৪ঠা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

কারাগারের মানবিক রূপান্তরের প্রত্যাশা

বাংলাদেশের কারাব্যবস্থা ঔপনিবেশিক আমলের দমনমূলক দর্শন বহন করে চলেছে। ব্রিটিশ শাসকের নির্মিত কারাগার ছিল ভয় প্রদর্শন ও শাস্তি দেওয়ার স্থান, সংশোধন কিংবা পুনর্বাসনের নয়। সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে আধুনিক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আইনি কাঠামোতে রূপ দিতে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে সময়ের দাবি। ১৩০ বছরের পুরনো ‘দ্য প্রিজনস অ্যাক্ট-১৮৯৪’ এবং ১২৫ বছরের পুরনো ‘দ্য প্রিজনার্স অ্যাক্ট-১৯০০’ বাতিল করে প্রস্তাবিত ‘কাস্টোডিয়াল অ্যান্ড কারেকশনাল সার্ভিস অ্যাক্ট, ২০২৫’ বাংলাদেশের দণ্ডবিধান ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী অগ্রযাত্রার ইঙ্গিত দেয়। এই আইন কার্যকর হলে দেশের কারাগারগুলো নিছক অপরাধীদের আটকে রাখার ‘বন্দিশালা’ থেকে রূপান্তরিত হবে আধুনিক ‘সংশোধনাগারে’। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মূলমন্ত্র হলো, ‘অপরাধীকে নয়, অপরাধকে ঘৃণা করো।’ এই দর্শনের ভিত্তিতেই নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। আইনের নাম থেকে ‘জেল’ বা ‘প্রিজন’ শব্দটির পরিবর্তে ‘কারেকশনাল সার্ভিস’ বা ‘সংশোধন পরিষেবা’ যুক্ত করা কেবল শব্দগত পরিবর্তন নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির এক বিশাল রূপান্তর। প্রস্তাবিত আইনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্যারোলসংক্রান্ত বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আগে কেবল নিকটাত্মীয়র মৃত্যুতে বিশেষ বিবেচনায় কয়েক ঘণ্টার প্যারোল দেওয়া হতো। কিন্তু নতুন আইনের ১৯ ধারায় প্যারোলকে বন্দির পুনর্বাসন ও সামাজিকীকরণের মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের ১৫ বছর এবং অন্যদের অর্ধেক সাজা খাটার পর ভালো আচরণের ভিত্তিতে প্যারোল পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটি হলো, প্যারোলে বাইরে থাকার সময়টুকুকেও কারাবাস হিসেবে গণ্য করা হবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে এর স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ওপর। খসড়া আইনে ‘প্যারোল বোর্ড’ গঠনের কথা বলা হয়েছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা সঠিকভাবেই সতর্ক করেছেন যে এই বোর্ড যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার না হয়। যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় বা দুর্নীতির মাধ্যমে প্যারোল দেওয়া শুরু হয়, তবে এই মহৎ উদ্যোগটি লক্ষ্যচ্যুত হবে। তাই বোর্ড গঠন করতে হবে দক্ষ আইনজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানী ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে। উন্নত বিশ্বের আদলে ‘ওপেন প্রিজন’ বা উন্মুক্ত কারাগারের ধারণা এবং ইলেকট্রনিক ট্র্যাকার ব্যবহারের যে চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে, তা আমাদের বিচারব্যবস্থাকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করবে। আমরা আশা করি, এই নতুন আইন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে কারাগারগুলো সত্যিকারের সংশোধনাগার হয়ে উঠবে। অপরাধীদের অন্ধকার পথ থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনাই হোক এই আইনের সার্থকতা।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়