১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ২৯শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

বাংলাদেশে নির্বাচন: লিবিয়ার পথে হাঁটছে!

মহসীন হাবিব
এক কথা সবারই মুখে, বাংলাদেশ ভালো নাই। কথা সত্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার, তার আগে বিএনপি সরকার, অথবা তারও আগে সামরিক শাসন- কোনো সময়ই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো ছিল না। কিন্তু বর্তমান সময়ের মতো আইনশৃঙ্খলাহীন অবস্থা কখনোই ছিল না।আইনশৃঙ্খলা খারাপ আর আইনশৃঙ্খলাহীনতার মধ্যে মহাসাগর ব্যবধান। শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া এবং তারও আগে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং জিয়াউর রহমানের সময়ে দেখা গেছে, দলের নেতাকর্মীদের কারও কারও অপরাধ সরকার হজম করেনি। কিছুটা পাবলিক পারসেপশনের কারণে, কিছুটা বিবেকের তাড়নায়, অথবা রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ন্যূনতম সচল রাখার প্রয়োজনে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এর কোনোটি উপস্থিত নেই। দলীয় পরিচিতির বিবেচনায় এমনকি ফৌজদারি অপরাধ আমলে না নিতে নির্বাহী আদেশ দিতে দেখা যাচ্ছে।দেশের অর্থনীতির কতটা ভয়াবহ অবস্থা সেটা শুধু ব্যবসায়ীরাই না, অতি সাধারণ মানুষও চাল-লবণ-চিনি-তেল কিনতে গিয়ে অনুধাবন করছেন। পণ্য আমদানির এলসি করতে ব্যাংকগুলো অনীহ হয়ে উঠেছে। শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাঁচামালের অভাব দেখা দিয়েছে, যা উৎপাদনকে চরমভাব ব্যাহত করছে।অন্যদিকে কয়েকশ গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি হয় বন্ধ হয়ে গেছে অথবা বন্ধের উপক্রম হয়েছে। সমাজ গভীরভাবে একাধিক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আইন হাতে তুলে নিচ্ছে দেশের বড় সংখ্যক গোষ্ঠী কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে। জনপ্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসন শুধু অকার্যকরই নয়, কোথাও কোথাও আক্রান্ত হয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
মোদ্দা কথা, একটি রাষ্ট্রে যতগুলো কারণে চরম নৈরাজ্য দেখা দেয় তার সবগুলো আলামত দৃশ্যমান। এখন বাকি শুধু লিবিয়া বা সুদানের মতো সরাসরি গৃহযুদ্ধ! সেটা না হলেই আমরা স্বস্তি পাই। দেশ গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থান এবং অভ্যুত্থান পরবর্তী ঘটনাবলি হুবহু লিবিয়ার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, যেন কার্বন কপি। এখন থেকে ১৪ বছর আগে অভ্যুত্থানের পর লিবিয়ায় ঠিক যা যা ঘটতে শুরু করেছিল, বাংলাদেশের তাই ঘটে চলেছে। কী ঘটেছিল লিবিয়ায়, কী ছিল লিবিয়ার ঘটনাবলির নেপথ্যে, বাংলাদেশের সঙ্গে মিল কোথায় তা একটু উল্লেখ করলেই পরিষ্কার দেখা যাবে।
লিবিয়ায় দীর্ঘকাল শাসন ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন কর্নেল মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি। এই সময়ে লিবিয়ার মাথাপিছু আয় ওই অঞ্চলের সব দেশকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এমনকি অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, দেশটির অর্থনীতি ইতালি এবং যুক্তরাজ্যকে ছুঁয়ে ফেলেছিল। লিবিয়ায় শিক্ষার হার ৯৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি তার বৈদেশিক এবং অভ্যন্তরীণ পলিসি গ্রহণে ছিলেন দুমুখী। তিনি একদিকে তেলসহ বিভিন্ন কোম্পানি জাতীয়করণ করেছিলেন, সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন, অন্যদিকে তিনি দেশে শরিয়াহ আইন চালু করেছিলেন।
বৈপরীত্যই বটে। গাদ্দাফি যুক্তরাষ্ট্রকে চরম শত্রু বানিয়ে ফেলেছিলেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিল রেজ্যুলেশন ১৯৭৩ এর অধীনে ন্যাটো সামরিক হস্তক্ষেপ করে এবং গাদ্দাফিকে উৎখাত করে। গাদ্দাফিকে উৎখাতের পরপরই তেলের ভান্ডার লিবিয়ায় স্বার্থের সংঘাত শুরু হয়। অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভক্তি দেখা দেয়। শুরু হয় জটিল এক গৃহযুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যালান জে কুপারম্যান ২০১৩ সালে তার ‘লেসনস ফ্রম লিবিয়া: হাউ নট টু ইন্টারভেন’ শিরোনামের নিবন্ধে লিখেছেন, ‘এটা এখন পরিষ্কার ন্যাটোর লক্ষ্য ছিল গাদ্দাফিকে অপসারণ করা, লিবিয়া সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাক, জনগণ চরম দুর্ভোগে পড়ুক তাতে কিছুই আসে যায় না।’ লিবিয়ার আন্তঃকলহে আমেরিকান-লিবিয়ান সেনা কর্মকর্তা খলিফা হাফতারকে পেছন থেকে মদত দেয় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল। আরও বিভক্ত হয়ে পড়ে দেশটি। যে লিবিয়া ইতালি এবং যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিকে ধরে ফেলেছিল, সেই লিবিয়ায় ২০১৬ সালেই ১৩ লাখ মানুষ সরাসরি ক্ষুধার সম্মুখীন হয়ে পড়ে।
মধ্যআয়ের সক্ষমতা হাতের নাগালে চলে এসেছিল। কিন্তু লিবিয়া গাদ্দাফির মতোই তিনি শাসনক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন বজ্রমুষ্ঠিতে এবং পররাষ্ট্রনীতিতেও গাদ্দাফির মতো ‘না ঘরকা না বারকা’ একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন। না তিনি শক্ত করে চীনের হাত ধরতে পেরেছেন, না ভারতের।
একদিকে তিনি ভারতের বিজেপি সরকার এবং সেক্যুলার ভারতের বন্ধু হতে চেয়েছেন, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে মৌলবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন, যে কারণে তাকে কওমি জননী ডাকা হতো। বন্ধু নির্বাচনে এই বৈপরীত্যের মাঝে তিনিও গাদ্দাফির মতো যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি শত্রু বানিয়ে ফেলেছিলেন।
তাই ভয় হয়। লিবিয়ায় ১৪ বছর পার হয়েছে, বাংলাদেশে সবে ১৪ মাস। লিবিয়ার ঘটনাপ্রবাহের আলোকে আগামী ১০-১২ বছরে বাংলাদেশের চেহারা কী রকম হতে যাচ্ছে? লিবিয়ায় একটি সংবিধান প্রণয়নের কথা ছিল। গাদ্দাফির পতনের পর সেই সংবিধান আর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। নির্বাচনের রোডম্যাপ বারবার ঘোষণা করেও নির্বাচন সংঘটিত করা যায়নি। তবে স্থানীয় নির্বাচন কিছু হয়েছে, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।বাংলাদেশে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং সেই অনুসারে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেই হিসাবে আর মাত্র তিন মাস বাকি। কিন্তু দেশের মানুষই নির্বাচন হবে কি না তা নিয়ে এখনো সন্দিহান। তবে নির্বাচন যদি একটা হয়ও, তাতেও যে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা আসবে সে গ্যারান্টি কারও কাছে নাই!
লেখক: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়