১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ২৯শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

শান্তির ফুল

মোহিত কামাল
উত্তরের বাতাস শুরু হয়ে গেছে। সূর্যও উঁকি দিচ্ছে আকাশে। হালকা কুয়াশামাখা ভোর ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে; এখনো পুরোপুরি দূর হয়ে যায়নি। এমন সুন্দর ভোরেও ‘সমস্যা’ ঘাড়ত্যাড়া করে দাঁড়িয়ে আছে অটল বৃক্ষের মতো। তার চোখের ভেতর থেকে ভোরের নরম রোদ নয় বরং মধ্য দুপুরের কড়া রোদ বেরোচ্ছে।
‘সমাধান’ বলল, ‘এত কঠিন কেন তোমার অবস্থান? এত নাক উঁচু কেন? নত হও। চোখের আগুন কমাও। আমার পথে এগিয়ে এসো। সহজ সিদ্ধান্ত দাও।’
‘তোমার কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিতে হলে কি সেটা আমার সিদ্ধান্ত হবে? সেটা কি আমার বুদ্ধি আর চিন্তাসূত্রে ঘটবে? সেখানে কি আমার কোনো সৃজনশীলতা থাকবে? কোনো মূল্য থাকবে? আমার মতো ভাবতে দাও আমাকে। ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে দাও। চাপ দিচ্ছ কেন? চাপ দিয়ে তো সংকট আরো বাড়িয়ে তুলছো?’
কথাবার্তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা দ্বন্দ্বের কেন্দ্র থেকে আকস্মিক বুদবুদ উঠতে লাগল, তরঙ্গরূপে তা ছড়িয়ে যেতে লাগল; ছোট ছোট ওয়েভলেনথ ভেদ করে সমাধানের মস্তিষ্কের জৈবরাসায়নিক কারখানায় শব্দধ্বনীর প্রতিধ্বনি ঘটাতে লাগল। ভোরের রোদও একটু একটু বাড়তে লাগল। এখন কুয়াশা মিলিয়ে গেছে বলা যেতে পারে। চড়ুই পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যাচ্ছে। বাড়ির দেয়ালঘেরা কাঁটাতারের মধ্যে বসে আছে এক কাক। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সমস্যার দিকে। সেদিকে খেয়াল নাই তার।
‘কে আবার উড়ে এলো আমার মাথায়?’ প্রশ্ন করল সে।
“সমস্যা জটিল হলে সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, ভেবেচিন্তে সমাধানের পথে এগোতে হয়। তোমাদের প্রবাদবাক্য পড়োনি, ‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না?'”‘তা তো জানি। তবে কতদিন ভাবতে হবে, ভাবনার একটা সীমা থাকতে হবে তো! দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে সংকট‌ ঘনীভূত হতে পারে, সেই সম্ভাবনা কি উড়িয়ে দিতে পারো?”তুমি ঠিক বলেছ, সমাধান। আমিও চাই সমস্যা বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান দিক, সবার জন্য যা ভালো তার সিদ্ধান্তে পৌঁছুক। তবে কারো চাপে নয়।
নিজের প্রজ্ঞার মধ্য দিয়ে।’
‘কিন্তু তুমি কে? নিজের পরিচয় দিচ্ছ না কেন ? তুমিও তো আমার ওপর চাপ তৈরি করছ!”তুমি সেটাকে চাপ হিসেবে নিলে চাপ। উপদেশ হিসেবে নিলে উপদেশ, ভালো পরামর্শ হিসেবে নিলে ভালো আর প্যাঁচ ধরতে চাইলে এটা খারাপ পরামর্শ। সেটাও তোমার ভাবনা, সেটাও তোমার স্বাধীনতা। মনে রেখো, যে সিদ্ধান্তটাই নেওয়া হোক, একপক্ষ খুশি হয়, অপরপক্ষ অখুশি হয়, সংকট তখনো জটিল হয়।’
‘নিজের পরিচয় দাও। তা না-হলে দূর হও আমার মাথা থেকে। তোমার আর কোনো কথা শুনতে চাই না।’
সমাধানের হুমকিতে শব্দধ্বনির প্রতিধ্বনি কোমল হয়ে গেল। বিনয়ের সঙ্গে বলল,’আমার নাম রিচার্ড জে রবার্টস। লোকে আমাকে স্যার রবার্টস বলেও ডাকে। আমি একজন ব্রিটিশ, প্রাণরসায়নবিদ। আমার জন্ম ১৯৪৩ সালে।’
সমাধানের মস্তিত্বের সার্কিটে ঘটে গেল বিপ্লব। প্রাণ রসায়নের অনুপরমানু আর কোয়ান্টাম টানেল অতিক্রম করে সে দেখে ফেলল রবার্টসকে। তারপর চিৎকার দিয়ে বলল, ‘তোমাকে চিনে ফেলেছি ! তুমি তো নোবেলজয়ী সেই ব্রিটিশ, মহান প্রাণরসায়নবিদ!’
‘তোমাকে ধন্যবাদ। তবে মহান নয়, আমি সাধারণ মানুষ, তোমার মতোই।’ বিনয়ের স্বরে আবারও বললেন রবার্টস।’হ্যাঁ, আমার মতোই মানুষ, তবে প্রজ্ঞাবান তুমি। আমি চেষ্টা করি প্রজ্ঞাবান মানুষের কথার মূল্য দিতে আর তাদের অভিজ্ঞতাকে নিজের অভিজ্ঞতায় জারিত করতে ।’
দুজনের মাঝখানে আবার উদিত হলো ‘সমস্যা’। এবার দেখা গেল তার ঘাড় বেশ নরম, চোখের আগুনও কমে এসেছে। প্রতিজ্ঞা করল দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে, দ্রুত সমস্যার সমাধান দিবে। কেউ গ্রহণ বা বর্জন করুক, যার যার দৃষ্টিভঙ্গি সেটা। তবে নিজের উদ্দেশ্য হবে মনবজাতির কল্যাণ আর শান্তি।
সমস্যা ও সমাধানের মনের নতুন অবস্থা বুঝতে পেরে স্যার রবার্টস এবার দুজনের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘ধোঁয়াশা আর কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে আছে শান্তির ফুল। সেটা খুঁজে নিতে হলে আগে অর্জন করতে হবে নিজের মনের শান্তি, আঁধারেও খুঁজে নিতে হবে রোদ।’
রবার্টসের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা এবং সমাধান উভয়ে তাকাল পাশের বাড়ির দেয়ালঘিরে সাজিয়ে রাখা লাল টবের দিকে। সেখানে ফুটে আছে অসংখ্য সাদা গোলাপ। শান্তির ফুল।
লেখক: বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত। মনোচিকিৎসক।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়