বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে না। কর্মসংস্থান বাড়ছে না। আবার চালু কারখানাও একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।ফলে দেশে দ্রুত বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। বেকারত্বের সেই অভিশাপ ঘোচাতে কিংবা একটু উন্নত জীবন পেতে তাঁদের অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমাতে উদগ্রীব থাকেন। আর সেই সুযোগটাই নেয় মানবপাচারকারীরা। ভালো চাকরি, লোভনীয় বেতন আর উন্নত জীবনের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিদেশ গমনেচ্ছুদের ফাঁদে ফেলা হয়।একদিকে বিদেশে পাঠানোর নামে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়, অন্যদিকে বিদেশে নিয়ে নির্জন স্থানে আটকে রেখে নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের কাছ থেকে আবারও মুক্তিপণ হিসেবে অর্থ আদায় করা হয়। এর মধ্যে অনেকের মৃত্যুও হয়।দেশে যেমন কর্মসংস্থানের অভাব প্রকট হচ্ছে, তেমনি বিদেশের শ্রমবাজারগুলোতেও কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমছে। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চারটি শ্রমবাজার হচ্ছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ওমান।এর মধ্যে সৌদি আরব ছাড়া বাকি তিনটি দেশে কর্মী পাঠানো সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে সৌদির শ্রমবাজারেও চলছে নানা জটিলতা। এর ফলে বিদেশে কর্মী পাঠানোর হার দিন দিন কমছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে বিদেশে বাংলাদেশি কর্মী গেছেন আট লাখ ১৩ হাজার ৬৪ জন, যা ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের তুলনায় ১৭.৮৫ শতাংশ কম।অভিবাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার, আইন লঙ্ঘন ও দক্ষ কর্মীর অভাবে কমছে বৈদেশিক কর্মসংস্থান।আবার বিভিন্ন বিধি-নিষেধ, ভিসা বন্ধসহ নানা কারণে গত বছর পর্যন্ত বন্ধ হওয়া ৯টি শ্রমবাজারের একটিও এ পর্যন্ত চালু করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে প্রতিনিয়তই কমছে বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার। এতে জনশক্তি রপ্তানি খাতে ধস নামার আশঙ্কা দেখছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।
বৈধ অভিবাসন ক্রমাগত কমতে থাকার কারণেও মানবপাচারের ঘটনা বাড়ছে। বেকার তরুণরা যেকোনো উপায়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে ব্যস্ত থাকেন। কালের কণ্ঠে গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, শুধু বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার কমপক্ষে ৫৬ জন লিবিয়ায় দুর্গম স্থানে বন্দি থেকে দুঃসহ জীবন যাপন করছেন। গত শনিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি ও আশপাশের এলাকায় অবৈধভাবে অবস্থানরত ৩০৯ বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। লিবিয়ায় থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এবং লিবিয়া সরকার ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার সহযোগিতায় তাঁরা দেশে ফিরে আসেন। ফিরে আসা বেশির ভাগ বাংলাদেশিই মানবপাচারকারীদের প্ররোচনায় ও সহযোগিতায় সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপ গমনের উদ্দেশ্যে লিবিয়ায় যান। তাঁদের অনেকে লিবিয়ায় বিভিন্ন সময় অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
দেশে বেকারের সংখ্যা যত বাড়বে, অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা তত বাড়বে। এটি আবার বৈধ অভিবাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাই দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈধভাবে বিদেশের শ্রমবাজারগুলোতে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ বাড়াতে হবে। পাচারকারী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালাতে হবে। পাচারসংক্রান্ত মামলাগুলোর বিচার দ্রুততর করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ পথে বিদেশে না যাওয়ার জন্য মানুষকে সচেতন করতে হবে।

