১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

পর পর ভূমিকম্পে জনমনে উদ্বেগ

গত শুক্রবার সকালের ভূমিকম্পে মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক তৈরি হয়, তা এখনো কাটছে না। কারণ এই ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি ছিল অনেক বেশি তীব্র। সেই আতঙ্ক আরো প্রবল হয়েছে পরবর্তী সাড়ে ৩১ ঘণ্টায় আরো চারটি ভূকম্পনের কারণে। অবশ্য সেগুলোর তীব্রতা শুক্রবারের ভূমিকম্পের মতো এতটা প্রবল ছিল না।
রিখটার স্কেলে শুক্রবার সকালের ভূমিকম্প ছিল ৫.৭ মাত্রার। পরবর্তী চারটি ভূকম্পনের তীব্রতা ছিল ৩.৩ থেকে ৪.৩-এর মধ্যে। তা সত্ত্বেও পর পর এমন ভূকম্পনে মানুষের উদ্বেগ আরো বেড়েছে।
ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা আরো কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়া যায়, মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু ভূমিকম্পে সেই সুযোগ নেই।
কারণ এখন পর্যন্ত ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া প্রায় অসম্ভব। কিছু লক্ষণ থেকে কিছুটা অনুমান করা হয় মাত্র। যেমন—কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলছেন, বর্তমান ভূমিকম্প ভবিষ্যতের বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বলক্ষণ হতে পারে। তা-ও নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।তার পরও আতঙ্কিত হয়ে কোনো লাভ নেই, বরং তাতে ক্ষতিই বেশি হয়। সাধারণত দেখা যায়, ভূমিকম্পে যত মানুষ হতাহত হয়, তার বেশির ভাগই হয় বহুতল ভবন থেকে দ্রুত নামতে গিয়ে। শুক্রবারের ভূমিকম্পেও ছয় শতাধিক আহতের বেশির ভাগই এভাবে আহত হয়েছে।ভূমিকম্প থেকে বাঁচতে হলে ভূমিকম্প সহনশীল করে ভবন নির্মাণ করতে হবে। নির্মিত অনেক ভবন, যেগুলো ভূমিকম্প সহনশীল নয়, সেগুলোরও একটি বড় অংশ বিশেষ পদ্ধতিতে ভূমিকম্প সহনশীলভাবে তৈরি করা যায়।অধিক ঝুঁকিপ্রবণ ভবন চিহ্নিত করে সেগুলো ভেঙে নতুনভাবে তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে বিশেষভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে সেসব ভবন মালিককে বিনা সুদে বা স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে এখন থেকে আর একটি ভবনও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা উপেক্ষা করে তৈরি করা যাবে না। পৃথিবীর অনেক দেশেই ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য দুর্যোগে কিভাবে নিজেকে বাঁচাতে হবে, সেসব বিষয়ে মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আমাদের অনুরূপ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সচেতন করতে হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আমাদের সক্ষমতা অত্যন্ত কম। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ‘আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্ট : রাজউক অংশ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে ঢাকায় সাড়ে আট লাখের বেশি ভবন ভেঙে পড়তে পারে, যা ঢাকায় থাকা মোট ভবনের প্রায় ৪০ শতাংশ। এতে সরাসরি মারা যেতে পারে অন্তত দুই লাখ মানুষ। আহত হতে পারে তিন লাখের বেশি মানুষ। তেমন ভূমিকম্পে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা তো দূরের কথা, এক লাখ ভবন ভেঙে পড়লেও আমাদের পক্ষে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। বর্তমান সক্ষমতায় শত শত বছর লেগে যাবে। ঢাকাকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে।বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের প্রধান কাজ হবে ভবনগুলো ভূমিকম্প প্রতিরোধী করে গড়ে তোলা। বিল্ডিং কোড বা ইমারত নির্মাণ বিধিমালার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন। এ ক্ষেত্রে রাজউকের তদারকির দুর্বলতা দূর করতে হবে। অন্যান্য সংস্থাকেও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। ঝুঁকিমুক্তভাবে তৈরি হয়নি এমন ভবনগুলোর মজবুতীকরণ বা ভূমিকম্প প্রতিরোধী করার উদ্যোগ নিতে হবে। যেসব ভবনের মজবুতীকরণ সম্ভব নয়, সেগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে এবং ভেঙে নতুন করে গড়তে হবে। এসব ক্ষেত্রে দুর্বলতা প্রদর্শনের কোনো সুযোগ নেই।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়