বাংলাদেশিদের জন্য পৃথিবীর দ্বার ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। অনেক দেশই বাংলাদেশিদের ভিসা দিতে অস্বীকার করছে কিংবা কঠিন শর্ত আরোপ করছে। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশিদের ভিসা প্রদানের জন্য কঠিন শর্ত আরোপ করেছে। গত মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইটে দেওয়া বার্তায় জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আবেদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ ২৫টি দেশের নাগরিকদের ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ‘ভিসা বন্ড’ বা জামানত দিতে হবে।বাংলাদেশি টাকায় ১৫ হাজার ডলারের সমান হচ্ছে ১৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা (এক ডলার ১২৩ টাকা হিসেবে)। জামানত দিলেই ভিসা হবে তারও নিশ্চয়তা নেই।গত মাসের প্রথম দিকে যুক্তরাজ্যের ৯টি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের ভর্তির আবেদন বাতিল ও স্থগিত করেছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশও বাংলাদেশিদের ভিসা প্রদানে কঠোর নিয়ম-কানুন আরোপ করেছে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রধান গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইনসহ আরো কয়েকটি দেশ। বর্তমানে সৌদি আরবে কিছু শ্রমিক যেতে পারলেও অন্য দেশগুলোতে প্রকৃতপক্ষে বন্ধ রয়েছে শ্রমিক প্রেরণ অথবা শর্তসাপেক্ষে চলছে। কুয়েতসহ আরো কিছু দেশের শ্রমবাজার একেবারে বন্ধ।যেসব দেশে বর্তমানে অল্পসংখ্যক শ্রমিক যাচ্ছেন, সেগুলোও ২০২৬ সালে বন্ধ হতে পারে বলে জানা গেছে।
অভিবাসন ও দর্শনার্থীদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে যেসব দেশের সহজে কর্মসংস্থান হতো, সেসব দেশও ভিসা দিচ্ছে না। এসব দেশে ভিসা নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও কার্যত ভিসা পাওয়া যাচ্ছে না। যেমন—ভারত, ইউএই, কাতার, বাহরাইন, ওমান, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম এসব দেশ ভিসা দিচ্ছে না। এ ছাড়া থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়ার ভিসাও অত্যন্ত ধীরগতিতে প্রক্রিয়াকরণ হচ্ছে।যুক্তরাষ্ট্র আগে বছরে পাঁচ লাখের মতো ভিসা দিত বাংলাদেশিদের। সাম্প্রতিক সময়ে সেটি দুই লাখেরও নিচে নেমে এসেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর পর্যটন ভিসা কার্যত বন্ধ করে দেয় ভারত। আর ঘোষণা ছাড়াই ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার অনেক দেশের ভিসা পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠেছে। পর্যটন খাতের উদ্যোক্তারা জানায়, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় দেশগুলোও ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তুলনায় অনেক কম ভিসা দিচ্ছে। সঙ্গে সংযুক্ত করেছে নতুন নতুন শর্ত। অন্যদিকে ভিসা প্রক্রিয়া খুব ধীরগতিতে সম্পন্ন করছে।প্রবাস আয় বা রেমিট্যান্সকে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি বলা যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খুব শিগগির সেখানেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে। আর এ জন্য দায়ী আমরাই। অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ অবৈধপথে বিদেশে পাড়ি জমায়। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, অনেক বাংলাদেশি ভিসা আবেদনে ভুয়া তথ্য দেয়। বিদেশে ভিসার মেয়াদ শেষে ফিরে আসে না। অনেকে বিদেশে গিয়ে ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করে কিংবা ধরন পরিবর্তনের চেষ্টা করে। তা ছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতাও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি খারাপ করেছে এবং বাংলাদেশিদের ভিসা না দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব রেখেছে।
বাংলাদেশিদের জন্য কাজ, শিক্ষা, পর্যটন, বাণিজ্য ও অন্যান্য ভিসাপ্রাপ্তি সহজ করার লক্ষ্যে কূটনৈতিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি জমানো রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

