১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

পাহাড় থেকে মরুভূমি; ইতিহাস থেকে আধুনিক প্রযুক্তি

আলিমুল হক
নিংসিয়ার রাজধানী ইনছুয়ান ছেড়ে আসার পর থেকে আমরা কোনো হোটেলে এক রাতের বেশি থাকার সুযোগ পাইনি। ৯ আগস্ট কুইউয়ানের একটি হোটেলে ছিলাম, ১০ আগস্ট ২০২৫ থাকতে হয়েছে চুংওয়েই শহরের একটি হোটেলে। বেইজিংয়ে ফেরার আগ পর্যন্ত এই সিলসিলা চলতে থাকে। কারণ, আমরা নিংসিয়ার পাঁচটি শহরের সবকটিতেই যেতে চেয়েছি, এবং আমাদের হাতে সময় ছিল তুলনামূলকভাবে কম।
প্রতিদিন হোটেল পরিবর্তন মানে রাতে চেক ইন এবং সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে চেক আউট। এর পরপরই শুরু হয় বাসে আমাদের বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শনের কাজ। ইনছুয়ানে থাকতে লাঞ্চের পর হোটেলে ফিরে খানিকটা বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ ছিল, ইনছুয়ান ছাড়ার পর তা আর রইল না। লাঞ্চের পর কোনা ব্রেক ছাড়াই শুরু হয় বিকেলের কার্যক্রম। একটানা ঘোরাঘুরির পর রাতে নতুন হোটেলে চেন ইন করে, পরদিন সকালে আবার লাগেজ-ফাগেজ নিয়ে বাসে চেপে বসা ও সারাদিন বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শন করা কষ্টের কাজ। ১০ আগস্ট ছিল তেমন একটি দিন।
সকালে কুইউয়ানের হোটেল ছেড়ে, বাসে চেপে আসি চুংওয়েই শহরে। যথারীতি পাহাড় থেকে মরুভূমি পর্যন্ত নানান জায়গায় ঘোরাঘুরি। দিনশেষে শরীর ও মন দুটোই ক্লান্ত। আমরা নতুন হোটেলে চেক ইন করলাম বিকেল সাড়ে ছয়টার দিকে (এখানে সূর্য ডোবে ৮টায়)। আমাদের বলা হলো, যার যার রুমে গিয়ে লাগেজ রেখে নিচে নামতে; ডিনারে যেতে হবে। ক্লান্ত আমি রুমে এসেই শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে গেলাম। গোসলশেষে, চীনা সহকর্মী শিশিরকে ম্যাসেজ দিয়ে জানালাম, আমি ডিনার করব না; ওরা যেন আমার জন্য অপেক্ষা না করে।
টিমের সঙ্গে ডিনার তো করলাম না, কিন্তু রাতে যখন পেট চো চো করবে, তখন কী করব! হোটেলরুমে রাখা ম্যানুয়েলটা উল্টে-পাল্টে দেখলাম। না, ওরা রুমে খাবার সার্ভ করে না। কী আর করা, মাগরিবের পর বাইরে বেরুলাম, কিছু শুকনো খাবারের সন্ধানে। হোটেলের পাশেই পাওয়া গেল একটা ছোট ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। রুটি, চিপস, আর আইসক্রিমের একটা বাটি নিয়ে রুমে ফিরলাম। ততক্ষণে ক্ষুধা পেয়েছে। রুটি খেয়ে, আইসক্রিমের বাটি নিয়ে বসলাম। কিন্তু চামচ কই! আইসক্রিম তুলে খাওয়ার জন্য সাথে কিছু নেই! হোটেলরুমেও কোনো চামচ নেই। বাধ্য হয়ে রিসেপশনে ফোন করলাম। ওরা ইংরেজি বোঝে না, আমি চীনা বুঝি না। অনেক সাধ্য-সাধনার পর অবশেষে বোঝানো গেল। চামচ এলো। আমি আইসক্রিম খেয়ে লিখতে বসলাম।
১০ আগস্ট ছিল চীনের নিংসিয়া হুই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে আমাদের, মানে বেইজিং থেকে আসা বিভিন্ন গণমাধ্যমের একদল সাংবাদিকের, ৬ষ্ঠ দিন। কুইউয়ান থেকে চুংওয়েই আসার পথে, জানালা দিয়ে দেখছিলাম নিংসিয়ার প্রকৃতিকে। রাস্তার দু’পাশে ফসলের ক্ষেত, মাঝেমাঝে ছোট ছোট গ্রাম। গ্রামের অধিকাংশ ঘর দোচালা। আরও দেখলাম পাহাড়ে পাহাড়ে অসংখ্য উইন্ডমিল। বিশাল আকৃতির উইন্ডমিলের তিনটি করে পাখা। সেগুলো বাতাসে ঘুরছে, সৃষ্টি করছে বায়ুবিদ্যুত। এ বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা পোড়ে না, পরিবেশ দূষিত হয় না। আরও দেখলাম একটি মোটামুটি বড় কবরস্থান; একেবারে রাস্তার লাগোয়া। হুই মুসলিমদের কবরস্থান। কোনো কোনো কবর বাঁধাই করা, কোনো কোনোটি চেনা যায় উঁচু মাটির ঢিঁবি দেখে।
