শাহানা হুদা রঞ্জনা
পড়াশোনা করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে, এই কথা শুনে আমরা যারা বড় হয়েছি, তারা বড় হওয়ার পরে বুঝতে পেরেছি, সবক্ষেত্রে এই কথা প্রযোজ্য নয়, সব কালেও নয়। কারণ আমরা দেখেছি পড়াশোনা কম করেও শ্রম ও মেধা খাটিয়ে অনেকেই সাফল্য করেছেন। অনেকেই ব্যবসা করে বড় হয়েছেন। যাক সে কথা, ফিরে আসি বর্তমানে পড়াশোনা ও চাকরির বাজার প্রসঙ্গে।বর্তমান ব্যবস্থায় শিক্ষার সাথে বেকারত্বের অদ্ভুত একটা বিপরীত সম্পর্ক রয়েছে, আর সেই সম্পর্ক ইতিবাচক দিক থেকে নয়। শিক্ষা বাড়লেই যে ছেলেমেয়েরা চাকরি পাচ্ছেন, তা কিন্তু নয়, আমরা তা দেখছি না। অর্থনীতিবিদরা বলেন, যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ১১ বছর কিংবা তারচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছেন, সেসব শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব বেশি। নারীদের মধ্যে যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ৯ বছরের বেশি কাটিয়েছেন, তাদের মধ্যেও বেকারত্বের হার উচ্চ।
কেন এমন একটা বৈরী সম্পর্ক হলো পড়াশোনার সাথে চাকরির? চাকরির বাজার এখন এমন প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে যে কোনোভাবে একটা ডিগ্রি অর্জন করলেই চাকরি পাওয়া যায় না। কারণ চাকরিক্ষেত্রে বেড়েছে শ্রমবিভাজন বা যার যার সেক্টরে সেরাটা দেখানোর প্রবণতা। চাকরিদাতারাও এমনটা চায়। নতুন কর্ম পরিবেশে, নতুন কৌশল ও বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যারা এগিয়ে যেতে পারবেন, তারাই জয়ী হবেন। শুধু সরকারি চাকরির উপর নির্ভরশীলতা তরুণ-তরুণীদের সময় ও কর্মক্ষমতা নষ্ট করে।এমনিতেই আমাদের চাকরির বাজার প্রয়োজনের তুলনায় কম, সেখানে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে অবস্থা আরো কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে নিয়োগকর্তাদের পক্ষ থেকে যে বক্তব্য দেয়া হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে ‘ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব স্বাভাবিক পরিবেশে একটি দেশে বছরে সর্বোচ্চ ৩ লাখ স্নাতকের কর্মসংস্থান করা সম্ভব। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি নেই। গত এক বছরে নতুন নিয়োগ প্রায় হয়নি বললেই চলে। কোম্পানিগুলো শুধু চাকরি ছেড়ে দেওয়া বা মারা যাওয়া করা কর্মীদের শূন্যস্থান পূরণ করেছে।’ তাহলে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে চাকরির বাজার কতটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদরাও এই উদ্বেগের সঙ্গে একমত। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন গণমাধ্যমকে বলেছেন, আসল বিপদ হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যা তৈরি করছে এবং নিয়োগকর্তাদের যা প্রয়োজন, তার মধ্যকার অমিল। বাংলাদেশ এক বিপজ্জনক অসামঞ্জস্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখানকার শিক্ষার সঙ্গে চাকরির মিল নেই। প্রশ্নটা এই নয় যে দেশে এখন যথেষ্ট স্নাতক আছে কি না? বরং মূল প্রশ্ন হলো, অর্থনীতির জন্য যে ধরনের মানবসম্পদ জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা জোগান দিতে পারছে কি না।’বেকারত্ব হার নির্ধারণের বিদ্যমান পদ্ধতির সমালোচনা করে অর্থনীতিবিদরা আগেও উল্লেখ করেছেন দেশে কর্পোরেট, বহুজাতিক কোম্পানি, ব্যাংক, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে চৌকস তরুণ-তরুণীদের চাহিদা বেড়েছে। সেখানে সাধারণ রেজাল্ট করে, গা-ছাড়া ভাব নিয়ে, পড়াশোনা কম করে, ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় পারঙ্গম না হলে, কম্পিউটার প্রযুক্তিতে দক্ষ না হলে কাজ পাওয়া খুব কষ্টকর।
আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক পরিমাণে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অনেকেই পড়াশুনা শেষ করে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চাইছেন। অথচ তাদের সে ধরনের পড়াশোনা, ভাষাগত ও কমিউনিকেশন দক্ষতার অভাব রয়েছে।
এরই বাস্তব চিত্র আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন জরিপে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ স্নাতক ৩০ বছর বয়সেও বেকার থাকেন। অথচ এই বয়সের পর সরকারি-বেসরকারি চাকরির দরজা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে কম (১.২৫ শতাংশ)। অন্যদিকে সর্বোচ্চ বেকারত্বের হার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদের মধ্যে (১৩.৫৪ শতাংশ)। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকরা চাকরি পাচ্ছেন না, ভুগছেন হতাশায়। এবং এমনসব কাজে নিয়োগ পাচ্ছেন, যা তাদের পড়াশোনার তুলনায় কম মানের।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ২০২২ সালে সতর্ক করেছিল, প্রতি বছর ৭ লাখেরও বেশি স্নাতক দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের ৬ জনই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থী। এই কলেজগুলোর পাঠদান দুর্বল, পাঠ্যক্রম পুরোনো, আর শিল্প খাতের সঙ্গে সম্পর্ক খুব কম।
এভাবেই সারা দেশে শিক্ষিত বেকারদের এই সংকট দ্রুত বাড়ছে এবং অন্যতম প্রধান সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে। একটি রিপোর্ট বলছে দেশের সবচেয়ে বড় চাকরির ওয়েবসাইট বিডিজবস ডটকমের তথ্য অনুসারে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ স্নাতক ৩০ বছর বয়সেও বেকার থাকেন। অথচ এই বয়সের পর সরকারি-বেসরকারি চাকরির দরজা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সেই তুলনায় বেসরকারি (১৪ শতাংশ) ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের (২৯ শতাংশ) বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের ক্ষেত্রে এই হার একটু কম। অ্যাকাডেমিক গবেষণাতেও চিত্রটি কম হতাশাজনক নয়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গত ডিসেম্বরের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৮ শতাংশ স্নাতক বেকার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) তাদের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপে আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে কম (১.২৫ শতাংশ)। আর সর্বোচ্চ বেকারত্বের হার বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারীদের মধ্যে (১৩.৫৪ শতাংশ)। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি তিনজন বেকারের একজন স্নাতক। অর্থাৎ দেশে প্রায় ৯ লাখ ডিগ্রিধারী বেকার রয়েছেন, যা মাত্র আট বছর আগের সংখ্যার দ্বিগুণ। এর মানে দাঁড়াচ্ছে যত বেশি স্নাতক শিক্ষাজীবন শেষ করে বের হচ্ছেন, তাদের জন্য চাকরির সুযোগ তত কমছে।
অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছেই। তিন বছর আগেও যেখানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৫০টি, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৫৬টি, আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০১টি থেকে বেড়ে হয়েছে ১১৬টি। এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যারা বের হচ্ছেন এবং হবেন তাদের চাকরি কোথায়?
