২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

রক্তে রঞ্জিত বিশ্বশান্তি

দক্ষিণ সুদানের আবেইতে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের ঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলায় ছয়জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর শাহাদাতবরণ এবং আটজনের আহত হওয়ার মর্মান্তিক সংবাদে জাতি গভীরভাবে শোকাহত। জাতিসংঘের পতাকাতলে বিশ্বশান্তি রক্ষার মহান দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশের এই বীর সন্তানদের আত্মত্যাগ জাতির জন্য যেমন গৌরবের, তেমনি বেদনারও।আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ও অন্যান্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই কাপুরুষোচিত ড্রোন হামলা শুধু আমাদের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ওপর আঘাত নয়, বরং আন্তর্জাতিক শান্তি ও মানবতার আদর্শের ওপর এক গুরুতর আঘাত। করপোরাল মো. মাসুদ রানা, সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম, সৈনিক শামীম রেজা, সৈনিক শান্ত মণ্ডল, মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম এবং লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়াসহ যে বীররা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সুদূর আফ্রিকার মাটিতে বিশ্বশান্তি রক্ষায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করলেন, তাঁদের এই আত্মত্যাগ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে অন্যতম সর্বোচ্চসংখ্যক শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে যে গৌরব বহন করে আসছে, এই আত্মত্যাগ তারই এক রক্তমাখা দলিল। ১৯৮৮ সালে ইরাক-ইরানে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ৩৭ বছরে তা বিশ্বের ৪৩টি দেশ ও স্থানে ৬৩টি মিশনে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছে। আমাদের শান্তিরক্ষীরা সাহসিকতা, পেশাদারি এবং মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কিন্তু শান্তির এই পথ সব সময় কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এই হামলাসহ শুরু থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৬৮ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বশান্তি রক্ষায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং রাজনৈতিক নেতারা। তাঁদের শোকবার্তায় শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা জোরদার করার এবং আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার তাগিদ এসেছে। সরকার দ্রুত শহীদদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা ও আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা প্রদানের জন্য জাতিসংঘের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করছে। আহতদের মধ্যে সৈনিক মো. মেজবাউল কবিরের সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং অন্যরা শঙ্কামুক্ত আছেন। এটি কিছুটা হলেও স্বস্তির খবর। এই দুঃসময়ে শহীদদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা। জাতি তাঁদের এই অপরিসীম ত্যাগের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে। এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো জাতিসংঘের একটি সুরক্ষিত ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানোর সক্ষমতা সন্ত্রাসী বা আধাসামরিক বাহিনীর হাতে থাকা। এটি শুধু বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের জন্য নয়, বিশ্বব্যাপী শান্তি রক্ষা মিশনে নিয়োজিত সব দেশের সদস্যদের নিরাপত্তার জন্যই গুরুতর হুমকি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে জাতিসংঘকে অবশ্যই শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরো কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কারণ বিশ্বশান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অঙ্গীকার দৃঢ়। আমাদের বীর সন্তানদের আত্মত্যাগ সেই অঙ্গীকারের এক গৌরবময় নিদর্শন। তাঁদের এই রক্তস্নাত শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্রত যেন কোনোভাবেই ব্যর্থ না হয়, সেই প্রত্যয় আজ আমাদের সবার।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়