সাধারণত বৌদ্ধরা বিশ্বাস করে যে, মানুষ বার বার জন্ম নেয় ও মৃত্যুবরণ করে, যতক্ষণ না তার নির্বাণ লাভ হয়। আমাদের দিনের প্রথম গন্তব্য ছিল নিংসিয়া মাউন্ট সুমেরু। সেখানে পর্বতের পাথর কেটে কেটে বানানো গৌতম বুদ্ধের কয়েকটি বড় বড় মূর্তি আছে। বহু বছরের পুরাতন এসব মূর্তি। আরও আছে পবর্তের গায়ে বহু গুহা, যেগুলোতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বসবাস করতেন বলে ধারণা করা হয়।বুদ্ধের মূর্তিগুলো প্রাচীনকালে বানানো। সেখানে আরও আছে প্রাচীন রেশমপথের ধ্বংসাবশেষ। পাশাপাশি, আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি একটি একক পিলারের সেতুও আছে দেখলাম। পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বানানো রাস্তায় এই সেতু। একটি মাত্র পিলারওয়ালা সেতু আমি আগে কখনও দেখিনি। আমার মুখে ইংরেজি ‘T’ আকৃতির সেতুটির সৌন্দর্যের প্রশংসা শুনে শিশির যেন খানিকটা অবাকই হলো। সে বলল, এটি পাহাড়ের দু’টি অংশকে সংযুক্ত করেছে মাত্র! কথা সত্য। কিন্তু, তারপরও সেতু তো সেতুই!
আমরা যখন সেতু নিয়ে কথা বলছি, তখন দলের প্রায় সবাই পাহাড়ের গায়ে খাঁচ কাটা সিঁড়ি বেয়ে আরও উপরে উঠছিলেন। আমি আর শিশির তাদের সঙ্গী হইনি। আরও দু’একজন সদস্যও নিচেই বসে রইলেন। একসময় উপরের তাঁরা নিচে নেমে এলেন। আমরা সবাই লাঞ্চের জন্য রওয়ানা হলাম। বাস আমাদের নিয়ে গেল একটি মুসলিম রেঁস্তোরায়। বিশাল রেস্তোরাঁ। দেখে মনে হলো, প্রায়শই এখানে বিয়েটিয়ের অনুষ্ঠান হয়। খাবার যথারীতি সুস্বাদু। হোটেলের মালিক বা ম্যানেজার এসে বললেন, খাবারে ব্যবহৃত শাকসবজি, মাংস, ইত্যাদি সবকিছুই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত। আমি এক বাটি নুডুলস নিলাম। ম্যানেজার বললেন, এর নাম হুই নুডুলস।
আগেই বলেছি, এ পর্যায়ে আমাদের প্রতিদিন হোটেল বদলাতে হচ্ছিল। এর মানে, লাঞ্চের পর বিশ্রামের সুযোগ নেই। লাঞ্চশেষে ছুটলাম শাফুথৌ নামের একটি অঞ্চলে ‘ওয়েস্টার্ন সিয়া পোরসিলেইন ওয়ার্কশপ’ দেখতে। আগের এক লেখায় বলেছি, ওয়েস্টার্ন সিয়া তথা পশ্চিমাঞ্চলীয় সিয়া রাজবংশ ১০৩৮ থেকে ১২২৭ সাল পর্যন্ত, আজকের নিংসিয়াসহ আশেপাশে একটি বিশাল এলাকাজুড়ে স্থাপিত রাজ্য শাসন করেছিল। আলোচ্য ওয়ার্কশপ সেই আমলের পুরার্কীতির আদলে পোরসিলেইনের বিভিন্ন পণ্য এখনও উৎপাদন করে যাচ্ছে। আর যেই কারখানায় সেগুলো উৎপন্ন হয়, সেটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইঞ্জিনিয়াররা বানিয়ে দিয়েছিলেন, বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে। তখন এই কারখানায় অবশ্য যানবাহন তৈরি হতো, পোরসিলেইনের পাত্র নয়।
সোভিয়েতদের তৈরি ভবনেই আজকের এই ওয়ার্কশপ যাত্রা শুরু করেছিল ২০১৮ সালের এপ্রিলে। ১৪৪০ বর্গমিটার আয়তনের ওয়ার্কশপের ভিতরে ঢুকলে প্রাচীন প্রাচীন একটা আবহ লক্ষ্য করা যায়। পোরসিলেইনের বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে এখানে আজও পশ্চিমাঞ্চলীয় সিয়া আমলের কিছু টেকনিক, হলুদ নদীর কাদামাটি, ও টেঙ্গার মরুভূমির সূক্ষ্ম বালি ব্যবহার করা হয়। ওয়ার্কশপে বিভিন্ন পণ্য তৈরি হয়, বিক্রি হয়, এবং এসব নিয়ে গবেষণা চলে। পাশাপাশি, এ কাজে আগ্রহীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও আছে। নিংসিয়ার স্থানীয় সরকার সংস্কৃতি ও পর্যটনের ওপর জোর দেওয়ার পর থেকে, এই ওয়ার্কশপের কদর অনেক বেড়েছে; এটি হয়ে উঠেছে একটি অন্যতম টুরিস্ট স্পট।
