২৬শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ১১ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় নতুন মোড়: বাগেরহাটে ৪টি আসন বহাল : জেলা জুড়ে আনন্দের বন্যা

কামরুজ্জামান মুকুল, বাগেরহাট
বাগেরহাটে সংসদীয় আসন চারটি থেকে কমিয়ে তিনটি আসন করা-সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের (ইসি) গেজেট বাতিল করে হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।বুধবার (১০ ডিসেম্বর) প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ৫ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। এই রায়ের ফলে বাগেরহাটে দীর্ঘদিন চলে আসা চারটি আসনই বহাল থাকল। এই রায়ে বাগেরহাটের মানুষের স্থায়ী বিজয় হয়েছে বলে জানান বাগেরহাটের পক্ষে রিটকারী আইনজীবি ব্যারিষ্টার শেখ মোহাম্মাদ জাকির হোসেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন বাগেরহাটের গন মানুষের আকাঙ্খাকে উপেক্ষা করে চারটি আসনের মধ্যে একটি আসন কমিয়ে তিনটি আসন করে গেজেট প্রকাশ করেছিল। এটা আসলে বাগেরহাটের মানুষের উপর অবিচার ছিল।ন্যায় বিচারের আশায় আমরা আদালতের আশ্রয় নিয়েছিলাম। হাইকোর্ট নির্বাচন কমিশনের গেজেটে অবৈধ ঘোষনা করে, বাগেরহাটে চারটি আসন বহাল রাখার রায় দিয়েছেন। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পূর্নাঙ্গ বেঞ্চও চারটি আসন বহাল রেখেছেন। এই রায়ের মাধ্যমে বাগেরহাটের মানুষের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন হয়েছে। এখন আমরা চাই, নির্বাচন কমিশন খুব দ্রুত গেজেট প্রকাশ করবেন। বাগেরহাটের চারটি আসনেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। এদিকে বাগেরহাটের চারটি আসন বহাল থাকায় জেলা জুড়ে আনন্দের বন্যা বইছে। তবে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ্য থাকায় কোন আনন্দ মিছিল করেনি দলটির নেতাকর্মীরা। অন্যান্য দলের সমর্থকরাও বিএনপিকে সম্মান দেখিয়ে আনন্দ মিছিল করেনি। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলহামদুলিল্লাহ এবং বাগেরহাটের বিজয় হয়েছে বলে স্টাটাস দিচ্ছেন সর্বস্তরের জনগণ। গত ৩০ জুলাই দুপুরে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাগেরহাটের চারটি আসনের মধ্যে একটি আসন কমিয়ে জেলায় তিনটি আসন করার প্রাথমিক প্রস্তাব দেয় নির্বাচন কমিশন। এরপর থেকেই বাগেরহাটবাসী আন্দোলন শুরু করে। চারটি আসন বহাল রাখার দাবিতে নির্বাচন কমিশনের শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন নেতাকর্মীরা। এরপরেও ৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন শুধু সীমানা পরিবর্তন করে তিনটি আসন জারি রেখে চুড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করে।
পরে ৭ সেপ্টেম্বর বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় আসন বহাল রাখার দাবিতে বাগেরহাটের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে দুটি রিট করেন। বাগেরহাট প্রেসক্লাব, জেলা আইনজীবী সমিতি, জেলা বিএনপি, জেলা জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জেলা ট্রাক মালিক সমিতি একটি রিটদায়ের করে। অপরটি করেন চিতলমারী উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মুজিবর রহমান শামীম। রিটে বাংলাদেশ সরকার, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশন সচিব ও অ্যার্টনি জেনারেল কে বিবাদী করা হয়। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ সেপ্টেম্বর বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় আসন বহাল করতে কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে বাগেরহাটের চারটি আসন থেকে একটি কমিয়ে তিনটি আসন করে নির্বাচন কমিশনের গেজেট কেন অবৈধ হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়। এরপর গত ১০ নভেম্বর বাগেরহাটের চারটি আসন থেকে একটি কমিয়ে তিনটি আসন করে নির্বাচন কমিশনের গেজেট অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় আসন বহাল করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। আর গত ৩ ডিসেম্বর বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় আসন পুনর্বহাল করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গেজেট জারি করতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়ে রায় প্রকাশ করেন হাইকোর্ট। পরে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে ইসি। আপিল বিভাগও জেলায় চারটি আসন বহাল রাখার রায় দিয়েছেন। বাগেরহাটের পক্ষে আদালতে রিটের শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার শেখ মুহাম্মদ জাকির হোসেন ও অ্যাডভোকেট কামরুল হক সিদ্দিকী। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী কামাল হোসেন মিয়াজী। এদিকে বাগেরহাটে চারটি আসন বহাল থাকায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা এবং জনসংযোগে নতুন মোড় নিয়েছে। চারটি না তিনটি কি হবে, সে বিষয় নিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে নানা বিড়ম্বনা ছিল। যার কারণে জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এখন পর্যন্ত জেলার কোন আসনে প্রার্থী ঘোষনা করেনি। এবার দ্রুতই প্রার্থী ঘোষনা করবেন এবং প্রার্থীরা তাদের নিজস্ব আসনে প্রচার-প্রচারণা ও জনসংযোগ করতে পারবেন। বিএনপি নেতা খান মনিরুল ইসলাম বলেন, আসন সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে পুরো বাগেরহাটবাসী একটা অস্থিরতার মধ্যে ছিলেন। রাজনীতিবিদরাও বেশ জটিলতার মধ্যে ছিলেন। আজকে এই আসন ফিরে পাওয়ায় এখন সবাই তাদের পছন্দ অনুযায়ী কাজ করতে পারবে। বাগেরহাট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এমএ সালাম বলেন, এই আসন ফিরে পাওয়াটা গণমানুষের আশা পূরণ করেছে। এটা দলীয় কোন স্বার্থ নয়, বাগেরহাটের স্বার্থেই আমরা আসন ফেরাতে সর্বদলীয় ভাবে কাজ করেছি।
জেলা বিএনপির যুগ্ন আহবায়ক ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, চারটি আসন ফিরে পাওয়ায় আমরা খুশিতে আত্মহারা। সবাই খুশি হয়েছে। গন মানুষের আকাঙ্খার প্রতিফলন হয়েছে এই রায়ে। বাগেরহাট জেলা বিএনপির আহবায়ক এটিএম আকরাম হোসেন তালিম বলেন, আসন সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সম্ভ্যাব্য প্রার্থী এবং নেতাকর্মীদের স্বাভাবিক জনসংযোগে বেশকিছুটা ভাটা পড়েছিল। এখন চারটি আসন ফিরে পাওয়ায় সবাই তার নিজ নিজ আসনে প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারবেন। সেই সাথে জেলার সকল মানুষ আনন্দিত। তবে দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া হাসপাতালে ভর্তি থাকায় আমরা মানসিকভাবে কষ্টে আছি। তাই আমরা কোন আনন্দ মিছিল করব না। তবে একজন বাগেরহাটবাসী হিসেবে আমি খুবই আনন্দিত।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়