১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

দেশে ইলিশের সংকট

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ শুধু স্বাদে অনন্য নয়, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে এই মাছ ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা উদ্বেগজনক। একদিকে সরকার প্রতিবেশী দেশ ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে, অন্যদিকে সীমান্ত পথে সক্রিয় পাচারচক্র চাঁদপুরের ইলিশ রাতের আঁধারে পাচার করছে। ফলে দেশীয় বাজারে ইলিশের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে পড়েছে এবং সাধারণ ভোক্তারা কার্যত বঞ্চিত হচ্ছেন মৌসুমের স্বাদ থেকে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। বিষয়টি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, যে ইলিশ ভারতে প্রতি কেজি এক হাজার ৫২৫ টাকা দরে রপ্তানি হচ্ছে, সেই একই ইলিশ দেশীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, তাঁরা লোকসান দিয়ে রপ্তানি করছেন, যা একটি অস্বাভাবিক চিত্র। তাহলে প্রশ্ন জাগে, কেন এমন লোকসানে ব্যবসা করা হচ্ছে? এর পেছনের কারণ কী, তা খোলাসা হওয়া দরকার।অন্যদিকে প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুমিল্লার পাঁচ উপজেলার ১৬টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রতি রাতে চাঁদপুরের ইলিশ পাচার হচ্ছে। এতে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতেরও কয়েকটি চক্র সক্রিয়।অথচ একসময় চাঁদপুরকে বলা হতো ইলিশের জন্মভূমি। মৌসুমে আড়ত ভরে যেত মাছের স্রোতে, যা সারা দেশের চাহিদা মেটাত। এখন সেই চাঁদপুরেই ইলিশের সংকট স্পষ্ট। পাচার ও রপ্তানির চাপের কারণে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে।
এক দশক আগে যে মাছের দাম ছিল কয়েক শ টাকা, আজ তা মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে।ব্যবসায়ীরাও বলছেন, সরবরাহ ঘাটতি ও পাইকারি বাজারের নিয়ন্ত্রণহীনতা এই মূল্যবৃদ্ধির বড় কারণ।
এই অবস্থায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীল পদক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠেছে। রপ্তানির প্রয়োজন থাকলেও দেশীয় বাজারের ক্রেতাদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি সবার আগে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। বিজিবি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে সীমান্তে পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
ইলিশ শুধু রপ্তানি আয়ের উৎস নয়, এটি বাংলাদেশের জনগণের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন নয়, বরং নাগরিকদের প্রাপ্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অন্যথায় জাতীয় মাছ হয়তো কেবল কাগজে-কলমে টিকে থাকবে, ভোক্তার থালায় নয়।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়