২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৮ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

ব্যবসা-বাণিজ্য খাদের কিনারে

দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। বলা যায়, রীতিমতো খাদের কিনারে। করোনা মহামারি এবং পরবর্তী কয়েকটি যুদ্ধ, অবরোধ ও আরো কিছু কারণে সৃষ্ট মন্দার চাপ এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আরো খারাপ হয়েছে। মূল্যস্ফীতি এখনো অসহনীয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলার দুরবস্থা, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ভোক্তার চাহিদায় ধস, বেকারত্ব বৃদ্ধি, কাঁচামাল আমদানি কম—সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ চরম সংকটে রয়েছে।
দেশের অর্থনীতি যে সংকটময় সময় পার করছে, তা উঠে এসেছে সরকারের পর্যবেক্ষণেও। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ স্টেট অব দি ইকোনমি ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেছে, ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে ধীরগতি দেখা দিয়েছে, সুদহার বেড়ে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন উদ্যোগ নিতে নিরুৎসাহ হচ্ছেন। ফলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন উভয় ক্ষেত্রেই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।প্রতিবেদনে দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রমকে প্রবৃদ্ধির বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ২ শতাংশে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বাজারে স্থবিরতার প্রভাব সরাসরি পড়ে শিল্প ও সেবা খাতে। একই সময় কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ০.৭৬ শতাংশ, শিল্পে ২.৪৪ শতাংশ এবং সেবায় ২.৪১ শতাংশ।
বিনিয়োগের প্রধান নির্দেশক মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার হার ২০২৫ সালে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে, যা শিল্প খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতারই ইঙ্গিত দেয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও মূল সমস্যা এখন বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ঝুড়ির চেয়ে নেতিবাচক ঝুড়ি বেশি ভারী।’দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত এক বছরে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। কিন্তু সেই অনুপাতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়ায় পণ্যের বিক্রি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।
তারা বলছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাইরেও নানা কাঠামোগত সমস্যায় তারা জর্জরিত। উচ্চ সুদহার ও কঠোর ঋণনীতির কারণে বিনিয়োগ ব্যয় বেড়েছে, বিশেষ করে এসএমই ও নতুন উদ্যোক্তারা অর্থায়নে বড় বাধার মুখে পড়ছেন। ব্যাংকঋণের সুদহার এখন ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ, যা বিনিয়োগের জন্য মোটেও অনুকূল নয়।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং সুশাসনের ঘাটতি ব্যাবসায়িক আস্থা নষ্ট করছে। অন্যদিকে বন্দরের অদক্ষতা ও লজিস্টিক ব্যয় প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমাচ্ছে। দক্ষ জনবলের ঘাটতি ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের ধীরগতি বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীলতাকে দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ আজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। শিল্পায়নের স্বপ্ন ভেঙে গেলে শুধু কর্মসংস্থানই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বাংলাদেশ হারাবে আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যতের পথ। সংগত কারণেই সবাই তাকিয়ে আছেন আসন্ন নির্বাচনের দিকে। আশা করছেন, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়