২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৮ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

রাজনৈতিক সরকারের প্রতীক্ষা

দেশের অর্থনীতি নানাবিধ চাপে রয়েছে। কয়েক বছর ধরেই অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা কাজ করছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আশা করা হয়েছিল, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বেকার সমস্যা তীব্র হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই অবস্থায় দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা তাকিয়ে আছেন আসন্ন নির্বাচনের দিকে। তাঁরা আশা করছেন, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা নিলে প্রতিকূল অবস্থা অনেকটাই কেটে যাবে। অর্থনীতিতে নতুন করে গতির সঞ্চার হবে। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আস্থার সংকটে থাকা যেসব বিনিয়োগকারী অপেক্ষা করা ও দেখার নীতি নিয়েছিলেন, তাঁদেরও মনোভাবে কিছুটা পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। তাঁরা আশা করছেন, রাজনৈতিক সরকার ফিরে এলে নীতিগত স্থিরতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুযোগ তৈরি হবে।রপ্তানি খাতে স্থবিরতা কাটেনি। টানা পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি আয় কমছে। সদ্যঃসমাপ্ত ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি কমেছে ১৪.২৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ২.১৯ শতাংশ কম। মূল্যস্ফীতিও বড় উদ্বেগ। ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশ। বাজার ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপের কারণে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিনিয়োগেও আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬.২৩ শতাংশে। নিকট অতীতে এই প্রবৃদ্ধি ছিল গড়ে ১২ শতাংশের মতো। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, ঋণের এই নিম্নমুখী প্রবাহের অর্থ দাঁড়ায়, বিনিয়োগ কার্যত ‘ডেড জোনে’। একই সঙ্গে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১৬.৭৭ শতাংশ, যা শিল্পায়নের গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের পথে বড় বাধা।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, রাজনৈতিক সরকার এলে বিনিয়োগে আস্থা ফিরবে তিনটি কারণে। প্রথমত, নির্বাচিত সরকার পাঁচ থেকে ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি নীতি পরিকল্পনা নিতে পারে, যা ঝুঁকি কমায়। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থাকায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসে। তৃতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, জাতীয় নির্বাচনই এ বছরের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও ভোগ বাড়বে, যা অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‌‘আমরা মনে করি, গণতন্ত্রে উত্তরণের বছরে নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ঘাটতি কমানো, বিনিয়োগে আস্থা ফেরানো, ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং জ্বালানিসংকটের নিরসন। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ ও ডলার সংকটের চাপে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা হবে অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানো মোকাবেলায় রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নির্বাচিত সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।’
দেশে প্রতিনিয়ত কর্মক্ষম জনসংখ্যা বাড়ছে। সেই অনুপাতে কর্মসংস্থানও বাড়াতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিনিয়োগ। আমরা আশাবাদী, আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে বিনিয়োগ তথা অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ব্যাপক পদক্ষেপ নেবে। এর ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যেমন গতি আসবে, তেমনি দেশে পুনরায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়