উন্নয়ন প্রকল্প দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি, আর এসব প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করে স্বচ্ছতা ও সুশাসনের ওপর। কিন্তু যখন একটি বড় প্রকল্প সময় ও অর্থ অপচয় করে, দায়বদ্ধতার অভাব দেখায় এবং জনগণের অর্থের অপব্যবহার করে, তখন তা উন্নয়নের পরিবর্তে দুর্নীতির এক করুণ চিত্রই তুলে ধরে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পটুয়াখালীর এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্টের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন প্রকল্পটি কাগজে-কলমে ‘সমাপ্ত’ হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরিকল্পনা কমিশনের আইএমইডির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অনুমোদিত সময়সীমা শেষ হলেও অনেক মৌলিক কাজ; যেমন—সাইট অফিস নির্মাণ, জমির ক্ষতিপূরণ প্রদান শেষ হয়নি।অথচ প্রকল্পকে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে লিখিত সুপারিশ ছাড়াই, যা সরকারি নির্দেশিকার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এর পাশাপাশি ২০১৭-১৮ থেকে ২০২৩-২৪ সাল পর্যন্ত সাত বছরের কোনো অডিট প্রতিবেদন নেই। একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও নিরীক্ষার অনুপস্থিতি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক উদাসীনতারই প্রমাণ দেয়।প্রকল্পের পিসিআরে দাবি করা হয়েছে, ৮৭.৯১ শতাংশ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।কিন্তু মাঠ পর্যায়ে আইএমইডির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক মৌলিক কম্পোনেন্টই অসম্পূর্ণ। এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো ১৪৮ কোটি টাকার অজানা গন্তব্য। প্রকল্প পরিচালক বলছেন, অর্থ ছাড়ই হয়নি। কিন্তু যদি তা-ই হয়, তবে তা স্পষ্টভাবে পিসিআরে প্রতিফলিত হলো না কেন? ক্ষতিগ্রস্ত ভূমির মালিকরা এখনো ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় রয়েছেন।পুনর্বাসনের বরাদ্দ বিতরণও স্বচ্ছভাবে হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো জবাবদিহির। একটি রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে এত বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, অথচ তার অডিট হয় না, কাজের মিথ্যা অগ্রগতি দেখানো হয়, ক্ষতিপূরণ বাকি থাকে, ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণের টাকা কাটা হয় না।সরকারি প্রকল্প মানেই জনগণের ট্যাক্সের অর্থ। তাই প্রতিটি টাকা ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
অসমাপ্ত কাজকে সমাপ্ত ঘোষণা, অডিট গোপন রাখা এবং জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো দুর্নীতি ও অনিয়মের সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেয়। তাই এই প্রকল্পের অনিয়মগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। নইলে উন্নয়নের নামে অপচয় আর দুর্নীতি চলতেই থাকবে।আমরা মনে করি, কেবল বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়, সেগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এবং অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের গাফিলতি চলতে থাকলে দেশের উন্নয়নপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে এবং জনগণের আস্থা নষ্ট হবে।

