১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

দুর্নীতির বেড়াজালে কাবিখা-কাবিটা

মাদারীপুর সদর উপজেলার গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার প্রকল্পের ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। বিষয়টি রাষ্ট্রের তৃণমূল পর্যায়ে দুর্নীতির এক কদর্য প্রতিচ্ছবি। কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) এবং কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচিসহ টিআর (টেস্ট রিলিফ) প্রকল্পের আওতায় প্রায় সোয়া সাত কোটি টাকার বরাদ্দ কিভাবে জনগণের কল্যাণে ব্যবহার না হয়ে লুটেরাদের পকেটে গেছে, সেই বেদনাবিধুর কাহিনি এখন স্পষ্ট। রাস্তার পুনর্নির্মাণ, কালভার্ট, মসজিদ-মন্দির সংস্কারের মতো জরুরি প্রকল্পে ‘বেশুমার দুর্নীতি’ হয়েছে।সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, সরকারি নথিতে প্রকল্প দেখানো হলেও সরেজমিনে অনেক ক্ষেত্রেই কাজের অস্তিত্ব মেলেনি। যেখানে কাজ হয়েছে, সেখানেও তা দায়সারা। এর নির্মম পরিণতি ভোগ করছে গ্রামের অসহায় মানুষ। রাস্তা না হওয়ায় অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালের বদলে লাশবাহী খাটিয়ায় করে নিয়ে যাওয়ার মর্মান্তিক দৃশ্য বা প্রসূতিকে সময়মতো হাসপাতালে নিতে না পারায় বাচ্চার মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো আমাদের গ্রামীণ উন্নয়নের দাবির অন্তঃসারশূন্যতার প্রমাণ।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে ১১ জন ইউপি চেয়ারম্যানের পলাতক থাকা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে একজন ইউপি সচিবের স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের স্বজনপ্রীতিমূলক অংশগ্রহণ একটি পরিকল্পিত তছরুপের ইঙ্গিত দেয়। এমনকি ‘পারিবারিক কবর’কে ‘গণকবর’ দেখিয়ে চাল বরাদ্দ হাতিয়ে নেওয়ার মতো জঘন্য কাজও বাদ যায়নি।
‘ভূতুড়ে রাস্তা’র নামে বরাদ্দ আসা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দায় এড়ানোর মানসিকতা প্রমাণ করে, প্রশাসন এই দুর্নীতির বলয়ে জড়িত আছে। ইউএনওর বিরুদ্ধে ‘১০ পার্সেন্ট’ ঘুষ নেওয়ার মতো অভিযোগও পাওয়া গেছে; যদিও সংশ্লিষ্ট ইউএনও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবু এমন বক্তব্য প্রশাসনের ভেতরের দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।
এ ঘটনায় জেলা প্রশাসন তদন্ত শুরু করেছে, এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে শুধু তদন্তে থেমে গেলে চলবে না। এই দুর্নীতিতে যাঁরা জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রকল্পের তথ্য, বরাদ্দ ও কাজের অগ্রগতি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।
গ্রামীণ উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনসেবার পরিধি বাড়ানো, ক্ষমতাসীনদের পকেট ভরানো নয়। কাবিখা-কাবিটা কর্মসূচি যদি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়, তবে এটি শুধু উন্নয়ন থামাবে না, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাও ভেঙে দেবে। সরকারকে তাই এই দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে এখনই, নইলে জনকল্যাণের মুখোশে চলবে লুটপাটের নির্লজ্জ মহোৎসব।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়