জননিরাপত্তার জন্য পুলিশের ভূমিকা অপরিহার্য। দেশ যাতে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য না হয়, মানুষ যাতে নিরাপদে বসবাস করতে পারে, নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে, সেই পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব মূলত পুলিশ বিভাগের। কিন্তু আমাদের দেশে বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের অভিযোগের অন্ত নেই।
সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলে অর্থ আদায় বা চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য বা গ্রেপ্তার বাণিজ্য, মাদক কারবারি বা অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা, অর্থের জন্য নির্যাতনসহ আরো কত কি? নিকট অতীতে চাঁদা না পেয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো, এমনকি চোখ উপড়ে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের গল্প বানিয়ে নিরীহ মানুষকে হত্যা করা প্রায় নৈমিত্তিক বিষয় হয়েছিল। পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহারও চরমে উঠেছিল। অপহরণ, গুম ও গুপ্তহত্যার মতো বহু ঘটনা ঘটেছে।পুলিশ বাহিনীকে এসবের বাইরে এনে সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা অপরিহার্য।
পুলিশে জনবান্ধব ভূমিকা ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের অনুমোদন দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে বিকেলে প্রেস ব্রিফিংয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বিষয়টি বিস্তারিত জানান।
তিনি জানান, এই কমিশনের শীর্ষে থাকবেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক। তাঁর সঙ্গে যুক্ত থাকবেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন গ্রেড-১ পর্যায়ের একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত একজন অধ্যাপক এবং মানবাধিকার ও সুশাসন বিষয়ে কমপক্ষে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন বিশেষজ্ঞ। এই কমিশন গঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো পুলিশকে জনবান্ধব, আধুনিক ও প্রভাবমুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা।
রিজওয়ানা হাসান জানান, কমিশনের দুটি বিশেষ দায়িত্ব হলো : প্রথমত, নাগরিকদের পুলিশের বিরুদ্ধে করা অভিযোগগুলোর তদন্ত ও নিষ্পত্তি করা; দ্বিতীয়ত, পুলিশ সদস্যদের পেশাগত সমস্যা বা অভিযোগগুলোর সমাধান করা। এ ছাড়া কমিশন পুলিশের দক্ষতা, শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করবে।কমিশন সরকারকে জানাবে, পুলিশের কোন কোন জায়গায় আধুনিকায়ন প্রয়োজন, কী ধরনের প্রশিক্ষণ তাদের মানবাধিকার সংবেদনশীলতা বাড়াতে সহায়ক হবে এবং তাদের কাজকে আরো কার্যকর করতে কী ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা উচিত। পাশাপাশি পুলিশসংক্রান্ত আইনগুলো নিয়ে গবেষণা করে ভবিষ্যৎ সংস্কারের প্রস্তাবও করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের পুলিশ বিভাগের মধ্যে এখনো ঔপনিবেশিক আমলের নিবর্তনমূলক মানসিকতা প্রবলভাবে বিদ্যমান। ফলে পুলিশ জনবান্ধব হচ্ছে না। পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহারও এ ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। অতীতে পুলিশকে জনবান্ধব করার লক্ষ্যে অনেক অঙ্গীকার করা হয়েছে, আইন ও সংস্কার করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো সুফল দেখা যায় না। আমরা আশা করি, বর্তমান অধ্যাদেশের ভিত্তিতে গঠিত কমিশন পুলিশকে জনবান্ধব করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আমরা চাই, পুলিশি কর্মকাণ্ডে সত্যিকার অর্থে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হোক।

