১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

অর্থনীতির সংকট হচ্ছে গভীর

দেশের অর্থনীতির সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্প গতি হারাচ্ছে। একদিকে বিনিয়োগে স্থবিরতা, অন্যদিকে একের পর এক চালু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকারত্বের হার দ্রুত বাড়ছে। অনেক কারখানা বন্ধ না হলেও ধুঁকে ধুঁকে চলছে। তারাও শ্রমিক ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছে। উৎপাদন কমে যাচ্ছে। রপ্তানি আয়, রাজস্ব আয়সহ নানা খাতে তার প্রভাব পড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায় কম হওয়ার জন্য এনবিআর কর্মকর্তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের শ্লথগতিকেই দায়ী করছেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের এমন শ্লথগতি কেন? ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মতে, গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢালাওভাবে শিল্প মালিক ও উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে মামলা, মামলা বাণিজ্য, হামলা, মব সন্ত্রাস, কারখানা ভাঙচুর, দখল, অগ্নিসংযোগের মতো অনেক ঘটনা ঘটেছে। গ্যাস-বিদ্যুতের অব্যাহত সংকটের কারণে কোনো কোনো শিল্প এলাকায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে গেছে। ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে ভয় পাচ্ছেন। এতে নতুন উদ্যোগ যেমন হচ্ছে না, বিদ্যমান উদ্যোগের সম্প্রসারণও ব্যাহত হচ্ছে। রয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্রমেই তা বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মামলা-হয়রানিতে বিপর্যস্ত বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন করে উদ্বেগের কারণ হচ্ছে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ এখনো স্বস্তিতে নেই, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের চাকাকে পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সঠিক পদক্ষেপের অভাবে পরিস্থিতি দিন দিনই খারাপের দিকে যাচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশ। গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত অপর একটি খবরে বলা হয়, বিনিয়োগের ঝুঁকি ও সহনশীলতা সূচকে ২২৬টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১৯৩তম। আর দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। এখানে বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। সম্প্রতি বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স এই ‘গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট রিস্ক অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইনডেক্স’ প্রকাশ করেছে। বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই সূচককে মূল্যায়ন করেন। হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচক ২০২৫-এ বাংলাদেশের পাসপোর্টও ১০৬টি দেশের মধ্যে ১০০তম অবস্থানে নেমে যায়। আইসিসি বাংলাদেশের ত্রৈমাসিক বুলেটিনের (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫) সম্পাদকীয়তে বলা হয়, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের পথে বাংলাদেশ। এই উত্তরণ কোনো সমাপ্তি নয়, বরং এটি ‘আরো কঠিন অধ্যায়ের সূচনা’। গত বুধবার আইসিসিবি থেকে পাঠানো সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি অর্থনৈতিক অস্থিরতার পর থেকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে, মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে, বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ভাটা পড়েছে। আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা ও সরবরাহশৃঙ্খলে বিঘ্নের কারণে টেক্সটাইল, পরিবহন ও সেবা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে রপ্তানি আয় কমেছে এবং নতুন বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে। সম্পাদকীয়তে আরো বলা হয়, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইইউ, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বড় রপ্তানি বাজারগুলোতেও বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। দেশি বা বিদেশি যেকোনো বিনিয়োগকারী দীর্ঘ মেয়াদে তাঁর বিনিয়োগের নিশ্চয়তা চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক। না পেলে তাঁরা পিছিয়ে যাবেন। অথচ ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে ব্যাপক বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই বিনিয়োগের জন্য দ্রুত আস্থার পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়