মোস্তফা হোসেইন
জামায়াতে ইসলামী একাত্তরে কোনো অপরাধ করেনি। তাদের কথা অনুযায়ী তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত হয়তো বা রাজনৈতিক ভুল হতেও পারে। একসময় তারা বলতো একাত্তরে তারা কোনো ভুলও করেনি। প্রায় অর্ধশতাব্দিকাল এভাবেই তাদের মুখ থেকে একাত্তর সম্পর্কে অবস্থান জানা গেছে।
কীভাবে তারা ভুল করেনি, এর উদাহরণ হিসেবে বলেছে,তারা একাত্তরে ভারতের আধিপত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। তারা বলেছে, এক পাকিস্তানে বিশ্বাস করে তারা ভুল করেনি। দুই ধারার বয়ানই সুযোগ সুবিধা অনুযায়ী তাদের কাছ থেকে শোনা গেছে দীর্ঘদিন। সর্বশেষ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের ১০০টার মধ্যে ৯৯টা সিদ্ধান্ত সঠিক, একটা তো বেঠিক হতে পারে। সেই বেঠিক একটা সিদ্ধান্তের জন্য জাতির ক্ষতি হতে পারে। সেই ক্ষেত্রে আমার কোনো সিদ্ধান্তের জন্য যদি জাতির ক্ষতি হয় তাহলে আমার মাফ চাইতে অসুবিধা কোথায়’।
ক্ষমা চাওয়ার এ সংবাদটি বাংলাদেশের গণমাধ্যমের প্রায় সবকটিতেই গুরুত্বসহ প্রকাশ হয়। এ নিয়ে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও পর্যালোচনা, টকশোর আয়োজন করে। জামায়াতের হয়ে যারা অংশ নিয়েছেন তাদের মুখ থেকে সেই ‘যদি’ ‘কিন্তু’ যুক্ত হয়েই আলোচিত হয়েছে-ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি। এই ‘যদি’ ক্ষতি হয়ে থাকে বলা, এটা এর আগেও ডা. শফিকুর রহমান ব্যক্ত করেছেন। এবারও করলেন। এবারসহ সম্ভবত তিনবার তিনি ক্ষমা চাওয়ার কথা বলেন।তিনি যেভাবে ‘যদি’ যুক্ত করে ক্ষমা চেয়েছেন সংবাদগুলোও ‘যদি’ রেখেই প্রকাশ করেছে। এ কারণেই মানুষ এই ক্ষমা চাওয়াকে ক্ষমা চাওয়া হিসেবে গণ্য করতে পারছে না। শুধু তাই নয়, কেউ কেউ একে প্রহসন বলেও মনে করছেন। বিশ্বইতিহাসে নৃশংসতার সাক্ষর হিসেবে একাত্তরের হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগের বিষয়টি স্বীকৃত। একাত্তরের শহিদদের উত্তরাধিকারীরা আজ পূর্ণবয়স্ক। একাত্তরের ক্ষতিগ্রস্তদের হাজার হাজার মানুষ এখনো জীবিত। পুঁথিপুস্তক দলিল-দস্তাবেজে সেই নৃশংসতার কথা প্রমাণ হিসেবে স্পষ্ট হয়ে আছে। এবং সর্বস্বীকৃত বিষয় হচ্ছে এই নৃশংসতার অন্যতম কারিগর জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, পিডিপি ও নেজামে ইসলামী।
যেহেতু জামায়াতে ইসলামীই অস্তিত্ব নিয়ে টিকে আছে কিংবা তাদের স্বাধীন দেশে রাজনৈতিক অধিকার দেওয়া হয়েছে, তাই তাদেরই রাজনৈতিকভাবে নৃশংসতার দায় স্বীকার করতে হবে। কিন্তু সবার আগে দুটি বিষয় স্পষ্ট করতে হবে-প্রথমত তাদের মানতে হবে, একাত্তরে পৃথিবীর জঘন্যতম কয়েকটি গণহত্যার একটি তাদের মাধ্যমে এই দেশে সংঘটিত হয়েছে। আর ‘যদি’ নয়, বাস্তবেই লাখ লাখ মানুষ তাদের হাতে নির্যাতিত হয়েছে, প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে ‘যদি’ ‘কিন্তু’ নেই।এই যে একাত্তরের প্রসঙ্গ টানা হলো, জামায়াতে ইসলামীর আমির কিন্তু একাত্তরকে আলাদা করে বলেননি। এখন কেউ বলতেই পারেন ১৯৪৭ থেকে ২০২৫ এর অক্টোবর পর্যন্ত তিনি সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন। এরমধ্যেই একাত্তর আছে। কিন্তু দীর্ঘসময়ের ভুলের জন্য এই ক্ষমা চাওয়াটা প্রশ্ন উদ্দীপক। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন একজন ব্যক্তি হয়তো চাকরি থেকে অবসরে যাচ্ছেন, কিংবা কেউ হয়তো বাসস্থান বদল করে দূরে কোথাও যাচ্ছে কিংবা এমনিতেও অনেকেই বলে-ভাই চলছি ফিরছি, কত বেয়াদবিই না করে থাকতে পারি, দয়া করে মাফ করে দিয়েন। জবাব আসে-আপনিও মাফ করে দিয়েন। অতি সরল বাক্যালাপ। এবং এটা আমাদের দেশে প্রচলিত। জামায়াতে ইসলামীর আমিরের এই ক্ষমা চাওয়াটা এর চেয়ে বেশি কিছু নয়।
