল হিসাব করে ভুলের শিকার হন। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া সফলতা কঠিন।
প্রশিক্ষণের গুরুত্বও এখানে অনস্বীকার্য। উন্নত দেশগুলোতে যেকোনো ব্যবসার জন্য আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশেও চেম্বার অব কমার্স, SME Foundation, BSCIC প্রভৃতি সংস্থা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু উদ্যোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা এখনো তেমন গড়ে ওঠেনি। উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি ‘ফিনান্সিয়াল লিটারেসি’ তৈরিতে আরও উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অন্যতম সফল ব্যবসায়ী গ্রুপ PRAN-RFL- এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমান একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “You cannot grow a business only with vision; you need numbers, and you need to understand your numbers.” তার এই কথা উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত শিক্ষণীয়। তার কোম্পানি প্রতি মাসে আর্থিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরবর্তী মাসের উৎপাদন, বিপণন ও খরচ নির্ধারণ করে। এই আর্থিক শৃঙ্খলাই PRAN-RFL-কে দেশের অন্যতম বড় গ্রুপে পরিণত করেছে।
সামগ্রিকভাবে বললে, ব্যবসায় আর্থিক ব্যবস্থাপনা কেবল খরচ কমানো বা টাকা জমানোর বিষয় নয়—এটি একটি কৌশলগত দায়িত্ব। এটি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করে। একটি শক্তিশালী অর্থ ব্যবস্থাপনা কাঠামো থাকলে ব্যবসা শুধু টিকে থাকে না, বরং সম্প্রসারিত হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করে।
এই যুগে যারা ফিনান্স বোঝেন না, তারা ব্যবসায় টিকে থাকার সক্ষমতা হারান। তাই আজকের তরুণ উদ্যোক্তাদের উচিত অর্থ ব্যবস্থাপনার প্রতি মনোযোগী হওয়া, প্রতিটি পয়সার হিসাব রাখা, এবং প্রতিটি বিনিয়োগের সম্ভাব্য রিটার্ন বুঝে তবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ শেষ পর্যন্ত, ব্যবসার সফলতা কেবল স্বপ্ন বা পরিশ্রম নয়—নির্ভর করে সংখ্যার ওপর, হিসাবের ওপর, এবং টাকার ব্যবস্থাপনার ওপর।
লেখক : “দ্য আর্ট অব পার্সোনাল ফাইনান্স ম্যানেজমেন্ট ও আমি কি এক কাপ কফিও খাবো না” বইয়ের লেখক, কলামিস্ট, ইউটিউবার এবং ফাইনান্স ও বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট।