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন দেশের তরুণ জনশক্তিই হতে পারতো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হলেও তা যথেষ্ট পরিমাণে কর্মসংস্থান তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাঁরা মনে করেন কৃষি খাতের অবদান জিডিপিতে ১১ শতাংশেরও কম, এরপরেও দেশের ৪৫ শতাংশ কর্মীর কর্মসংস্থান করে এই খাত। এই কর্মসংস্থানকে ছদ্ম বেকারত্ব ও স্বল্প কর্মসংস্থান বলে মনেকরা হয়।
অন্যদিকে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ৩৭.৪৪ শতাংশ হলেও এখানে মাত্র ১৭.৩৮ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান হয়। সেবা খাতের অবদান জিডিপির ৫১.৬২ শতাংশে হলেও এখানে ৩৮ শতাংশেরও কম কর্মীর কর্মসংস্থান হয়। আসলে দেশের আর শিক্ষা ব্যবস্থা চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো, স্নাতক ডিগ্রিধারীদের সম্পদ না করে বোঝা হিসেবে দেখাচ্ছে।
দেশে এখন নানাধরণের রাজনৈতিক সমস্যা, প্রশাসনিক অব্যবস্থা, ভোট নিয়ে তথৈবচ অবস্থাসহ আরো কিছু সমস্যা নানাভাবে বেকারত্বের ইস্যুটিকে পেছনে ফেলে রেখেছে। বেকারত্বের হার বেড়ে ৪.৬৩ শতাংশ হয়েছে। বর্তমানে কর্মহীন প্রায় ২৭.৪ লাখ মানুষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বেকারত্ব বাড়ার অনেক কারণ যেমন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশ না থাকা ও ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেশি হওয়া, বিনিয়োগকারীর অভাব। টাকা থাকা সত্তে¡ও অনেক মানুষ টাকা বিনিয়োগ করতে চাইছেন না, ফলে বেকারত্ব বাড়ছে। দেশের কর্মে নিয়োজিত বা শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় বেকার লোকের সংখ্যা বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে দেশে বেকার মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার বেড়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। নারীর চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে পুরুষ বেকারের সংখ্যা।
চাকরির ক্ষেত্রে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন আনাটা জরুরি। মাস্টার্স করে চাকরি করবো, অফিসার হবো এই স্বপ্ন এখন আর কাজ করছে না। সরকারি কলেজের একজন অধ্যাপক বললেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে সম্প্রতি যে কয়জন এমএলএসএস নিয়োগ পেয়েছেন, তারা সবাই মাস্টার্স পাশ। ফলে তাদেরকে চা বানানো বা দোকান থেকে কিছু আনতে বলতে শিক্ষকরা নিজেরাই খুব সংকোচ বোধ করছেন। এছাড়া সারাদিন ফাই-ফরমাশ খাটার কাজ থাকেই। ফলে শিক্ষকরা পারতপক্ষে পিয়ন বা এমএলএসএসদের খুব একটা কাজ দিচ্ছেন না। আর এমএলএসএসরা কাজ না পেয়ে অলস সময় কাটাচ্ছেন।
খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের বেকারত্ব কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এসএসসি পাশ শ্রমিকের চাকরি গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছেন মাস্টার্স পাস ছেলেমেয়েরা। বাবা-মায়ের অনেক কষ্টের টাকা খরচ করে, নিজেরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে, ৫/৬ বছর সময় পার করে এবং ভবিষ্যতের উজ্জ্বল স্বপ্ন চোখে নিয়ে এই ছেলেমেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন, সেকি পিয়ন ও ওয়েম্যান হওয়ার জন্য? নিশ্চয়ই তা নয়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সেদিকেই পরিচালিত করছে আমাদের তরুণ সমাজকে।
বেকার জীবন একজন তরুণের জন্য ভয়াবহ। বিশেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এবং পরিবারের দায়িত্ব নেয়ার কথা মাথায় রেখে যেসব তরুণ-তরুণী পড়াশোনা শিখেছেন, দীর্ঘসময় বেকার থাকা তাদের কাছে অভিশাপের মত। তাই তারা বাধ্য হয়ে একটি চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার জন্য যে-কোনো কাজে যোগ দিচ্ছেন।
