১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

সন্ত্রাস লাগামছাড়া

চট্টগ্রাম ও খুলনা—দুই প্রধান মহানগর এখন আতঙ্কের সমার্থক। সাম্প্রতিক সময়ের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, গুলিবর্ষণ ও সন্ত্রাসী তৎপরতায় এ দুই নগর যেন অপরাধের নগরে পরিণত হয়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ দুই শহরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। তথাকথিত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ও তাদের অনুসারীদের বেপরোয়া কার্যকলাপে জনজীবন রীতিমতো আতঙ্কিত।
চট্টগ্রামে ছয় শীর্ষ সন্ত্রাসীর প্রকাশ্য বা গোপন নির্দেশে বায়েজিদ বোস্তামী, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, রাউজানসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে খুন, চাঁদাবাজি ও গোলাগুলির মতো অপরাধ চলছে লাগামহীনভাবে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, ‘বড় সাজ্জাদ’ নামের এক সন্ত্রাসী বিদেশে (ভারতে) এবং ‘ছোট সাজ্জাদ’ কারাগারে বসে অপরাধচক্র নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ মাসে শুধু রাজনৈতিক বিরোধেই ১৫ জন খুন হয়েছেন। সম্প্রতি বিএনপি প্রার্থীর ওপর গুলি ও সরোয়ার হোসেন বাবলা খুন হওয়ার ঘটনায় রায়হান আলম ও মোবারক হোসেন ইমনের মতো চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের নাম উঠে এসেছে।পুলিশ কমিশনারের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, সন্ত্রাসীরা ঘটনা ঘটিয়ে পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করছে, যা তাদের গ্রেপ্তার করা কঠিন করে তুলছে।অন্যদিকে খুলনায় গত ১৪ মাসে ৪০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। বেশির ভাগেরই মূল আসামি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশ বলছে, খুনিরা ‘অজ্ঞাত স্থানে’ আত্মগোপন করে আছে।একই অজুহাত। দৌলতপুর, আড়ংঘাটা বা মহেশ্বরপাশা—যেখানেই হত্যাকাণ্ড ঘটছে, কয়েক দিনের মধ্যেই তদন্ত থমকে যাচ্ছে। ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা যখন এমনভাবে ভেঙে পড়ে যে একাধিক শহরে সন্ত্রাসীরা প্রশাসনকে ছাপিয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তখন প্রশ্ন ওঠে—আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী আসলে কাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে? পাহাড়ে পালিয়ে যাওয়া বা বিদেশে বসে অপরাধ পরিচালনা করার ক্ষমতা যদি একজন সন্ত্রাসীর থাকে, তবে সেটি কেবল রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতারই প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।চট্টগ্রাম ও খুলনার হত্যাকাণ্ডগুলো রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির ফসল।হত্যাকারীরা ধরা না পড়লে শুধু আইন নয়, নাগরিক বিশ্বাসও ধ্বংস হয়। পুলিশি ব্যর্থতার দায় সরকার এড়িয়ে যেতে পারে না। এখনই প্রয়োজন সমন্বিত অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত এবং স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
দেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ নগর অপরাধচক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে—এই অবস্থায় নীরবতা মানে রাষ্ট্রের আত্মসমর্পণ। সন্ত্রাসীদের বিচারের মুখোমুখি না করা গেলে চট্টগ্রাম ও খুলনা কেবল ভয় আর রক্তের শহর হিসেবেই চিহ্নিত হবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়