আগেই বলেছি, ১০ আগস্ট পাহাড় থেকে মরুভূমি পর্যন্ত নানান জায়গা পরিদর্শন করি আমরা। বাস্তবেই পাহাড় দিয়ে শুরু হয়ে দিনের কার্যক্রম শেষ হয় মরুভূমি দিয়ে। তবে, স্রেফ মরুভূমি দেখার জন্য আমরা ‘নিংসিয়া লংইউয়ান নিউ এনার্জি কোম্পানি লিমিটেড’-এর কর্মএলাকায় যাইনি, গিয়েছিলাম কোম্পানির অসাধারণ সাফল্যের সাক্ষী হতে।
বাসে চেপে এলাকার কাছাকাছি পৌঁছাতেই এক অসাধারণ দৃশ্য আমাদের চোখে পড়ল। যতদূর চোখ যায় শুধু সোলার প্যানেল আর সোলার প্যানেল; লক্ষ লক্ষ সোলার প্যানেল! দর্শকদের সুবিধার জন্য কোম্পানি একটা উঁচু প্লাটফর্মের মতো বানিয়ে রেখেছে। কাঠের তৈরি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয়। দু’দিক থেকে সিঁড়ি। নান্দনিক এ প্লাটফর্মের উপর দাঁড়িয়ে চারপাশের দৃশ্য আরও ভালো দেখা যায়। একদিকে নয়, দুইদিকে নয়, চারিদিকে লক্ষ লক্ষ সোলার প্যানেল! নতুন নতুন প্যানেল বসানোর কাজও চলছে সমানতালে। এসব প্যানেলের মাধ্যমে কোম্পানি সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং লক্ষ লক্ষ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ আশেপাশের প্রদেশগুলোতেও সরবরাহ করছে, বিশেষ করে হুনানে। কারণ, হুনানের সাথে কোম্পানির একটি সহযোগিতা চুক্তি আছে।
লক্ষ লক্ষ সোলার প্যানেল বসিয়ে পরিষ্কার বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, সেটা অবশ্যই বড় কথা; কিন্তু তারচেয়েও বড় কথা এসব প্যানেল বসানো হয়েছে মরুভূমিতে! এর জন্য কোম্পানিকে মরুশাসন করতে হয়েছে। মরুশাসনের ব্যাপারে চীন দক্ষতা অর্জন করেছে অনেক আগেই। আমি এই টেকনিক সিনচিয়াংয়েও দেখেছি। সেখানে মরুভূমিতে শত শত মাইলের সড়ক নির্মিত হয়েছে, মরুশাসনের পর। শুধু তাই নয়, বালিঝড় রোধেও এই মরুশাসন বড় ভূমিকা রাখছে।
আলোচ্য প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আমরা চারিদিকে যতই তাকাই, ততই অবাক হই। অন্যান্য দেশের সাংবাদিকরা বার বার বলছিলেন, ‘অসাধারণ! অভাবনীয়!’ আসলেই তাই। এ যেন অসম্ভবকে সম্ভব করার মতো ব্যাপার। শুনেছি, কোম্পানির বায়ুবিদ্যুতের প্রজেক্টও আছে। কোম্পানি এক কোটি ৩০ লাখ কিলোওয়াট দূষণমুক্ত বিদ্যুত উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। এর মধ্যে ৯০ লাখ কিলোওয়াট বিদ্যুত আসবে সৌরবিদ্যুত হিসেবে এবং বাকি ৪০ লাখ কিলোওয়াট আসবে বায়ুবিদ্যুত হিসেবে।
আরও অনেক টেকনিক্যাল বিষয় আছে, যা আমাদের অ্যান্টেনায় ধরে না। তবে, এটুকু বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, কার্বন-নিরপেক্ষ হবার যে লক্ষ্যমাত্রা চীন সরকার গ্রহণ করেছে, তা বাস্তবায়নের কাজ চলছে ভালোভাবেই; শুধু নিংসিয়াতে নয়, সারা চীনজুড়েই চলছে। চীন অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। আমার বিশ্বাস, কার্বন-নিরপেক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যেও এই দেশ ঠিক ঠিক পৌঁছে যাবে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেটা নির্ধারিত ২০৬০ সাল নাগাদ অর্জিত হবে, নাকি আরও আগেই হবে? মনে পড়ে, চীনকে ২০২০ সালের মধ্যে হতদারিদ্র্যমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছিল সরকার। সে লক্ষ্য অর্জিত হয় এক বছর আগেই! কার্বন-নিরপেক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটলে অন্তত আমি অবাক হব না। (চলবে)
চুংওয়েই, নিংসিয়া, চীন

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়