জামায়াতের আমিরের এই ক্ষমা চাওয়া যে একাত্তরের অপরাধের জন্য নয়, তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার বোধকরি প্রয়োজন হবে না। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির ২৩ অক্টোবর সময় টিভিতে টকশোতে বলেন, ‘একাত্তরে যে জামায়াত ভুল করেনি তার প্রমাণ ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান’। এই আইনজীবীর বক্তব্যের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের বক্তব্য মিলিয়ে নিতে পারি। অর্থাৎ জামায়াতে ইসলামীর আমির একাত্তরে তাদের অপরাধের জন্য ক্ষমা চাননি। রাজনৈতিক ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকলে তার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন এটাই তিনি পরিষ্কার করে দিলেন। ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির মুক্তিযুদ্ধকেই বিতর্কিত করেছেন ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে জামায়াত অবস্থান নিয়েছিল, এই কথা বলে। অকপটে চেপে গেছেন ত্রিশ লাখ শহীদের একজনও ভারতীয় ছিল না। চেপে গেছেন বাংলাদেশের আপামর মানুষ যুদ্ধের পক্ষে এবং অংশ নিয়েছিল। ২ লাখ মা-বোন ধর্ষিতা হয়েছিল তারা সবাই বাংলাদেশের।
তিনি আরও বলেন, মাওলানা ইউসুফ এবং আব্বাস আলী খান ভুল করতে পারেন।(হয়তো বা তারা পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী ছিলেন বলে তিনি এই মন্তব্য করতে পারেন) কিন্তু আলবদর বাহিনীর প্রধান মতিউর রহমান নিজামী কিংবা রাজাকার বাহিনীর শ্রষ্টা ইউসুফ, শান্তি কমিটির গোলাম আযমের প্রসঙ্গটি বাদ দিয়েছেন। একজন জামায়াতের অনুসারীর এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়- জামায়াতের আমিরের এই ক্ষমা চাওয়া আসলে একাত্তরের জামায়াতকে অপরাধমুক্ত প্রমাণের প্রচেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়। এই আইনজীবী একাত্তরে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ভারতে এক সপ্তাহও টিকতে পারেননি বলে মিথ্যাচার করে মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার চেষ্টাও করেছেন। বলা যায়, তারা একাত্তরে কোনো অপরাধ করেননি শুধু এমন ডাহা মিথ্যাচারই করছেন না, তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন।
প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই ভুল-ভ্রান্তি থাকে,অপরাধেও যুক্ত থাকতে পারে এবং সেজন্য তাদের অভিযুক্তও করা হতে পারে। কিন্তু একাত্তর ও জামায়াতের কর্মকাণ্ড সেরকম নয়। এই অভিযোগটা ত্রিশ লাখ মানুষের জীবনের। দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জত হারানোর অভিযোগ। এটাকে বাসস্থান পরিবর্তনকালে যেমন ক্ষমা চাওয়া হয় তেমন ভাবার কোনো সুযোগ নেই। সবচেয়ে বড় জামায়াতের বিরুদ্ধে গোটা বাঙালি জাতির অভিযোগ একাত্তরে গণহত্যা চালানোর। তাকে ১৯৪৭-২০২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে কেউ বলেনি। তাই ক্ষমা চাওয়ার সময় ১৯৭১ সালের গণহত্যা,ধর্ষণ ও লাখ লাখ বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার দায় স্বীকার করে সুস্পষ্টভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। যেহেতু অভিযোগ সুস্পষ্ট তাদের জবাবও আসতে হবে সুস্পষ্ট।কেউ কেউ বলছেন, জামায়াতে ইসলামীর অফিসিয়েল প্যাডে এই ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি আসেনি। এটা আমার কাছে হালকা যুক্তি বলে মনে হয়। এত বড় একটি ইস্যুতে জামায়াতের আমির বক্তব্য দেওয়ার আগে তার দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেই দিয়েছেন। সুতরাং তারা দলগতভাবেই একাত্তরকে এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই ভাষায় তারা অফিসিয়েল প্যাড-এ এখন বক্তব্য দিতেই পারে। তাতেও হেরফের হওয়ার সুযোগ নেই।
আলোচনার সূত্র ধরে তারা যদি সুস্পষ্টভাবে একাত্তরে গণহত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের দায় স্বীকার করে অফিসিয়ালিও যদি ক্ষমা চায়, প্রশ্ন আসবে, ক্ষমা করবে কে? দেশে নির্বাচিত সরকার থাকলে তখন সংসদে সেটা আলোচনা হতে পারে। সেটা যদি রাষ্ট্রের প্রধান কিংবা সরকারের প্রধান বরাবর হয়। তখন জনপ্রতিনিধিরা জনগণের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এই মুহূর্তে সেটা সম্ভব নয়।
