মোহিত কামাল
কী সেই অদৃশ্য ট্রমা?
একটু মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করলে আতঙ্কিত বা অদৃশ্য উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আক্রান্ত মানুষটিকে চেনা যায়, শনাক্ত করাও যায়। প্রাথমিক আঘাতে মানুষ অনুভূতিশূন্য বা হতবাক, হতবিহ্বল, নির্বাক হয়ে যেতে পারে। সংবিৎ ফিরে পেলে অনিশ্চয়তায় ডুবে যেতে পারে। এই অবস্থাকে মনস্তত্ত্বের ভাষায় বলে, ‘একিউট স্ট্রেস ডিসঅর্ডার অথবা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বা রিঅ্যাকশন’।
কম্পন থেমে গেলেও শারীরিক প্রতিক্রিয়া যেমন মাথাঘোরা, দুলে ওঠা বা দুলুনির অনুভূতি আতঙ্কিত করে তুলতে পারে। এ ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যাকে বলে ‘পোস্ট-আর্থকোয়েক ডিজিনেস সিনড্রোম (PEDS)’।
‘প্যানিক অ্যাটাক’ বা অ্যাংজাইটি অ্যাটাক ঘটতে পারে। হঠাৎ সৃষ্ট ভয়, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, শ্বাসরোধ হয়ে আসা, হার্টবিট দ্রুত থেকে দ্রুততর হওয়া–এসব উপসর্গের বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে তার প্রকাশ দেখা যেতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত আতঙ্কও জেগে উঠতে পারে- ‘এখনই মরে যাচ্ছি’-এমন এক ভয়ংকর আতঙ্কিত অবস্থাও ভুক্তভোগীকে আকস্মিক বিভ্রান্ত করে ফেলতে পারে। তবে সাধারণত ১০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে উপর্যুক্ত উপসর্গের জোয়ার থেমে যায়। আবারও ওই ধরনের আতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে ভীত থাকতে পারে রোগী। অর্থাৎ ‘আবার প্রবল কম্পন হতে পারে’- এমন চিন্তা থেকে মানুষ নিজেকে অনিরাপদ ভাবতে পারে, গভীর অসহায়ত্ব জেগে উঠতে পারে আক্রান্ত অবস্থায়। টিভিতে বারবার সংবাদ দেখা কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব, অতিরঞ্জন কিংবা ভুল ব্যাখ্যা আতঙ্ক চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
অনিদ্রা বা দুঃস্বপ্নে জেগে ওঠা খুব সাধারণ উপসর্গ।
প্রাথমিক অবস্থায় ট্রমা সঠিকভাবে মোকাবিলা করা না-গেলে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দীর্ঘ মেয়াদী যাতনার কারণ হয়ে উঠতে পারে। ২৮ দিনের মধ্যে যদি সমস্যার সমাধান না হয় তবে ‘পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD)’ তৈরি হয়ে যেতে পারে। অনেকেই ভয় বা দুশ্চিন্তার কারণে দৈনন্দিন কাজ থেকে পিছিয়ে যেতে পারে অথবা কাজ করা থেকে বিরত থাকতে পারে। সামাজিক মিথস্ক্রিয়া কমে যেতে পারে, পারিবারিক বা কর্মজীবন তখন প্রভাবিত হতে থাকে। এই অবস্থায় মানসিক চাপ আরও বাড়ে।
ভূমিকম্পের পর যারা মানসিকভাবে ট্রমা অনুভব করছেন, তারা কী করবেন?
নিরাপদ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার দিকে নজর দিতে হবে প্রথমেই।
ভূমিকম্পের পর নিরাপদ জায়গা কোথায়? ঢাকা শহরে উঁচু উঁচু বিল্ডিংগুলো থেকে বেরিয়ে রাস্তায় গেলে কি আমরা নিরাপদ? দু’পাশের সরু রাস্তা আর উঁচু ভবন দেখতে মাথা তুলে উপরের দিকে তাকালে আতঙ্ক বেড়ে যাবে তখন, এবার তার প্রমাণ পেয়েছি। তাই ফুটপাতে না দাঁড়িয়ে খোলা কোনো স্পেস যদি পাওয়া যায়, সেখানে আশ্রয় নিতে হবে। তবে ভূমিকম্পের সময় পরিবারের সদস্যরা কে কোথায় থাকবে তার হদিস থাকে না। এবারের ভূমিকম্প আমাদের সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছে। মানুষ বাসা থেকে রাস্তায় বেরিয়েছে ঠিকই কিন্তু সবাই দাঁড়িয়েছিল ফুটপাতে। পরিবারের সদস্যরা ছিল একেক জন একেক জায়গায়।
তাহলে করণীয় কী?
মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে। তবে এই অবস্থায় মানসিক যত্নেও হতে হবে সচেতন।
কীভাবে?
নিজের অনুভূতি শনাক্ত করতে হবে।
ভয়, দুশ্চিন্তা, অসহায়তা অনুভব করলেও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করতে হবে। অতিরিক্ত সংবাদ দেখা বা সামাজিক মিডিয়া স্ক্রল সীমিত করা জরুরি। বারবার ভয়সংক্রান্ত খবর দেখা মানসিক উদ্বেগকে বাড়িয়ে দেয়।
অনিয়ন্ত্রিত আতঙ্কও জেগে উঠতে পারে- ‘এখনই মরে যাচ্ছি’-এমন এক ভয়ংকর আতঙ্কিত অবস্থাও ভুক্তভোগীকে আকস্মিক বিভ্রান্ত করে ফেলতে পারে। তবে সাধারণত ১০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে উপর্যুক্ত উপসর্গের জোয়ার থেমে যায়। আবারও ওই ধরনের আতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে ভীত থাকতে পারে রোগী। অর্থাৎ ‘আবার প্রবল কম্পন হতে পারে’- এমন চিন্তা থেকে মানুষ নিজেকে অনিরাপদ ভাবতে পারে, গভীর অসহায়ত্ব জেগে উঠতে পারে আক্রান্ত অবস্থায়। টিভিতে বারবার সংবাদ দেখা কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব, অতিরঞ্জন কিংবা ভুল ব্যাখ্যা আতঙ্ক চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ (deep breathing) শিখে রাখাও জরুরি। ইয়োগা বা মেডিটেশন চর্চা করে নিজেকে ফিট রাখার জন্য প্রস্তুত থাকাও গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-প্রস্তুতি। এ ধরনের চর্চা বা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা থাকলে রিলাক্স হতে, কিংবা স্বাভাবিক থাকা সহজ হয়।
পিএফএ (Psychological First Aid)
ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড বা পিএফএ গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রথাগত থেরাপি নয়, বরং তাৎক্ষণিক মানসিক সহায়তা সেবা। নিরাপত্তা, স্থিতি ও প্রয়োজনীয় সাহায্য নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ কৌশল। এই মানবিক সহায়তা যার প্রয়োজন তার পাশে দাঁড়াতে হবে সুস্থদের। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সময় কিংবা শোকগ্রস্ত অবস্থায় কেউ একজন পাশে আছে দেখলে বা অনুভব করার সুযোগ পেলে, ভেতরে ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে যাওয়া মনটা সাপোর্ট পেয়ে যায় অতলান্ত থেকে। এটা বড় ক্ষতি থেকে রোগীকে রক্ষা করবে।
সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড দিতে গিয়ে কী করতে হবে?
আক্রান্ত ব্যক্তির কথা শুনতে হবে। তবে তার আগে তাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে সেবামূলক দায়িত্বটাকে তিনটি ‘এল’ দ্বারা চিহ্নিত করে প্রচার করা হয়: Look, Listen, Link.
দেখেশুনে বুঝে তারপর তার কথা শোনা গুরুত্বপূর্ণ। কিছু বলার জন্য চাপাচাপি করা যাবে না। তার প্রয়োজন এবং মূল চাহিদাটা নির্ণয় করে তা পূরণ করার উদ্যোগ নিতে হবে, যেমন তৃষ্ণার্ত ব্যক্তিকে ওই মুহূর্তে পানি খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা। প্রিয়জন কিংবা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তাকে স্বজনদের সঙ্গে লিংক বা যোগাযোগ ঘটিয়ে দিতে হবে। শান্ত থাকার জন্য সহযোগিতা করতে হবে, পুনরায় বিপজ্জনক অবস্থা থেকে রক্ষা করার উদ্যোগ নিতে হবে, হাসপাতাল কিংবা সেবা দেয় এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও লিংক ঘটিয়ে দিতে হবে। এসব করতে হবে সততার সঙ্গে, সেবার মনোভাব নিয়ে। কোনো অর্থের বিনিময়ে নয়। কোনো ভুল তথ্য তাকে দেওয়া যাবে না। কোনো ভুয়া প্রতিজ্ঞাও করা যাবে না।
কারা দিতে পারবেন পিএফএ?
