এখন শীতকাল। চারদিকে চলছে ওয়াজ মাহফিল। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আয়োজিত এসব ওয়াজ মাহফিলে দেশের নামকরা মসজিদের ইমাম-খতিব, মুহাদ্দিস ও মুফাসসিররা ওয়াজ করে থাকেন। ওয়াজে তারা মানুষকে সৎ উপদেশ ও ইসলামের সঠিক পথের দিশা দিয়ে থাকেন। যারা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিলেন তারা খুঁজে পান সংশোধনের পথ।
এই মৌসুমে বড়ো বড়ো আলেমদের ব্যস্ততা অনেক বেশি। কতককে একদিনে একাধিক মাহফিলেও বয়ান করতে হয়। শীতকালের এই সময় সবাই আগ্রহের সাথে আলেমদের বক্তব্য শুনার জন্য রাত জেগে বসে থাকেন। আলেমদের বয়ানে নিজেদের সংশোধনের পথ খুঁজেন সবাই।
কেননা একজন আদর্শ বক্তা প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলার কারিগর। তিনি যুগের চাহিদা অনুযায়ী সমাজের লোকদের দিক নির্দেশনা প্রদান করে আলোর দিকে নিয়ে আনার প্রাণপণ চেষ্টা করেন।এটি শতভাগ সত্য,
কিন্তু আজ আমরা কি দেখছি? প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শত শত ধর্মীয় ওয়াজ আপলোড হচ্ছে আর সেগুলো মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।কার ওয়াজ কতটা লাইক, ভিউ আর ভাইরাল হয়েছে তা নিয়ে হিসাব কষতে সবাই ব্যস্ত কিন্তু এটা কেউ একবারের জন্যও ভাবেন না আমার ওয়াজটি ক’জনকে দ্বিনের পথে আনতে সহায়ক হয়েছে বা ক’জনের হৃদয় পরিবর্তনের কাজ করেছে। কথায় কথায় কাফের আর নাস্তিক বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলছি। সামান্য মতের অমিল হলেই তাকে নিয়ে আজেবাজে মন্তব্য করতেও মুখে বাধে না। যার ফলে এসব ভাইরাল ওয়াজ শুনে হৃদয়ে পাই না প্রশান্তি।
আবার এমন আলেমও আছেন যাদের বয়ান শুনলে চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। তারা পবিত্র কুরআন ও হাদিসের শিক্ষা এমন সহজ করে তুলে ধরেন যার ফলে সবাই তা আমলের চেষ্টা করেন। তাদের বয়ান শুনে পথহারা সঠিক পথের দিশা পান।আলেমদেরকে আল্লাহপাক ধর্মের জ্ঞান দিয়েছেন, এজন্য সবসময় আল্লাহপাকের শুকরিয়া আদায় করা উচিত। সেই জ্ঞানের মাধ্যমে তারা যদি পথহারাদেরকে সঠিক পথের দিশা দিতে পারেন তবেই না তিনি আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জন করবেন।
যিনি প্রকৃত আলেম, তিনি সত্য বলতে কখনও দ্বিধা করবেন না এবং যা অন্যকে পালন করতে বলবেন, তা প্রথমে নিজে করবেন। ইসলামি শিক্ষা এক মুসলমানকে শান্তি প্রিয়, বিনয়ী এবং মহৎ গুণাবলির অধিকারী হতে উদ্বুদ্ধ করে। এই শিক্ষা ভুলে পরস্পর হানাহানির নীতি কোনোক্রমেই ইসলাম সমর্থন করে না।
হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা কি বলতে পারো দানের দিক দিয়ে সর্বাপেক্ষা বড় দাতা কে? সাহাবিরা জবাব দিলেন আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক ভালো জানেন। তখন হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দানের দিক দিয়ে আল্লাহই সব চেয়ে বড় দাতা। তার আদম সন্তানদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে বড় দাতা। আর আমার পরে বড় দাতা ওই ব্যক্তি যে ইলম শিক্ষা করে এবং তা বিস্তার (প্রচার-প্রসার) করে। কিয়ামতের দিন সে একাই একজন আমির হিসেবে উত্থিত হবে। (মিশকাত)
হাদিসে আরো উল্লেখ আছে, হজরত আবু মুসা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবি (সা.) বলেছেন- আল্লাহ আমাকে যে জ্ঞান ও হেদায়াতসহ প্রেরণ করেছেন তার উপমা বারিধারার ন্যায় যা একটি জমির ওপর বর্ষিত হয়েছে। তার একটা অংশ ভালো যা পানিকে গ্রহণ করে নিয়েছে। ফলে তা বিপুল পরিমাণ ঘাস ও গাছ উৎপন্ন করেছে। এর একটি অংশ ছিল নীচু, সেখানে তা পানি আটকিয়ে নিয়েছে, আর ওত্থেকে আল্লাহ লোকদেরকে উপকৃত করেছেন, তা থেকে তারা পান করেছে, জীবজন্তুকে পান করিয়েছে এবং পানি সেচ করে কৃষি কাজও করেছে। আবার এই বারিধারা এমন এক অংশে পৌঁছেছে যেটি ছিল অনুর্বর, সমতল ময়দান। তা পানি ধরে রাখতে পারেনি এবং তার ঘাস উৎপন্ন করার ক্ষমতাও নেই। প্রথমটি হচ্ছে ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত, যে আল্লাহর দীনের জ্ঞান লাভ করেছে এবং আল্লাহ যে জ্ঞান দিয়ে আমাকে পাঠিয়েছেন, তা থেকে সে লাভবান হয়েছে। কাজেই সে তা শিখেছে ও অন্যকে শিখিয়েছে। অপর দৃষ্টান্তটি হচ্ছে এমন এক ব্যক্তির, যে এই জ্ঞানের দিকে দৃষ্টি দেয়নি এবং আল্লাহ আমাকে যে হেদায়াতসহ পাঠিয়েছেন তা গ্রহণ করেনি।’ (বুখারি)উল্লিখিত হাদিসটিতে আল্লাহর রাসুল (সা.) তিন ধরনের জ্ঞানী ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথম দুই দল আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান লাভ করে লাভবান হয়েছে। তাদের একদল জ্ঞান অর্জন করে নিজেদের সংশোধন করেছেন কিন্তু সাধারণ মানুষের সংশোধনের প্রতি দৃষ্টিপাত করেননি। দ্বিতীয় দলটি জ্ঞান দ্বারা নিজেরা লাভবান হওয়ার সাথে সাথে অন্যদেরকে উপকৃত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, এ উম্মতের বুজুর্গানে দ্বীন। আর তৃতীয় দল হলো তারা, যারা জ্ঞান পেয়েও নিজেদের সংশোধন করেনি ও তা থেকে উপকৃতও হয়নি।
আজ আমাদের ধর্মীয় সমাজে ওই তৃতীয় শ্রেণির জ্ঞানীদের সংখ্যাই মনে হয় বেশি। অনেকে ধর্মের জ্ঞানকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে ধর্মে নতুন রীতিনীতি প্রবেশ ঘটিয়েছে এবং সমাজে তারা নানান অপকর্মও করে বসে। যার ফলে বদনাম হয় সবার।এছাড়া আমরা কতককে ওয়াজ মাহফিলে এমন কিছু মিথ্যা গল্পের চটকদার বয়ান দেয় যাতে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যান। এই ভাইরালের রোগ থেকে আমাদেরকে বের হয়ে আসতে হবে। যদিও এই সংখ্যাটা বেশি নয় কিন্তু গুটিকতক লোকদের জন্য সমাজের একটি বড়ো অংশকে এর মাশুল দিতে হয়।আগে ওয়াজ মাহফিল থেকে ধর্মীয় কত সুন্দর সুন্দর বয়ান শুনে ঘরে ফিরতাম কিন্তু এখন কি হচ্ছে? কেন জানি এখন আর ধর্মীয় বয়ানগুলোতে সেই আধ্যাত্মিক তৃপ্তি লাভ করি না। রুমাল দিয়ে চোখও মুছতে হয়না কারো।
যুব সমাজ আজ নানা অপকর্মে লিপ্ত, নেশায় মত্ত হয়ে পিতামাতাকেও খুন করছে। প্রতিনিয়ত পারিবারিক কলহে কত সুখের ঘর ভেঙে যাচ্ছে। বিপথগামী সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনতে আর পরিবারগুলোকে শান্তিময় করার লক্ষ্যে একজন আলেম বা ইসলামিক বক্তা অনেক বড়ো ভূমিকা পালন করতে পারেন। কিন্তু তারা তা না করে কীভাবে সহজে ভাইরাল হয়ে অর্থ উপার্জন করবেন সেই চিন্তায় ওয়াজে কখনও হিন্দি গানের সুর টানেন আবার কখনও বাংলা গানের। এরা যে নসিহত করেন তা নিজে কতটা পালন করেন তাও দেখার বিষয়।
বিশ্বনবি (সা.) আরবের পশুতুল্য মানুষগুলোকে যে, ফেরেশতায় রূপায়িত করেছিলেন, তা কীভাবে সম্ভব হয়েছিল? তা হয়েছিল কেবল তার উত্তম আদর্শ, উত্তম নসিহত আর অন্ধকার রাতের দোয়া।তিনি (সা.) তার উম্মতকে যে নসিহত করতেন, প্রথমে তা নিজে আমল করে দেখাতেন। যার ফলে তার নসিহত যাদুর মতো কাজ করতো। তাই যারা ওয়াজ নসিহত করেন তাদেরকে প্রথমে হতে হবে উত্তম আদর্শের। যারা সমাজের পথপ্রদর্শক তাদের আদর্শ হতে হবে সবার চেয়ে উত্তম।
একজন আদর্শবান ইমাম হচ্ছেন সমাজ ও দেশের বড়ো মূল্যবান সম্পদ। একজন আদর্শবান ইমাম চেষ্টা করলে পারেন গোটা সমাজকে আলোর দিকে নিয়ে যেতে। মহানবি (সা.) ও তার খলিফাদের মৃত্যুর পর ইসলামের প্রচার প্রসার ইমামদের মাধ্যমেই হয়েছিল। ইসলামের আদর্শবান ইমামরা প্রকৃত ইসলামকে প্রচার করে কায়েম করেছিলেন একটি আধুনিক সমাজ ও দেশ।
যিনি প্রকৃত আলেম, তিনি সত্য বলতে কখনও দ্বিধা করবেন না এবং যা অন্যকে পালন করতে বলবেন, তা প্রথমে নিজে করবেন। ইসলামি শিক্ষা এক মুসলমানকে শান্তি প্রিয়, বিনয়ী এবং মহৎ গুণাবলির অধিকারী হতে উদ্বুদ্ধ করে। এই শিক্ষা ভুলে পরস্পর হানাহানির নীতি কোনো ক্রমেই ইসলাম সমর্থন করে না।আল্লাহপাক আমাদেরকে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা অনুসরণ করে চলার তৌফিক দান করুন, আমিন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামি চিন্তাবিদ।

