৩০শে পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব কালিগঞ্জে সার সিন্ডিকেটে জিম্মি কৃষক

সুকুমার দাশ বাচ্চু, কালিগঞ্জ
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলায় সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকদের তা কিনতে হচ্ছে নির্ধারিত দামের অনেক বেশি মূল্যে। কখনো সার নেই অজুহাত, আবার কখনো একাধিক শর্ত আরোপ করে বিক্রি। এই বাস্তবতায় জিম্মি হয়ে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা। সম্প্রতি অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিসিআইসি ও বিএডিসির সার বিতরণ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী ডিলার সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সার বিক্রি করা হচ্ছে চড়া দামে, আর এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। দক্ষিণশ্রীপুর ইউনিয়নের শ্রীকলা গ্রামের কৃষক হাফিজুর রহমান জানান, “চলতি বোরো মৌসুমে ডিএপি সার কিনতে গেলে অনুমোদিত ডিলার তাকে এক বস্তা সার দিতে অস্বীকৃতি জানান। বরং সর্বোচ্চ ২০ কেজি দেওয়ার কথা বলা হয় এবং পুরো বস্তা নিতে হলে কৃষি কর্মকর্তার অনুমতি লাগবে বলে জানানো হয়। একই সঙ্গে অন্য সার কিনতেও বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। কালিগঞ্জের কুশলিয়া, কৃষ্ণনগর, মৌতলা, বিষ্ণুপুর, দক্ষিণশ্রীপুর, মথুরেশপুর, ধলবাড়িয়া, রতনপুর, ভাড়াশিমলা, নলতা, চাম্পাফুল ও তারালী প্রায় সব ইউনিয়নেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কোথাও সার না থাকার কথা বলা হচ্ছে, আবার কোথাও অতিরিক্ত দাম ও শর্তে বিক্রি করা হচ্ছে। ধলবাড়িয়া ইউনিয়নে একই পরিবারের একাধিক ডিলারশিপ পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, একটি পরিবারের হাতে বিসিআইসি ও বিএডিসির একাধিক ডিলারশিপ থাকায় বাজার পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে মৌতলা ইউনিয়নেও, যেখানে একাধিক ডিলারশিপ কার্যত একই নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। কৃষকদের বড় অংশই সরকারি নির্ধারিত সারের মূল্য সম্পর্কে অবগত নন। এই সুযোগে ডিলাররা ইউরিয়া, ডিএপি ও পটাশ সার সরকারি দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ। অনেক ক্ষেত্রে সার কেনার সময় বীজ ও কীটনাশক কিনতেও চাপ দেওয়া হচ্ছে। নীতিমালা অনুযায়ী, কালিগঞ্জ উপজেলায় প্রতি ইউনিয়নে একজন ডিলার এবং প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে সাব-ডিলার থাকার কথা। অথচ বাস্তবে অনুমোদনহীন শতাধিক খুচরা সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ব্যবসায়ীর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সার অবৈধভাবে বিক্রি হচ্ছে, যার ওপর কার্যত কোনো নজরদারি নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সাব-ডিলার জানান, এক ইউনিয়নে ট্রাকে করে আসা ৪০০ বস্তা ডিএপি সারের বড় অংশ ডিলারের গুদামেই মজুত রাখা হয়। পরে সেই সার খুচরা বাজারে চড়া দামে বিক্রি করা হয়।” এতে মাত্র এক ট্রাক সারের ক্ষেত্রেই কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কয়েক লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। মৌতলা ইউনিয়নের পানিয়া গ্রামের ধানচাষি জহুরুল আলমের কাছে সরকারি দরে সার বিক্রির মূল্য জানতে চাইলে তিনি তা বলতে পারেননি। তবে তিনি জানান, চলতি মৌসুমে তাকে ইউরিয়া সার কেজি প্রতি ৩০ টাকা, ডিএপি (বাংলা) ৩৫ টাকা, চায়না ডিএপি ৩৫ টাকা এবং পটাশ সার ২৫ টাকা দরে কিনতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, সার কেনার সময় তাকে অতিরিক্তভাবে বীজ বা কীটনাশক কিনতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
একই সময়ে একাধিক সার ডিলারের দোকানে গিয়ে একই ধরনের কথা শুনে খালি হাতে ফিরে আসতে হচ্ছে কৃষকদের। কোথাও “সার নেই”, আবার কোথাও শর্ত সাপেক্ষে বিক্রি-এমন অভিজ্ঞতা কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। এতে করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সার বিক্রির অভিযোগ আরও জোরালো হচ্ছে। কৃষকদের দাবি, সরকারি তদারকি জোরদার না হলে এই অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়।
কালিগঞ্জ উপজেলায় সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি ইউনিয়নে একজন করে সার ডিলার এবং প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে মোট ১০৮ জন সাব-ডিলার থাকার কথা। কিন্তু এর বাইরে উপজেলায় আরও প্রায় ৪০০ খুচরা সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব খুচরা ব্যবসায়ীর মাধ্যমে কোনো ধরনের অনুমোদন বা নীতিমালা অনুসরণ ছাড়াই কোটি কোটি টাকার সার কেনাবেচা হচ্ছে। উপজেলা কৃষি অফিস এই খুচরা ব্যবসায়ীদের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত থাকলেও কার্যত তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে পুরো সার বিতরণ ব্যবস্থা চলে যাচ্ছে একটি অবৈধ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে-এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সাব-ডিলার জানান, একটি ইউনিয়নের নির্ধারিত ডিলারের কাছে এক ট্রাকে করে প্রায় ৪০০ বস্তা ডিএপি সার আসে। নিয়ম অনুযায়ী ওই ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের সাব-ডিলারদের প্রত্যেককে ৫ বস্তা করে মোট ৪৫ বস্তা সার দেওয়া হয়। কিন্তু বাকি প্রায় ৩৫৫ বস্তা সার ডিলারের গুদামেই মজুদ থাকে। অভিযোগ রয়েছে, এই মজুদকৃত সার সময় ও সুযোগ বুঝে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করা হয়। হিসাব অনুযায়ী, ৪০০ বস্তা ডিএপি সার সমান ২০ হাজার কেজি। সরকারি দরে কেজি প্রতি ১৯ টাকা হিসেবে যার মোট মূল্য দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অথচ সেই একই সার খুচরা পর্যায়ে কেজি প্রতি ৩৫ টাকা দরে বিক্রি হলে মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র ৪০০ বস্তা ডিএপি সারের ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা কৃষকদের পকেট থেকে কেটে নেওয়া হচ্ছে। অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, এই বিপুল অঙ্কের অর্থ ডিলার সিন্ডিকেট ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগাভাগি হচ্ছে। এই চিত্র শুধু একটি ইউনিয়নের নয়-উপজেলার একাধিক ইউনিয়নে একই কায়দায় সার লুটপাট চলছে বলে দাবি কৃষকদের। সরকারি গুদামে সার থাকা সত্ত্বেও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের জিম্মি করা হচ্ছে, আর প্রশ্নের মুখে পড়ছে উপজেলা কৃষি অফিসের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কালিগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়াসিম উদ্দিন বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। কালিগঞ্জে কোনো সার সংকট নেই। অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তিনি উপজেলায় প্রকৃত সারের মজুত, একাধিক ডিলারশিপের বৈধতা কিংবা অতিরিক্ত দামে বিক্রির দায়ে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর দেননি।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি সার ব্যবস্থাপনা আইন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন এবং সরকারি ভর্তুকি নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা বলছেন, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর অভিযান এবং দায়ী কর্মকর্তা ও ডিলারদের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়