১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা পার পেয়ে যাচ্ছেন

​বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের চলমান সংকট এবং ‘ইচ্ছাকৃত’ ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রণয়নে সৃষ্ট অসংগতি  এক প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা সত্ত্বেও ব্যাংকগুলো পক্ষপাতমূলকভাবে যে তালিকা তৈরি করেছে, তাতে নিরপরাধ, সৎ ও প্রকৃত ব্যাবসায়িক ব্যর্থতার শিকার গ্রাহকরা ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন, অথচ পর্যাপ্ত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে বিরত থাকা প্রকৃত ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এটি কেবল তালিকা প্রণয়নের একটি প্রক্রিয়াগত ত্রুটি নয়, বরং আর্থিক ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত অনিয়ম ও নৈতিক স্খলনের এক ভয়াবহ চিত্র।​প্রতিবেদন অনুসারে, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ স্বার্থ রক্ষার প্রবণতা এই প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করে দিয়েছে।প্রকৃত ইচ্ছাকৃত খেলাপি, যাঁরা ব্যাংকের টাকা লুটে লাপাত্তা হয়েছেন বা ভিন্ন খাতে অর্থ সরিয়েছেন, তাঁদের অনেকে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। অন্যদিকে বাস্তব নানা কারণে ঋণ শোধে অক্ষম অনেক উদ্যোক্তা অযাচিতভাবে এই কলঙ্কের শিকার হচ্ছেন। স্বয়ং বাংলাদেশ ব্যাংকও স্বীকার করছে যে ব্যাংকগুলো ভুল তথ্য দেওয়ায় প্রক্রিয়াটি কার্যকর হয়নি এবং এটি এখন বাতিল করার চিন্তা-ভাবনা চলছে। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি ভালো উদ্যোগের হতাশাজনক পরিণতি।এস আলম গ্রুপের মতো প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঘটনা প্রমাণ করে, ব্যাংকগুলো এখনো প্রভাবশালীদের কাছে নতি স্বীকার করছে।
​অর্থনীতিবিদদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রণীত ‘ব্যাংক কোম্পানি অ্যাক্ট (সংশোধিত) ২০২৩’ মূলত দলীয় সুবিধাভোগীদের বিপুল ঋণকে নিয়মিত করার সুযোগ তৈরি করেছিল, যা ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা আনার বদলে প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের সুরক্ষা দিয়েছে। এখন ছয় লাখ কোটি টাকার বিশাল খেলাপি ঋণের বোঝা সামনে এসেছে, যা দেশের মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
যেসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠী অনিয়ম করে এই খাতকে আজকের অবস্থায় নিয়ে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে করদাতাদের অর্থে ব্যাংক মার্জ করার সরকারি উদ্যোগ হতাশাজনক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান যেমনটি বলেছেন, ‘আমরা সব খেলাপিকে এক পাত্রে রাখতে চাচ্ছি।’​ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে প্রথমে প্রকৃত ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি বিতর্কিত ‘ব্যাংক কোম্পানি অ্যাক্ট (সংশোধিত) ২০২৩’ বাতিল করে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া চালু করা অপরিহার্য। নতুবা নিরপরাধ গ্রাহকরা ক্রমাগত অপরাধী হয়ে উঠবেন, আর প্রকৃত অপরাধীরা দায়মুক্তি পেয়ে ব্যাংকিং খাতকে নিঃশেষ করে দিতে থাকবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়