দেশে এক চরম অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। অর্থনীতি ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মানুষের চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে যেখানে জাতীয় ঐক্য সবচেয়ে জরুরি, সেখানে পরিকল্পিতভাবে বিভেদ-বিভাজন সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ উঠছে।
অভিযোগের তীর খোদ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রতি। বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদের ভাষায়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার বদলে জাতীয় অনৈক্য প্রতিষ্ঠার একটা প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে। রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিষয়ে অভিজ্ঞ অনেক বিশেষজ্ঞেরও প্রশ্ন, দেশের এমন সংকটময় মুহূর্তে জাতিকে বিভক্ত করার এমন অপচেষ্টা কেন? এর পেছনে কি অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে?
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার পর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের সুপারিশসহ চূড়ান্ত যে সনদ গত ২৮ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে হস্তান্তর করেছে ঐকমত্য কমিশন, তাতে অনালোচিত ও অমীমাংসিত অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সনদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (আপত্তি ও ভিন্নমত) বাদ দিয়ে গণভোটের প্রস্তাবে রীতিমতো ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি মনে করছে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রেফারি হয়ে গোল দেওয়ার এক মহাবিতর্কিত নজির স্থাপন করেছে। মনে হচ্ছে, ঐকমত্য কমিশন, সরকার এবং দু-তিনটি রাজনৈতিক দল একই পক্ষ।
বিএনপির এই প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে একমত তাদের সমমনা দলগুলোসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ঐকমত্য কমিশনের চূড়ান্ত সনদকেই সমর্থন করছে। এই অবস্থায় অনেকের ধারণা, প্রস্তাবিত জুলাই সনদ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরি হবে এবং দেশে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মনে করেন, ঐকমত্য কমিশন জনগণের সঙ্গে, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রতারণা করেছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, এই কমিশনের সহসভাপতি নিজেই বলেছিলেন যে সংবিধান নতুন করে লিখতে হবে।বিএনপিকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে তারা এই কাজটি করেছে। বিএনপির উচিত প্রতারণার জন্য কমিশনের শাস্তি দাবি করা।
কিছু গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক। তাঁর মতে, সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাবের বেশির ভাগই বিদ্যমান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি কার্যকর করতে হলে বর্তমান সংবিধান বাতিল ঘোষণা করতে হবে। বর্তমান সংবিধানে আছে এক কক্ষের জাতীয় সংসদ। আর জুলাই সনদে বলা হচ্ছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ। এখন কোনটি বলবৎ হবে? জুলাই সনদের প্রস্তাব বলবৎ হলে বর্তমান সংবিধান বাতিল করতে হবে। তিনি বলেন, গণভোট হয় একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের ওপর। ব্রিটেনে সম্প্রতি গণভোট হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকব কি থাকব না—এই প্রশ্নে। সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮টি বিষয়ে গণভোটের প্রশ্নটিই অবান্তর।
আমরা চাই, দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক। সংঘাত, হানাহানি বা কোনো অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি না হোক। প্রয়োজনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসে পুনরায় জুলাই জাতীয় সনদ ও অমীমাংসিত বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা হোক।

