মাগুরা প্রতিনিধি
মেয়েদের ঝরে পড়া বা ফেলনা চুল এখন আর ফেলনা নয়। এই চুল থেকেই দেশে আসছে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। আর এই চুল বাছাইয়ের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন মাগুরার শালিখা উপজেলার শতাধিক নারী। সকালে রান্না-বান্না ও ঘরের কাজ শেষ করে গ্রামের নারীরা ছুটে যান চুল ছাড়ানোর কাজে। স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা জটলা বাঁধা চুল বাছাই করেন তারা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে এই কাজ। মাস শেষে পাওয়া আয় দিয়েই চলে তাদের পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, সন্তানদের হাতখরচ, খাতা-কলম কেনা থেকে শুরু করে ছোটখাটো সব চাহিদা। শালিখা উপজেলার পুকুরিয়া, আনন্দনগর, ফুলবাড়ি, ছান্দড়া ও নাঘোষাসহ বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে দল বেঁধে নারীরা পাটি বা প্লাস্টিকের মাদুর বিছিয়ে মনোযোগ দিয়ে চুল বাছাই করছেন। কেউ বসেছেন চৌকিতে, কেউ মাটিতে। এই কাজেই এখন নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে তাদের সংসার।
পুকুরিয়া গ্রামের সলোকা খাতুন বলেন, সকালে রান্না-বান্না ও ঘরের কাজ সেরে চুল বাছতে আসি। মাস শেষে যেটুকু টাকা পাই, তা দিয়ে মেয়ের খাতা-কলম কিনি, নিজের হাতখরচও চলে যায়। একই গ্রামের সম্পা খাতুন জানান, প্রতিদিন এক কেজি চুল বাছাই করি। এতে মাসে দুই হাজার টাকা পাই। এই টাকা দিয়েই ছেলে-মেয়েদের খরচ চালাই, সংসারের অন্যান্য কাজেও লাগে। চুল বাছাইয়ের পর সেগুলো পাঠানো হয় ঢাকায়। সেখান থেকে রপ্তানি হয় চীন, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রে। এসব চুল দিয়ে তৈরি হয় কৃত্রিম চুল (উইগ), দাড়ি-মোচ ও প্রসাধনী পণ্য। শালিখার বৈখালী গ্রামের ব্যবসায়ী ইকরামুল হোসেন বলেন, ১৩ বছর ধরে চুলের ব্যবসা করছি। নড়াইল, মাগুরা, যশোর ও গোপালগঞ্জসহ আশপাশের জেলা থেকে লম্বা চুল কিনে এনে গ্রামীণ নারীদের দিয়ে জট ছাড়াই। বর্তমানে আমার অধীনে প্রায় ১৫০ নারী কাজ করছেন। প্রত্যেকে মাসে গড়ে দুই হাজার টাকা আয় করেন। এতে একদিকে নারীদের কর্মসংস্থান হচ্ছে, অন্যদিকে আমিও লাভবান হচ্ছি। তবে কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানা ছাড়াই এসব নোংরা ও জট বাঁধা চুল বাছাই নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, সামান্য আয় এসব নারীদের উপকারে এলেও দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়তে পারে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ফেলনা চুল রপ্তানি করে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে। যার অংক ছিল ১ কোটি ১৪ লাখ মার্কিন ডলার। বর্তমানে চীনসহ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশে এসে এ খাতে বিনিয়োগ করছে। ফলে ছোট একটি খাত হলেও এটি সম্ভাবনাময় হয়ে উঠছে।

