১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি

দেশে প্রথমবারের মতো মেট্রো রেল চালু হয় রাজধানীর উত্তরা-মতিঝিল পথে। এটি এই পথে যানজট নিরসনে বড় ভূমিকা রেখেছে। দ্রুত ও আরামদায়কভাবে চলাচল করতে পারায় জনসন্তুষ্টিও অনেক বেশি। কিন্তু অত্যাধুনিক এই গণপরিবহনই এখন বড় শঙ্কার কারণ হয়ে উঠছে।নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে ঘটছে দুর্ঘটনা। গত রবিবার দুপুরে ফার্মগেট এলাকায় মেট্রো রেলের একটি পিলারের বিয়ারিং প্যাড খুলে নিচে পড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান আবুল কালাম (৩৫) নামের এক পথচারী। তাঁর বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মুক্তারেরচর ইউনিয়নের ঈশ্বরকাঠি গ্রামে। তিনি ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন।
জানা যায়, গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বরও একই এলাকায় আরেকটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। তা সত্ত্বেও রক্ষণাবেক্ষণে যে মনোযোগ দেওয়া হয়নি, তার প্রমাণ রবিবারের দুর্ঘটনা এবং একজনের প্রাণহানি। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, আধুনিক এই পরিবহনব্যবস্থা পরিচালনায় পর্যাপ্ত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি এটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। প্রতিদিন গড়ে চার লাখ যাত্রী নির্বিঘ্নে পরিবহনের জন্য এই রেলপথের ওপর ভরসা করছে যাত্রীরা।কিন্তু রেলপথসহ পুরো ব্যবস্থায় রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার চিত্রই প্রকাশ পায়। তাতে ঝুঁকিতে আছে ট্রেনযাত্রী ও পথচারীরা।ডিএমটিসিএলের অভ্যন্তরীণ সূত্র ও বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা থাকলেও তার বাস্তবায়ন শতভাগ পূর্ণ হচ্ছে না। প্রকৃত অবস্থা আড়ালে রেখে কাগজে-কলমে সাফল্যের চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। বাস্তবে থেকে যাচ্ছে অনেক ঘাটতি।ফলে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এতে সিগন্যালিং সিস্টেম, দরজা বা টেলিকম ইউনিটে ত্রুটি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। যাত্রীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তথ্য অধিকার আইনে মেইনটেন্যান্সের তথ্য জানতে চাইলেও ডিএমটিসিএল কালক্ষেপণ করছে। অন্যদিকে ডিএমটিসিএলের একাধিক সূত্র জানায়, দক্ষ জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে পরিকল্পিতভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ১১২ জন কর্মীকে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই সরাসরি স্টেশনে পাঠানো হয়েছে। পরে ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।মেট্রো রেল পরিচালনাকারী সিপি-৭ (অটোমেটিক ফেয়ার কালেকশন) সিস্টেম সম্পর্কে বেশির ভাগ কর্মীই অজ্ঞ। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও পরামর্শক এনকেডিএম রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণ দিতে চাইলেও তা বাধাগ্রস্ত করা হয়। প্রয়োজনীয় দক্ষতা ছাড়া উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি পরিচালনা করায় কর্মীদের ভুল ব্যবহারে যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। জানা গেছে, রক্ষণাবেক্ষণ চেকলিস্টে অনেক কাজ সম্পন্ন হিসেবে টিক চিহ্ন দেওয়া থাকলেও বাস্তবে সেসব কাজ করা হয় না। ফলে প্রায়ই দেখা যায়, টিকিট কাটার এক বা একাধিক মেশিন অকেজো হয়ে থাকে। প্রবেশপথগুলোরও কিছু কিছু প্রায়ই বন্ধ হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এম সামসুল হক বলেন, ‘মেট্রো রেল একটি ইন্টিগ্রেটেড ইলেকট্রনিক সিস্টেম। এখানে ছোট একটি ত্রুটিও পুরো নেটওয়ার্ক থামিয়ে দিতে পারে। এ ছাড়া নিয়মিত ট্রেনিং, টুলস ও রিপোর্ট অডিট না হলে দুর্ঘটনা অনিবার্য।বিপুল ব্যয়ে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ এই রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় কোনো ধরনের অবহেলা, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা কাম্য নয়। উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে আরো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করি।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়