এর আগেও তারা জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করতে পারে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে প্রতিটি দলই তাদের ইশতেহার ঘোষণা করবে, যা জনগণের কাছে তাদের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা পরিকল্পনা হিসেবে গণ্য হয়। তাই জামায়াতে ইসলামীকে তাদের নির্বাচনি ইশতেহাররের সুস্পষ্টভাবে একাত্তরে তারা খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি অপরাধ করেছে এজন্য তারা জাতির কাছে ক্ষমা চাইছে এমন ভাষায় উল্লেখ করতে হবে।নির্বাচনি প্রচার অনুষ্ঠানে প্রতিটি জায়গায় তাদের ইশতেহারে উল্লেখিত এই অপরাধের কথা প্রচার করতে হবে এবং জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। যদি জনগণ তাদের ইশতেহার সমর্থন করে তখন বোঝা যাবে জনগণ তাদের অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছে। প্রয়োজনে পরবর্তী সংসদে তাদের ইশতেহারটি যে জনসমর্থন পেয়েছে তা উল্লেখ করে ক্ষমা প্রস্তাব পাস হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে আইনি বিধানের ঘাটতি থাকলে তা পূরণের ব্যবস্থাও পরবর্তী সরকারকে করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর ভ্রুণ ভারতে এবং জন্ম পাকিস্তানে। ৫০ এর দশকে পূর্ববঙ্গে তসরিফ আনা। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে অক্সিলারি ফোর্স হিসেবে তাদের আত্মসমর্পণের পর সঙ্গত কারণেই তারা নিষিদ্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশে। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে খুনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির উত্থানের পর তারা ধাপে ধাপে এই দেশে উল্লেখযোগ্য একটা অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। যার বিপরীত অবস্থা পাকিস্তান ও ভারতে। ভারতে দল হিসেবে তারা নিশ্চিহ্ন। পাকিস্তানে একটি আসনেও জিততে পারেনি। সেই তুলনায় বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী অকল্পনীয়ভাবে সফল রাজনৈতিক শক্তি। এই সুযোগটি তারা কাজে লাগাতে পারে, নিজেরা টিকে থাকার জন্য। না হয় আজকের এই ক্ষমা চাওয়াকে তারা দুদিন পরই বদলে দেবে।কারণ দলটি আজ যা বলে কালই তার বিপরীতে চলে যাওয়ার অসংখ্য প্রমাণ রেখেছে। নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া, আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন কিংবা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতি করা এবং সঙ্গীদের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক তৈরি করা তাদের জন্য কোনো বিষয়ই নয়। সর্বশেষ জুলাই সনদে স্বাক্ষর না করার ঘোষণা দিয়ে সঙ্গী এনসিপিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে জুলাই সনদে সাইন করার পর তাদের যে কোনো ওয়াদা কিংবা কমিটমেন্টকে বিশ্বাসযোগ্য ভাবতে যে কারও কষ্ট হতেই পারে।
উপসংহারে স্পষ্টত বলতে হয়, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান যে ক্ষমা চাওয়ার কথা বলেছেন, সেটা একাত্তরে জামায়াতের অপরাধ কর্মে যুক্ত থাকার বিষয়ে নয়। সেই অর্থে এই ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি কথার কথা এমনই বলা যায়। প্রকারান্তরে বলতে হয়, একাত্তরের ভূমিকার জন্য তারা অনুতপ্ত নয়, তারা ক্ষমা চাইতেও রাজি নয়।সঙ্গত কারণেই এ বিষয়ে জনগণই সিদ্ধান্ত নিতে পারে, ত্রিশ লাখ মানুষের প্রাণহানি, হাজার হাজার বাড়িঘর, দোকানপাট ছাই হয়ে যাওয়া কিংবা ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতহানি এমনি এমনি হয়ে গিয়েছিল? আর একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর অক্সিলারি ফোর্স হিসেবে আত্মসমর্পণকারী রাজাকার বাহিনী ও আলবদর বাহিনী কাদের দ্বারা কাদের নিয়ে গঠিত হয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। এর জবাব পেতে জামায়াতের আমিরের এই ক্ষমা চাওয়ার বয়ান পাশাপাশি রাখলে নিশ্চয়ই তারা বুঝতে পারবে জামায়াত একাত্তরে ধ্বংসযজ্ঞ, খুন, জ্বালা-পোড়াওকে এখনো অপরাধ মনে করে না।
লেখক-সাংবাদিক,শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।

