ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরের দিন শুক্রবার রাজধানীর বিজয়নগরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্যে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদির অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁর মাথায় অস্ত্রোপচার করা হয় এবং লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। পরে তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এ ঘটনায় সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। রাজধানীসহ সারা দেশেই বিভিন্ন দল ও সংগঠন প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। অবিলম্বে খুনিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করা হয়। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীর ওপর এ ধরনের হামলার ঘটনায় রাজনীতিবিদসহ সারা দেশের মানুষ রীতিমতো হতবাক। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে হামলাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ঘটনায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘ওসমান হাদির ওপর দুষ্কৃতকারীদের যে হামলা হয়েছে, তা রুখে দিতে অবশ্যই গণতন্ত্র লাগবে।’ এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
হাদিকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঢাকা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগে গিয়ে হাদির খোঁজখবর নেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। এ ছাড়া বিভিন্ন দলের নেতারা হাসপাতালে গিয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) মাসিক অপরাধমূলক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ২৩০ জনের বেশি ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এতে ৮০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। হতাহতের মধ্যে রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে পুরান ঢাকার শ্যামবাজারে মসলা ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিনে আট জেলায় ৯ জনকে খুন করা হয়। কয়েক দিন আগে খুলনায় আদালতপাড়ায় প্রকাশ্যে দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে মিরপুরে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্র বলছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেভাবে অবস্থার অবনতি হচ্ছে, সরকার দ্রুত পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে না পারলে নির্বাচনের আগে অবস্থা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক এমন অবস্থার জন্য বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করেন। এর মধ্যে আছে, গত বছর ৫ আগস্টের আগে ও পরে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলির একটি বড় অংশ উদ্ধার করতে না পারা, প্রতিনিয়ত অস্ত্র চোরাচালান হয়ে আসা, ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে ঢালাওভাবে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের জামিন দেওয়া এবং তাদের উপযুক্ত নজরদারিতে রাখতে না পারা ইত্যাদি। আমরা মনে করি, ওসমান হাদির ওপর হামলাকারী সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। পরস্পরকে দোষারোপ করে বক্তব্য দেওয়া থেকে রাজনৈতিক নেতাদের বিরত থাকতে হবে। সারা দেশে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে অবিলম্বে চিরুনি অভিযান চালাতে হবে। যেকোনো মূল্যে নির্বাচনের পরিবেশ রক্ষা করতে হবে।

