মিঠুন দত্ত, অভয়নগর
টানা চার মাসের বেশি সময় জলাবদ্ধতায় চরম সংকটে যশোরের দুঃখখ্যাত ভবদহবাসী। তার পরও নিরানন্দ পরিবেশে সামর্থ্য অনুযায়ী শুরু হয়েছে দূর্গা পূজা। দুঃখ-দুর্দশায় দিন পার করা পরিবারগুলোও নিজেদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছে ধর্মীয় রীতি রক্ষার। চারিদিকে থৈ থৈ পানি। যেন হাঁটা চলার উপায় নেই। এ অবস্থায় মানুষের বাইরে বের হওয়া দুস্কর। আয় রোজগারে ভাটা পড়েছে সবার। তবে এরই মধ্য শুরু হয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেও সব চেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। কিভাবে হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই ভবদহ জলাবদ্ধ অঞ্চলের পরিবারের সদস্যদের। তারপরও আশায় বুক বেঁধে থৈ থৈ পানির মধ্যেই মন্ডব প্রতিষ্ঠা করে উৎসব পালনের চেষ্টায় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। টানা বৃষ্টিপাতে যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুর উপজেলার শতাধিক গ্রামের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে ভবদহ অঞ্চলে মানুষের এই উৎসবের আনন্দ অনেকটাই ম্লান। আগেই তীব্র বৃষ্টিপাতে তলিয়ে গেছে বসতবাড়ি, ঘেরভেড়ী, ফসলি ক্ষেত, স্কুল কলেজ মাদ্রসা ও মসজিদ মন্দির। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের দৈনন্দিন পুজা করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। বাড়ি ছেড়ে অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে শতশত পরিবার। বন্ধ হয়ে গেছে আয় রোজগারের সকল পথ। মানুষের ঘরে ঘরে এখন কেবল হাহাকার আর চাঁপাকান্না।
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীও উৎসব দূর্গাপুজা। মহলয়ার মধ্য দিয়ে পুজার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়ে।২ সেপ্টেম্বর বিজয়া দশমীর মধ্যদিয়ে শেষ হবে। তবে এ উপলক্ষে উৎসবের কোন আমেজ নেই ভবদহ অঞ্চলের প্রেমবাগ, সুন্দলী, পায়রা ও চলিশিয়া ইউনিয়নের ভুক্তভোগী সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের মনে। চারিদিকে কেবল অথৈ পানি ও সীমাহীন দুর্ভোগে উৎসবের আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে। দু’মুঠো ভাত জোগাড় যেখানে চরম আরধ্য; উৎসব সেখানে বিলাসীতা বলে জানিয়েছেন পানিবন্দি এলাকার মানুষ। উপজেলা পরিষদের তথ্য মতে, অভয়নগরে অসখ্য মন্দির প্রাঙ্গন পানিতে তলিয়ে গেছে। পুজা অর্চনার নূন্যতম অবস্থা নেই অনেক মন্দিরে। যে সকল স্থানে মেলা বসে সেখানে এখনো কোমর সমান পানি। অভয়নগরে এ বছর ১২৭টি পূজা মন্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা পূজা উদযাপন হবে। উপজেলার সুন্দলী ইউনিয়নের ডহরমশিহাটি গ্রামের বাসিন্দা সোমনাথ বিশ্বাস বলেন, গত এক মাস ধরে সংসারে আয় রোজগার বন্ধ। মাছ ধরে তা বিক্রি করে কোনমতে জীবন বাঁচিয়ে রেখেছি। পুজো উৎসব আমাদের মত গরীব মানুষের জন্য না। উপজেলার চলিশিয়া ইউনিয়নের বলারাবাদ গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, আমাদের কোন পুজো নেই। পুজোর সময় ছেলে মেয়েদের নতুন জামাকাপড় কিনে দিতে পারছি না। পানিও সরছে না। আমাদের কষ্ট দেখার আসলে কেউ নেই। সুন্দলী সার্বজনীন দূর্গা পুজা মন্দির কমিটির সভাপতি উজ্বল বিশ্বাস বলেন কোন রকমে মায়ের পূজা শুরু করেছি আমরা,সরকারী সামান্ন অনুদানে আর গ্রামবাসির অল্প অল্প প্রণামির টাকায় আমাদের এ আয়োজন। যে কারণে পূজা শেষ করাটাই বড় কষ্টের। ভবদহ পানি নিষ্কাষণ সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক রণজিত বাওয়ালী জানান ভবদহ অঞ্চল একচাটিয়া হিন্দু অধুসিত অঞ্ল,এ জনপদে বড় করে দূর্গা পূজা করতে না পারাটা দুঃখ জনক। আর কর কাল এ জনপদের মানুষকে সাপ আর ব্যাঙ্গের মত বসবাস করতে হবে। যশোর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপংকর দাস রতন জানান, ভবদহ পারের বাসিন্দাদের মধ্যে উৎসব নেই। তারা বাঁচতে চান। উৎসব না থাকলেও সরকারিভাবে নানা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। দ্রুত পানি নিস্কাশনের সঙ্গে টিআরএম চালু ও আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন তিনি। পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, গতবারের তুলনায় এবার জলাবদ্ধতা কম। দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুতই ভবদহ অঞ্চলের পাঁচটি নদী পুনর্খনন করবে সেনাবাহিনী। পূজায় জলাবদ্ধতা নিরাসনে কাজ চলছে।