প্রফেশনাল কিংবা নন-প্রফেশনাল সবারই এই সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড বিষয়ে বেসিক নলেজ থাকা ভালো। স্বাস্থ্য ও সেবামূলক কাজের সঙ্গে জড়িত স্বাস্থ্যকর্মী ও ভলান্টিয়ারদের বিষয়গুলো জেনে রাখা বা এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিতে হবে।
গ্রাম বা শহর পর্যায়ে যদি মানসিক স্বাস্থ্য সেবা কম থাকে, তাহলে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন খুঁজুন যারা দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক সহায়তা দিয়ে থাকে।
দৈনন্দিন জীবন যতটা সম্ভব পুনরায় চালু রাখার চেষ্টা করতে হবে। যাপিত জীবনের স্বাভাবিক রুটিন, ঘুম ও খাদ্য বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এটি মানসিক স্থিতি ভালো রাখতে সহায়ক।এই তিনটি ‘A’ পুরো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক অনুষদ।
ভোরে সূর্য ওঠে, মধ্য আকাশে উঠে যায় দুপুরে, বিকেলের পর ডুবতে থাকে, সন্ধ্যায় ডুবে যায়- এই নিয়মের মধ্যে যার যার কাজ করে যেতে হবে। বিপজ্জনক হলেও পরিস্থিতিকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারলে উৎকণ্ঠা কমে যাবে। এসব বিষয়ে ভুয়া খবর থেকে দূরে থাকা জরুরি। তবে দরকারি বিষয়ে অগ্রিম জেনে রাখা ভালো।পরিস্থিতিকে মানিয়ে নিতে হবে, নিজেকে খাপ খাওয়াতে হবে।
ভূকম্পন শুরু হলে কী করতে হবে?
পূর্ব থেকে অর্জিত জ্ঞান বিপদের সময় কাজে লাগাতে হবে।
হাই রাইজ বিল্ডিংয়ে বসবাসকারী সবাই কেন ভূমিকম্পের সময় স্বাভাবিক থাকব?
কেন ছুটোছুটি করব না?
কেন পিলারের পাশে গিয়ে আশ্রয় নেব?
মাথায় পড়তে পারে এমন কিছু থেকে কেন সতর্ক থাকব? কেন হাতের কাছে টর্চলাইট, মোবাইল কিংবা একটা পানির বোতল রাখব?
সিঁড়ি দিয়ে দৌড়াতে গেলে কী বিপদ হতে পারে, ছাদ থেকে ঝাঁপ দিতে গেলে কী সর্বনাশ হতে পারে? আমরা দেখেছি। তা মাথায় রাখতে হবে।
কেন এসব অভিজ্ঞতা মাথায় রাখব?কেন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেও ফুটপাতে বিল্ডিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকব না?ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগানোর প্রস্তুতি নিয়ে থাকলে সাহস বাড়বে।ভূকম্পনের সময় কে কোথায় থাকব আমরা কেউ জানি না। এবারের ভূমিকম্পের সময় পরিবারের সদস্যরা একেক জন একেক জায়গায় ছিলাম।
তাই আসুন সাহসের সঙ্গে গ্রহণ করি প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ। আসুন স্বাভাবিক থাকার প্রস্তুতি নিয়ে রাখি।এ ধরনের আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগরোধে এখনো মানবজাতি কিছুই আবিষ্কার করতে পারেনি।
যদিও আবিষ্কার করেছে পরমাণু বোমা, যদিও পৃথিবীর ভূ-অভ্যন্তরে গবেষণা চালাচ্ছে মানবজাতিই, যদিও পৃথিবীর ধ্বংসের জন্য আমরা সেই হিংস্র মানবগোষ্ঠীও দায়ী, অনুমান করা যেতে পারে। তবু মনে বিশ্বাস রাখতে হবে, আল্লাহ মহান এবং তিনি আমাদের একমাত্র সহায়, রক্ষাকারী আর পালনকর্তা। তিনি আমাদের জন্য যা বরাদ্দ রেখেছেন তাই আমরা মাথা পেতে নিতে বাধ্য।
লেখক: জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও কথাসাহিত্যিক।