শুধু তাই নয় ১০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বেতনেও কাজ করছেন অনেক ছেলে-মেয়ে বেসরকারি অফিস ও এনজিওগুলোতে। যেহেতু শিক্ষিতদের জন্য চাকরির বাজার খুব খারাপ অর্থাৎ কাজের চেয়ে উচ্চশিক্ষিত মানুষ বেশি, তাই চাকরিদাতা কর্তৃপক্ষ এই সুযোগ গ্রহণ করেন। তারাও যথাসম্ভব কম বেতনে নিয়োগ দেন। এরপর আছে এপ্রিনটিস হিসেবে আরো বছরখানেক কাজ করিয়ে নেয়ার প্রবণতা। যেহেতু কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়ে থাকে, তাই এই অভিজ্ঞতা লাভের জন্য তরুণ-তরুণীরা মুখ বুজে স্বল্প টাকার বেতনে কাজ করতে বাধ্য হন।
আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষাকে অবমূল্যায়ন করা ছোটবেলা থেকে আমাদের কানে মন্ত্র পড়ানো হয় যে পড়াশোনা করে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অফিসার, শিক্ষক, অ্যাডভোকেট হতে হয়, আর কোন পেশা নয়। এমনকি ব্যবসা করার কথাও মাথায় দেয়া হয়না। ইলেকট্রিশিয়ান, প্লামবার, ক্লিনার, নার্স, ড্রাইভার, কাঠের কাজ, কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি মেরামতও যে অর্থ আয়ের সম্মানজনক কাজ হতে পারে একথা আমরা, শুনিনি এবং কাউকে এসব হতেও বলি না।
নতুনভাবে পেশা হিসেবে এসেছে গ্রাফিক্স ডিজাইন, এআই, আউটসোর্সিং এর কাজ, অনলাইনে নানাধরণের ব্যবসা এবং আরো অনেককিছু। কম্পিউটার রিলেটেড কাজের ক্ষেত্রে সুযোগ অনেক। দুনিয়াব্যাপী চলছে এই কাজ বা ব্যবসা। এখন এসব কাজ জানলে যে কেউ ঘরে বসেই আয় করতে পারেন। কেয়ার গিভারের কাজটা দেশে-বিদেশে সমান চাহিদা। এমনকি প্রফেশনাল ডমিস্টিক হেল্প হিসেবে দেশেতো চাহিদা আছেই, হংকং এও কাজের সুযোগ আছে। ছোট ছোট বিজনেস উদ্যোগ নিয়েও আমরা ভাবি না। ২০/২৫ বছর আগেও প্রতিযোগিতা ছিল কম, ফলে এলোমেলো লক্ষ্য নিয়ে ঘোরাফেরা করতে করতে ছাত্রছাত্রীরা কোথাও না কোথাও ঢোকার সুযোগ পেয়েছে।
কিন্তু এখন সময় বদলেছে। প্রতিযোগিতা যেমন অনেক বেশি, কাজের ধরণ ও ক্ষেত্রও বেশি। শুধু সরকারি চাকরির উপর নির্ভরতা নয়, প্রচুর বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাজার দখল করে আছে, আছে ব্যাংক-বীমা, এনজিও। অবশ্য এরপরেও উচ্চশিক্ষিত জনশক্তির তুলনায় কর্মক্ষেত্র কম। অনেক ছেলে-মেয়ে বিদেশ থেকে অথবা ভালো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করছে। এদের ইংরেজি ভাষাগত দক্ষতা, কমিউনিকেশন স্কিল, প্রেজেন্টেশন পদ্ধতি অনেক আধুনিক। বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এদেরই খোঁজে। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার পরও যারা মাঝারি মাপের বা মাঝারির চাইতেও কম, তাদের জন্য কাজের বাজার হয়ে পড়ে খুব সীমিত। না পারছেন যে-কোনো কাজে যোগ দিতে, না পারছেন পছন্দমতো চাকরিতে যোগ দিতে। অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, ’মারাত্মক দক্ষতা-ঘাটতির কারণে আমরা চাকরির বাজারের চাহিদা মেটাতে পারছি না। এ কারণেই স্থানীয় নিয়োগকর্তারা বিদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ অব্যাহত রেখেছেন।’
আমরা দেখেছি উচ্চশিক্ষিত মানুষ কাজ হারালে, আবার সমমানের কাজ পাওয়াটা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু পড়াশোনা কম জানা মানুষ, কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ কেউ বেকার থাকেননি। আমাদের মাইন্ডসেটটা এমন হয়েছে যে কম ক্লাস পর্যন্ত পড়া বা কারিগরি কাজ করাকে আমরা মর্যাদা দিতে চাই না, কিন্তু এখন দিন পাল্টেছে, চাকরি ও উচ্চশিক্ষা নিয়েও আমাদের চিন্তায় পরিবর্তন আনতে হবে। যেভাবেই হোক বেকারত্ব ঘুচাতে হবে।
লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।

